5
New ফ্রেশ ফুটপ্রিন্ট
 
 
 
 
 
ফ্রেশ!
REGISTER

ভারতীয় সিরিয়াল : বিনোদন নাকি অপসংস্কৃতি?

Now Reading
ভারতীয় সিরিয়াল : বিনোদন নাকি অপসংস্কৃতি?

সন্ধ্যা হতে না হতেই প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে মহাসমারোহে ভারতীয় সিরিয়াল দেখার উৎসব শুরু হয়ে যায়। এর পরে আর কোনও থামাথামি নেই। একবারে রাত ১০টা অথবা ১২টা পর্যন্ত চলে এইসব সিরিয়াল। আর মিস হয়ে গেলে? দিনভর পুন-প্রচার তো আছেই। মাঝে মাঝে এই সিরিয়ালের জন্য তো বাংলাদেশের খেলাও মিস হয়ে যায়। এটিকে এখন বিনোদন না বলে নেশার সামগ্রী বললে খুব একটা ভুল হবে না। অনেক বাড়িতে অশান্তির অন্যতম কারণ এই সিরিয়াল। নারীপুরুষ নির্বিশেষে সবাই এই সিরিয়াল দেখলেও মহিলারাই যে বেশি দেখেন এ নিয়ে দ্বিমত নেই এবং থাকার কথাও না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই সিরিয়াল আসক্তির সূত্রপাত কোথা থেকে? আমরা যদি একটু পিছনে ফিরে তাকাই তাহলেই ব্যাপারটি ভালভাবে বুঝতে পারব। বাংলাদেশে যখন প্রথম টিভি এসেছিল তখন আমরা একটিমাত্র চ্যানেল দেখতাম। সেটি হল বিটিভি। সেই সময় আমরা প্রায় সবাই বিটিভির প্রায় প্রত্যেকটি অনুষ্ঠান অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে দেখতাম। অনুষ্ঠানের মান নিয়েও কোনও প্রশ্ন ছিল না। এরপর আস্তে আস্তে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো প্রতিষ্ঠিত হল এবং আমরা আরও কিছু চ্যানেল দেখার সুযোগ পেলাম। পরবর্তীতে একটি ভারতীয় টিভি চ্যানেল ডিশ লাইনে যুক্ত করা হল(নাম উল্লেখ করছি না) । এরপরেই মূলত দেশী-বিদেশী নানান ধরণের চ্যানেল আমরা পেলাম। এর মধ্যে শিক্ষণীয় অনেক চ্যানেল ছিল এবং এখনও আছে। তবে সেসব ছেড়ে এবং দেশী চ্যানেলগুলোকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশের মানুষ বেছে নিলেন ভারতীয় বাংলা এবং হিন্দি চ্যানেলগুলো, যেসব চ্যানেলের মূল সম্প্রচারই হল বেশ কিছু মেগা-সিরিয়াল। অর্থাৎ ভারতীয় সিরিয়াল দেখার রেওয়াজ এক দু-দিনে নয় বরং বেশ কিছুকাল যাবত তৈরি হয়েছে। কেন দেশী বিনোদন মাধ্যমগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া হল? এর কারণ হিসেবে বাংলাদেশের দর্শকরা যা উল্লেখ করেন তা হচ্ছে – ভারতীয় সিরিয়ালগুলোতে বিজ্ঞাপন বিরতি অনেক কম দেওয়া হয়। অবশ্যই এটি একটি যুক্তিযুক্ত কারণ। কেননা আমরা সকলেই দেশী চ্যানেলগুলোর দীর্ঘ বিজ্ঞাপন বিরতি সম্পর্কে অবগত আছি। নাটক দেখানোর সময় তো দূরে থাক, খেলা দেখানোর সময়ও মুক্তি মেলে না।

