বাংলাদেশের নদীঃ তিস্তা নদী না মরুভূমি (শেষপর্ব)

Now Reading
বাংলাদেশের নদীঃ তিস্তা নদী না মরুভূমি (শেষপর্ব)

আগামী ২০-৩০ বছর পর বাংলাদেশকে আপনি হয়তো মানচিত্রে আর সহজে খুঁজে পাবেন না, কেনো জানেন? আগামী ২০-৩০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের দক্ষিন অঞ্চল ডুবে যাবে সাগরের অতল গভীরে আর অন্য একটি অঞ্চল অর্থাৎ উত্তর অঞ্চল পানি শূন্যতার কারণে সম্পূর্ণ মরুভূমি হয়ে যাবে। যে বাংলাদেশের মানুষের হাজার হাজার বছর ধরে বেড়ে উঠা নদীর সাথে, পানির সাথে সেই পানির কারণে অস্তিত্ব সংকটে আমরা। হারিয়ে যাচ্ছি আমরা, হারিয়ে যাচ্ছে দেশ, আমাদের বাংলাদেশ।

আগের দুটি পর্বে তুলে ধরেছিলাম কিভাবে ভারত আমাদের দেশে আসা প্রধান আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোতে বাঁধ দিয়ে আমাদের অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে ফেলেছে। গঙ্গা নদীর উপর ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে ধ্বংস করছে আমাদের সুন্দরবন, তৈরি করছে নতুন মরুভূমি। অন্যদিকে তিস্তা নদীতে গজলডোবা বাঁধ দিয়ে তিস্তার পানি আটকিয়ে নদীকে রূপান্তরিত করছে মরুভূমিতে। আজ আপনাদের কাছে তুলে ধরছি কিভাবে ভারত আমাদেরকে পঙ্গু করে দিয়ে তিস্তাকে মরুভূমি বানাচ্ছে।19867.jpg

তিস্তা, পাহাড়ি সুন্দরি কন্যা নামে পরিচিতি আন্তর্জাতিক একটি নদী। এক সময়ের স্রোতস্বিনী নদী এখন বাংলাদেশের কোটি মানুষের দুঃখ। তিস্তার উজানে বাঁধ দিয়ে বছরের পর বছর এর পানি প্রত্যাহার ও এর দিক পরিবর্তন করে এই নদীকে ধু ধু বালিময় প্রান্তরে পরিনত করেছে। এই নদীতে বাঁধ দিয়ে নদীর পানিপ্রবাহ বন্ধ করে এর উপর যে অন্যায় অত্যাচার করা হচ্ছে তা হয়তো পৃথিবীর অন্য কোন দেশের অন্য নদীর সাথে এই দুঃসাহস করে দেখাতে পারেনি। বন্ধু বেশে এমন ক্ষতি কেউ হয়তো কেউ করতে পারে না যেমনটি ভারত বাংলাদেশের সাথে করছে।

হিমালয়ের বরফগলা পাদদেশ ভারতের সিকিম রাজ্যের চিতামু হ্রদ থেকে তিস্তা নদীর সৃষ্টি হয়েছে। দার্জিলিং এর বিভিন্ন পাহাড়, গিরি খাদের ভেতর দিয়ে নীলফামারী জেলা হয়ে তিস্তা প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। এই খরস্রোতা নদীর বুকে ভারত সুবিশাল বাঁধ বসিয়ে আমাদেরকে পানি শুন্যতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। তিস্তা নদীতে ভারত কর্তৃক ৬টি বাঁধ বসেছে। এসব বাঁধগুলো তিস্তার পানিকে তার মূল স্রোত থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এসব বাঁধগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছে ভারতের অভ্যন্তরে জলপাইগুড়ির গজলডোবা নামক স্থানে গজলডোবা বাঁধ স্থাপন করেছে। গজলডোবা বাঁধটি পুরো তিস্তার পানিকে আটকিয়ে রাখতে সক্ষম। তিস্তা নদীর উপর বাঁধ দিয়ে ভারত প্রায় ৩০টির মতো জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা করছে। তাছাড়া বিভিন্ন সেচ প্রকল্পের নামে এর উপনদীগুলোর পানিও সরিয়ে ফেলছে যাতে করে আর এই নদীতে সহজে আর কোন পানি না আসতে পারে। ভারত বাংলাদেশে তিস্তা নদী দিয়ে সামান্য টুকু পানি আসার পথ পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে। তিস্তার এখন যা পানি আছে তা গজলডোবা ব্যারেজের ভাটির উপনদী থেকে আসছে। অনেকে মনে করে ভারত তিস্তায় শুষ্ক মৌসুমে পানি কিছুটা হয়তো ছাড়ে কিন্তু যারা তিস্তার ভাটিতে থাকেন তারাই জানেন এই পানি মূলত তিস্তার পানি নয় ব্যারেজে জমাকৃত পানিগুলো ছেড়ে দেয়া পানি। ১৯৯৯ সালে জানুয়ারিতে গজলডোবা বাঁধ থেকে আসা তিস্তার পানি প্রবাহ বাংলাদেশের অংশে ডালিয়া পয়েন্টে ছিল ১০৩৩ কিউসেক, ২০০৭ সালে ৬২৫ কিউসেক, ২০০৮ সালে ৫০০ কিউসেক আর ২০০৯ সালে শুধু মাত্র ৫০ কিউসেক। যা তিস্তাকে পুরো মরুভূমি রূপ দিতে সাহায্য করেছে।