এবার আসি অনুষ্ঠান এর মান নিয়ে। বাংলাদেশের নাটক এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা নিয়ে পূর্বে কোন প্রশ্নই ছিল না। হুমায়ুন আহমেদসহ অনেক ভাল নাট্যকার ছিলেন যারা অসাধারণ সব নাটক উপহার দিয়েছেন। এখনও ভাল নাটক তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে। বিশেষ করে ঈদের সময় যেসব নাটক আমরা দেখতে পাই তার বেশীরভাগই ভিন্ন ধারার এবং চমৎকার। কিন্তু ইদানীং কালে বাংলাদেশের বেশ কিছু নাটকে ভারতীয় সিরিয়ালের ছায়া দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। এর কারণ বাংলাদেশের দর্শকদের চাহিদা। তাই এর জন্য নাট্যকারদের পুরোপুরি দোষ দেওয়া যায় না কেননা তাদের মূল কাজই হল দর্শকদের চাহিদা মাথায় রেখে নাটক তৈরি করা।
এখন আসি ভারতীয় সিরিয়াল প্রসঙ্গে। আমাদের দেশে ভারতীয় হিন্দি ভাষার সিরিয়ালগুলোর পাশাপাশি বাংলা ভাষার সিরিয়ালগুলো সমান ভাবে জনপ্রিয়। অধিকাংশই মেগা-সিরিয়াল,দায়ে পড়লে এক বছর অন্যথায় ৪-৫ বছরও চলে এসব সিরিয়াল! এই যে ভারতীয় সিরিয়াল নিয়ে এত কথা তার মূল কারণই হচ্ছে – ভারতীয় সিরিয়াল আমাদের দেশের জন্য অপসংস্কৃতির পরিচায়ক। এসব সিরিয়ালের কাহিনী,চিত্রনাট্য,বিষয়বস্তু যাই বলি না কেন – তা মূলত একই ধারার। প্রায় সব সিরিয়ালেই কিছু মিল লক্ষণীয়। একজন সিরিয়াল বিশারদ না হলেও আপনি এই বিষয়গুলি ধরতে পারবেন। এসব বিষয়ের মধ্যে আছে নারী-নির্যাতন,বহুবিবাহ,সম্পত্তি দখল ইত্যাদি। সবাই বলে থাকন যে সব জিনিস থেকে ভালটা নিতে হয় আর খারাপটা বর্জন করতে হয় কিন্তু সেই জিনিসের খারাপ দিকের পাল্লা যদি বেশী হয় এবং তা যদি অপসংস্কৃতির পরিচায়ক হয় তাহলে আমি মনে করি তা বর্জন করাই শ্রেয়।
একজন মানুষের জীবনে বিনোদনের এই মাধ্যমগুলো যেমন সিরিয়াল শুধুই যে বিনোদন দেয় তা কিন্তু নয় বরং এসব অনুষ্ঠান মানুষের মনকে এবং তার চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে। একটি খারাপ বই যেমন একজন মানুষকে খারাপ দিকে নিয়ে যেতে পারে, তেমনই অপসংস্কৃতির পরিচায়ক এই ভারতীয় সিরিয়ালও জাতিকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে। তার একটি উদাহরণ বোধহয় পাখি ড্রেস নিয়ে কিছু ন্যক্কারজনক ঘটনা। কাজেই এসব সিরিয়ালের কুপ্রভাব সম্পর্কে কোন সন্দেহ থাকার কথা না। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপারটি হচ্ছে অনেক শিশু-বাচ্চারা তাদের মা-খালাদের সাথে এসব সিরিয়াল প্রতিনিয়তই দেখছে। এতে প্রথমত তাদের মানসিকতা নষ্ট হচ্ছে এবং দ্বিতীয়ত তারা বাংলাদেশের সংস্কৃতির পরিচয় পাচ্ছে অথবা ধরে নিচ্ছে এগুলোই বাংলাদেশের সংস্কৃতি। অন্যদিকে হিন্দি সিরিয়ালগুলো তো আছেই আরও কিছু সমস্যা তৈরি করার জন্য। অনেকেই খেয়াল করে থাকবেন যে ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা অনর্গল হিন্দি ভাষায় আপনার সাথে কথা বলতে পারবে। আমি মানছি যে বহুভাষায় জ্ঞানলাভ করা ভাল ব্যাপার কিন্তু যখন শিশুরা মাতৃভাষা শিক্ষার সময়টাতে বাংলা না শিখেই হিন্দিকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে তখনই মূল সমস্যাটা শুরু হয়। এখন এটা নিছক সমস্যা হলেও

ভবিষ্যতে ভয়ানক সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে যে মাতৃভাষার জন্য এত সংগ্রাম হয়েছিল সেই বাংলা ভাষা আজ কিছুটা হুমকির মুখে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ভারতীয় সিরিয়ালের খুব বেশী ভাল দিক পাইনি। অবশ্য কোন ভাল দিকই এর খারাপ দিকগুলোকে ছাপিয়ে যেতে পারবে না।

সমস্যা থাকলে তার সমাধান থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে প্রথম কাজ হবে দেশী মিডিয়াকে শক্তিশালী করা। ভাল-ভাল অনুষ্ঠান,নাটক,চলচ্চিত্র যদি দেশেই তৈরি হয় তাহলে কিছুটা হলেও দেশী অনুষ্ঠানগুলো সবার নজরে আসবে এবং আস্তে আস্তে এসব অনুষ্ঠানের প্রতি সবার আগ্রহ বাড়বে।
দ্বিতীয় কাজ হবে বিজ্ঞাপনের হার কিছুটা হলেও হ্রাস করা। অনেক বাংলাদেশী চ্যানেল বিরক্তিকর বিজ্ঞাপন দেওয়ার জনপ্রিয়তা অনেক অর্জন করেছে! তাই এ থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। সরকার এখানে কিছু ভূমিকা রাখতে পারে সম্প্রচার নীতিমালার কিছুটা পরিবর্তন করে।
তৃতীয় জিনিসটি হল আমাদের মানসিকতা। এই মানসিকতার কারণেই আপনার মনে হবে যে এ সমস্যার সমাধান নেই। কিন্তু আসলে তা নয়। আমরা আমাদের দেশকে ভালবাসি। অনেক ক্ষেত্রে আমরা উন্নয়নের রোল মডেল হয়েছি। পোশাক শিল্পে অভূতপূর্ব সাফল্যও আমাদের আছে। যখনই ‘Made in Bangladesh’ লেখাটা দেখি তখনই আমরা গর্বিত হই। সেই আমরা কেন সামান্য বিজ্ঞাপনের অজুহাত দেখিয়ে দেশী চ্যানেলগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেব? দাম বেশী দিয়ে হলেও দেশী জিনিস আমরা কিনি কেননা দেশের জন্য আমাদের কিছু দায়বদ্ধতা আছে। ঠিক তেমনই বিজ্ঞাপন বেশী হলেও আমাদের দেশী অনুষ্ঠান দেখার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত এবং ভারতীয় সিরিয়াল বর্জন করা উচিত।

(বিনোদন ব্যক্তিগত ব্যাপার কিন্তু অপসংস্কৃতি কারও কাম্য নয় এবং সে জন্যই আমার এই ফুটপ্রিন্ট।)

“ড্রয়িংরুমে” বিদেশী চ্যানেলের দৌরাত্ম্য

Now Reading
“ড্রয়িংরুমে” বিদেশী চ্যানেলের দৌরাত্ম্য

আপনি কি কখনো হোমিওপ্যাথির চিকিৎসা নিয়েছেন ? এই চিকিৎসাটা খুবই ধীরগতির তাই না ? তবে কোন ক্ষতি তো আপনার চোখে পড়ে না,উন্নতি তেমন একটা দৃশ্যমান নয় তাই নয় কি ?প্রথমেই বলে রাখি কোন ভাল জিনিসের জন্য আহামরি কোন বিজ্ঞাপণ দিতে হয় না,খারাপ কিছুকে হজম করানোর জন্য যতটা না করতে হয়।

এখনকার ব্যস্ততম দুনিয়ায় মানুষের শত কাজের ব্যস্ততায়  নেই কোন ফুরসুত তার বিনোদনের জন্য।আগে গ্রামে-গঞ্জে পালাগানের আসর হতো নাটক হতো মঞ্চে এখন এসব ধূসর অতীত বলা চলে।

আমাদের দ্রুততম জীবন গতির সাথে তাল মিলিয়ে এখন আমরা বিনোদনের মাধ্যমকে যুগোপযোগী করে নিয়েছি। আমরা সবাই যাদুর বাক্সরুপী টেলিভিশনে আটকা পড়েছি। একটা সময় দেশে কেবল বিটিভির অনুষ্ঠানমালা ছিল তখন আপনার কাছে আর কোন অপশনই ছিল না,চাইলেই আপনি তা বদলাতে পারতেন না। যখন  দেশে স্যাটেলাইট চ্যানেলের সম্প্রচার শুরু হল তখন থেকে বিনোদন একটা বহুমাত্রিক ছোঁয়া পেল।এখন আমাদের রিমোট দ্বারা কন্ট্রোল করতে হয়,একই ঘরে সাতজন মানুষ হলে তাদের রুচিবোধের প্রকারভেদ হয় পাঁচ।