amibangalidalal_1398843956_1-tista2.jpg
তিস্তা নদীর সর্বমোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩১৫ কিলোমিটার যার ২০০ কি.মি ভারতে এবং বাকি ১১৫ কি.মি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত নদীর সংখ্যা ৫৪ টি যার মধ্যে আমাদের বন্ধু রূপী দেশ ৪৩ টি নদীর পানি আটকে রেখে তাদের বন্ধুত্ব রক্ষা করছে। ২০০৮ সালে বর্তমানে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল তাদের নির্বাচনী ইশতিহারে অঙ্গীকার করেছিল ভারতে সাথে তিস্তা চুক্তি করা হবে কিন্তু ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই চুক্তি এখন কোন আলোর মুখ দেখেনি। আর এই ৯ বছরে তিস্তা তার নদীর নাম থেকে খালে নাম লেখিয়েছে। অদূর ভবিষতে তা খুব শীঘ্রই মরুভূমিতে রূপ নিবে। কেননা ৯ বছর আগে তিস্তা থেকে বাংলাদেশ অংশে পানি আসতো ২৫০০ কিউসেক সেখানে আজ পাওয়া যায় মাত্র ৩০০ কিউসেক পানি। ১৯৮৩ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ-ভারত মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তার পানি বন্টনে শতাংক ভিক্তিতে চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী তিস্তার পানির শতকরা ৩৯ ভাগ পাবে ভারত, ৩৬ ভাগ ভাগ পাবে বাংলাদেশ এবং বাকি ২৫ ভাগ নদীর নাব্যতা ঠিক রাখতে সংরক্ষিত থাকবে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সেচ প্রকল্প “তিস্তা সেচ প্রকল্প” প্রায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পানি শূন্য হয়ে পড়ছে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল। পানির অভাবে ঠিকমত চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। ১৯৮৩ সালে তিস্তার পানি চুক্তির পরপরই ভারত সরকার এই সর্ববৃহৎ প্রকল্পটি দ্বারা সেচ প্রদান অকার্যকর করে তুলতে উঠে পড়ে লেগে যায়।

ভারত তিস্তা নদীর বুকে বাঁধ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের প্রায় ১০ টি জেলার ৯.২২ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ প্রকল্প চালাচ্ছে। আরো শোনা যাচ্ছে কৃষকদের দাবির মুখে আরও বড় একটি সেচ প্রকল্প চালু করতে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলছে তিস্তায় পানি নেই কিন্তু তিস্তার পানি দিয়েই চলছে তাদের দেশের মানুষের সব কাজ। নিজ দেশের মানবাধিকার রক্ষা করতে গিয়ে অন্য দেশের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিতেও তার কোন আপত্তি নেই। ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের রংপুর, দিনাজপুর ও বগুরা জেলার ৬.৩২ লাখ হেক্টর জমিতে ঠিক মতো চাষাবাদ করা যাচ্ছে না। চাষাবাদের জন্য পর্যাপ্ত পানি কোন পানি নেই, শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্য কৃষকের মুখে শুধু হাহাকার দেখা যাচ্ছে।

তিস্তার পানি সংকটের কারণে উত্তর বঙ্গের বড়াল, ইছামতি, মাথাভাঙ্গা সহ ছোট বড় প্রায় ৩০ টি নদী আজ শুকিয়ে গেছে। প্রমোদ তিস্তার বুকে এখন পানির বদলে চলে ক্রিকেট খেলা। ভারত তার দেশে সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি ব্যবহার করে আমাদের অংশের তিস্তাকে মেরে ফেলছে। বাংলাদেশের লাখ লাখ কৃষক হয়ে পড়ছে বেকার, দেখা দিচ্ছে খাদ্য সংকটের। তিস্তার পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের জীব বৈচিত্র্য ও পরিবেশ মারাত্বক ক্ষতি সাধন হচ্ছে। অর্থনৈতিক ভাবে বছরে প্রায় ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে।

বাংলাদেশের তিস্তা সহ অন্যান্য যেসব নদীগুলোতে ভারত যে সব বাঁধ দিয়েছে সেগুলো আন্তর্জাতিক নদী। ভারত আন্তর্জাতিক নদীতে এভাবে বাঁধ দিয়ে অন্য দেশের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে না। তারা কোনভাবেই আন্তর্জাতিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করতে পারে না। এজন্য আমাদের দেশের সরকারের উচিত এর বিপক্ষে সুষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহন করা।