দেশের স্যাটেলাইট চ্যানেলের সাথে বিদেশী কিছু চ্যানেল যারা ধীরে ধীরে আমাদের অস্তিত্বকে গ্রাস করে চলছে। কিভাবে ? কোথায় ? এটা অনেকটা ক্যানসারের মতো ধীরে ধীরে হচ্ছে বিধায় তা বেমালুম ।

কয়েক বছর আগে  ডরিমন কার্টুন দেখে গিয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে একটা ছোট ছেলে বিপদজনক স্টেপ নেওয়াতে কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে উঠে।যার ফলে দেশে কার্টুনের চ্যানেলটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।এখন একই কার্টুন দেশীয় চ্যানেলগুলো ডাবিং করে সম্প্রচার করছে। এটা কলা দেখিয়ে মুলা খাওয়ানোর মত হলো না ?

আমাদের দেশে এখন প্রায়ই ৫০ টারও অধিক বিদেশী চ্যানেল আছে যার অধিকাংশই ভারতীয়। ভারত এবং বাংলাদেশের আর্ন্ত-বাণিজ্যিক চুক্তিতে দেই দেশের বন্টনে সমান অধিকারের কথা বলা থাকলেও বাস্তবে তার কোথাও ছিটেফোঁটা নেই। বরং দেশীয় প্রতিনিধিরা এসব ব্যাপারে বেশ উদাসীন কেননা আমাদের দেশের কয়টা চ্যানেল ভারতে সম্প্রচার করে সে খবর আমাদের আছে ? সঠিক কোন খবর তো নেই বরং তার জন্য নেই কোন পদক্ষেপ।

এখন আপনি প্রতিটা ঘরে ঘরে গিয়ে দেখুন খোদ দেশীয় নামকরা সেলেব্রেটিদের বাসায় যান সকাল বা সন্ধ্যা যেকোন সময়ে ভারতীয় চ্যানেলের অনুষ্ঠানমালা দেখতে পাবেন। এমন না যে বিষয়টা নতুন অনেকে সরাসরি স্বীকার করেছে। এসব নিয়ে নিউজ রির্পোট হয়েছে একাধিকবার আমাদের সচেতনতার দৌড় ততটুকুই বলা যায়।

আমাদের দেশীয় মিডিয়ায় যে কয়টি চ্যানেল বেশ বিরুপ প্রভাব ফেলছে তার মধ্যে অন্যতম হল স্টার প্লাস,সনি টিভি,জি টিভি,লাইফ ওকে,সাব টিভি,জি-বাংলা ,স্টার জলসা,কালারস হিন্দি এবং কালারস বাংলা,ইটিভি বাংলা,স্যাট ম্যাক্স,এমটিভি ,বি4ইউ মিউজিক সহ আরো অনেক চ্যানেল। হলিউড কিংবা কোরিয়ান,জাপানি,চীনা এসব চ্যানেলের প্রকোপ টিভিতে নেই।

আমাদের জাতীয় দৈনিকগুলোতে দেখবেন তারা বিদেশী চ্যানেলগুলোকে প্রমোট করতে যেন এক ধাপ এগিয়ে তারা ঐসব চ্যানেলের বিভিন্ন্ প্রোগ্রামের সিনোপসিস লিখে দেয় পাঠকদের জন্য এটা প্রকরান্তরে নেতিবাচক একটা দিক।

ভারতীয় তথা বিদেশী চ্যানেলগুলোর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে আমাদের যুব সমাজের উপর কেননা তারা একটা নেতিবাচক মানসিকতা নিয়ে বড় হচ্ছে যা কিনা ভবিষ্যতে আমাদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। সৃজনশীল পরিভাষায় যাকে নাটক বলে এই লম্বা দৌড়ের সিরিয়াল গুলো দর্শক ধরে রাখার একটা বাজে দৌড়ে নেমে তার সংজ্ঞাটা পাল্টে দিছে। এই নাটকগুলো নাটকের নেতিবাচক অর্থই যেন দাঁড় করিয়েছে। নাটক!!

আপনি খেয়াল করবেন এখানে দেখানো হয় একটা পরিবার যা কিনা একদম প্রত্যন্ত অঞ্চলকে রিপ্রেজেন্ট করে কিন্তু আপনি সেট বা লোকেশন কোথাও পাবেন না প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোঁয়া। এখানে প্রতিটা পরিবারের অবকাঠামো অদ্ভুত যেমনটা বাস্তবের সাথে কোন মিল নেই ।এখানে সম্পর্কের মূল্য একদম ঠুনকো করে দেখানো হয়। এই যেমন তারা সম্পর্ক বা রীতি রেওয়াজের ক্ষেত্রে এমন বেহায়াপনা করে খোদ যেটা তাদের সমাজে প্রচলিত নেই। আপনি খেয়াল করে দেখবেন এখানে কিছুদিন পর পর নায়িকা বা নায়কের বিয়ে দেয়া হয়। এমন অনেক নাটক গেছে যেখানে নায়িকার বিয়ে দেখতে দেখতে খোদ দর্শকও বিরক্ত হয়ে গেছে।এখানে বিয়ে বারংবার করানোর মাধ্যমে আসলে কি ম্যাসেজ দিতে চাই এটা বোধগম্য হওয়ার বিষয় না। যে কথা বলছিলাম সম্পর্কের টানাপোড়েন এটা এতটাই অদ্ভুত আপনি চিন্তা করতে গিয়ে বমিও করে দিতে পারেন হজম হবে না বলে দিলাম।

দুইবোনের সম্পর্ক বিয়ের কারণে বউ শ্বাশুড়ির সম্পর্ক বনে যায়। এটা আমরা অধীর আগ্রহে দেখছি কতটা খারাপ জিনিস খাওয়ানো হচ্ছে খেয়াল করছি একবারও! আমরা তো নাটকের পরের দৃশ্য কি হবে তা ভেবে অর্ন্তপ্রাণ আমাদের একটা মোহের মধ্যে রাখা হয়েছে। এখানে একজন স্বামীর দুটো স্ত্রী থাকা যাবে  তবে তারা একই সাথে কখনো স্বামীর দাবি নিয়ে আসে না,কোনক্ষেত্রে ডির্ভোস হয়ে গেলেও তাকে একই ছাদে নিয়ে আসার সুযোগ আছে। যেখানে এক শ্বাশুড়ি আর বউয়ের জ্বালায় টিকে থাকা দুস্কর সেখানে শ্বাশুড়ির লেয়ারটা তিন চার স্তরের হয়ে যায়। আমাদের ঘরে সাধারণত দেখা যায় বাবার সম্পর্কের লোকজন চাচা-চাচী এরা থাকতে দেখা যায়। এসব নাটকে আপনি দেখবেন মামা-মামী-খালা খালুর সম্পর্কের লোকজনও এসে গিজগিজ করে। এটা কেবল গল্পকে নানা নাটকীয় মোড় দেয়া ছাড়া আর কিছু না। এখানে কোন সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতির বন্ধন আছে বলে মনে হয় না। আপনি যখন পরিবারের মেলোড্রামা দেখতে ক্লান্ত তখন আপনার সামনে নিয়ে এসেছে মাইথোলজিক্যাল কিছু কাহিনি আর হরর কিছু গল্প যেটা অন্তত আর কিছু না হোক বর্তমানের সাথে বেমানান । এই সব গল্পের প্লট আর থিম খুবই হাস্যরসময়।

আপনার সামনে একটা বিরাট আলোকসজ্জায় ভরপুর একটা সেট,কস্টিউমে ভরপুর একেকটা ক্যারেক্টার তা দিয়ে আপনার সামনে ধুলো দিয়ে যাচ্ছে। এখানে নাটক যেখানে বিনোদনের পরিভাষা সেখানে এইসব নাটক যেন ব্যবসায়ীদের ঢাল নয়তো অনেকক্ষেত্রে অস্ত্রের ভূমিকা নিচ্ছে।

আমাদের পরিবার গুলোতে বউ-শ্বাশুড়ির দ্বন্ধ,স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্ধ,হিংসা প্রতিহিংসা বা ক্ষোভ আর নানান বিদ্বেষপূর্ণ ঘটনার বীজ এসব নাটকগুলোর মধ্যে অর্ন্তনিহিত আছে।  ঈদের বাজারগুলোতে তো এখন এইসব চ্যানেলের প্রকোপ কেননা নাটকের ক্যারেক্টারগুলো এখন বাজারে নেমে এসেছে তাদের নামসংবলিত ড্রেস বাজারও দখল করছে। এইসব জিনিসের যথেষ্ট চাহিদা আছে ।খোদ চট্টগ্রামে স্টারপ্লাস নামে শাড়ীর দোকান আছে তাতে নারীদের বেশ উপচেপড়া ভীড় দেখা যায়। ফেসবুকে নারীদের গ্রুপ বা পেজে এসব নিয়ে চর্চা হয় বেশ তারা দেখে তো দেখে তা নিয়ে নানাভাবে মশগুলও করে যেমন কোন নাটকের কোন ক্যারেক্টারের কি হলো এটা এখন ভার্সিটি পড়ুয়া হতে শুরু করে স্কুল পড়ুয়া সকল মেয়ের আলাপের বিষয়বস্তু। এটা আমাদেরকে প্রতিনিয়ত দেশীয় সংস্কৃতির কাছ থেকে কোন এক অদৃশ্যে শক্তির আড়ালে যেন সরিয়ে নিচ্ছে।

দেশে নানান ফেসবুক পেইজ আর ট্রলগুলোতে এসব ক্যারেক্টার স্থান পাই যার কারণে বোঝা যায় কতটা বিরক্ত টিভি দর্শক।আমরা একটা সামাজিক অণুকরণের মধ্যে দিয়ে বড় হচ্ছি যেমন এখন একজন টিন এজ গার্ল এইসব নাটক বা সিরিয়ালে আকৃষ্ট হয়ে পড়লে স্বাভাবিক অর্থে তার মনোজাগিতক বিকাশটা হলো কোথায় ? এই মেয়ের স্বাভাবিক একটা কৈশোরের চঞ্চলতা আমাদের সামনে কেড়ে নিচ্ছে তা দেখেও আমরা নির্বিকার। এখানে নাটকগুলোতে কেবল ঘরের চৌকাঠের ভেতরকার গল্পকে হাইলাইট করা হয়।বাইরের দুনিয়ার সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল না কেননা একটা নাটকে দেখা যায় ল্যাপটপ ওয়াশ করার অর্থ পানিতে চুবিয়ে শুকাতে দেয়া এমন কাজ করছে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সেই মেয়ে একবছর পর একটা প্রতিষ্ঠানের সিইও বনে যায়। একবছর আাগে যার কাছে কোন নুন্যতম ডিগ্রীটা ছিল না। এমন কাল্পনিক কনসেপ্ট কেবল টিভিতে সম্ভবপর। এগুলো আমাদেরকে সুন্দর মোড়কে করে খাওয়ানো হচ্ছে নয়তো গিলানো হচ্ছে।

এইসব নাটকে পুরুষের ক্ষমতা গৌণ কেবল নারীরাই সর্বেসর্বা।যেহেতু গল্পের গন্ডি ঘরের ভেতরকার তাই বোঝা যায় তাদের নির্দিষ্ট দর্শককে লক্ষ্য করে এগিয়ে যায় গল্প-কাহিনি। এছাড়াও নানানভাবে এসব বিষয় আমাদের তথা দেশীয় সমাজে বিরুপ প্রভাব ফেলছে। আমাদের এখানে নাই তেমন কিছু একটা প্রথা যা  নিয়ে আসার জন্য ভবিষ্যতে ঘরের মেয়েরা সোচ্চার হবে তেমনটা ভাবা অমূলক নয়।এটা যদি হয় তবে তা হবে এক ধরনের আগ্রাসন। এটা প্রকরান্তরে আমাদের সমাজে একটা আগ্রাসনই সৃষ্টি করছে। আগ্রাসনটা কোথায় ?

আমাদের তরুণীরা যারা এটা দেখে বড় হচ্ছে তারা একটা ভুল ধারণা নিয়ে বড় হচ্ছে যা তাকে বিপদে ফেলবে।এখানে গল্পকার যেভাবে একটা নায়িকা বা চরিত্রকে স্বাধীনতা দেয় তা আমরা বাস্তবে নাও পেতে পারি।পরিবারের ভেতরকার কাল্পনিক সমস্যা আর সমাধান কল্পে যে অভূতপূর্ব সমাধান যার সাথে বাস্তবতার ব্যবধান যোজন যোজন। এখানে ইচ্ছাকৃতভাবে একটা ঘটনা বা সমস্যাকে জটিল করে তোলা হয় যা বাস্তবে তেমনটা নাও হতে পারে আমি যদি ভেবে নিই তবে তো বিপদ।

আপনি আমি যদি একটা দ্বিধাবিভক্ত সমাজের মধ্যে বড় হচ্ছি,যেখানে আমার সামনে প্রর্দশিত টিভিতে এক আর বাস্তবে অন্যকিছু তখন তো নিজেকে মানিয়ে নিতে যে কারো কষ্ট হবে। এটাই স্বাভাবিক।

একটা ঘটনার কথা শেয়ার করি … একবার এক ফ্রেন্ডের লাইক বা শেয়ারের কল্যাণে আমার টাইমলাইনে চোখ ছানাবড়া করা একটা পোস্ট আসে।যেখানে তরুণীদের পেজে পোস্ট করা আছে  “ কোন এক সিরিয়ালে নায়ক-নায়িকার শয্যাদৃশ্য না দেখিয়ে তাকে গর্ভবতী দেখানো হয়েছে।” এটা নিয়ে গ্রুপ পোস্ট আর তুখোড় সমালোচনা।

তাবৎ দুনিয়ার হাজারো টপিক থাকতে আমরা আমাদের মানসিকতা নিয়ে কোথায় আটকে আছি। এভাবে প্রতিনিয়ত আমরা আধুনিক সমাজে বাস করে কুপমুন্ডুকের মতো জীবন যাপন করছি। এমটিভি রোডিস্ বা আরো যে কয়েকটা শো হারহামেশাই যেটা কিনা অনেকটা আমেরিকান শো এর আদলে তৈরি করা হয়েছে। এখানে যেভাবে তরুণ-তরুণীর বেহায়াপনা বা অবাধ মেলামেশাকে স্বীকৃতির মানদন্ডে বিচার করা হয় তা যারা পর্দার বাইরে দেখছে তাদের জন্য অমূলক বটে।আমাদের দেশীয় ব্যবস্থা বা সমাজের মান অতটা নিচে নামে নি। যেখানে এসব জিনিসকে প্রমোট করতে মিডিয়ার দ্বারস্থ হতে হবে।

আজকাল তো আপনি গাড়িতে বা পার্কে গেলে দেখবেন বয়স্করা তাদের আলোচনায় নিয়ে আসছে এই ছাইপাশ সিরিয়ালের রসালাপ।অনেক সময় তাদের আলাপচারিতা আর ভঙ্গিমায় আপনার মনে হবে ঘটনাটা আপনার পাশের বাড়িতে ঘটেছে।আসলে তা নয়।

আমাদের দর্শকগুলো বিপথে যাচ্ছে কেন ? এটা কি তাদের একার দোষ ? এই যে দেশের সীমানা পেরিয়ে একটা কুপ্রভাব তা ও আবার বিনোদন মাধ্যমের দ্বারা হচ্ছে তা দেখে কর্তৃপক্ষ অনেকটা চোখে হাত দিয়ে রেখেছে।

এই ক্ষেত্রে তো দর্শক চোখে হাত দিয়ে রাখবে না।একটা নীরব ঘাতকের মতো সামাজিক আগ্রাসন আমাদের পেঁচিয়ে ধরেছে আমাদের গলা অব্দি আসলে বোধহয় অনুভব হবে। যখন শ্বাস নিতে কষ্ট হবে…

সর্বোপরি আমাদের এই বিরুপ আর কুরুচিপুর্ণ অনুষ্ঠানগুলোকে বয়কট করতে হবে যেখানে আমরা চাইলে ভবিষ্যতের জন্য একটা সুন্দর বিনোদনের নির্মল পরিবেশ তৈরি করতে পারি।

আপনারা যারা আধুনিক সময়ে সন্তানের বাবা মা হতে যাচ্ছেন তারা একটা গঠনমূলক পদক্ষেপ নিন।আপনার ছোট একটা পদক্ষেপ একটা মহীরুহের ন্যায় বিবেচিত হবে….

 

পরের পর্বে দেশীয় টিভিগুলোর সমাচার থাকবে……

Page Sidebar