অনিশ্চয়তা

Now Reading
অনিশ্চয়তা


বৃষ্টি পড়া শুরু করেছে। বেশ মোটা মোটা ফোটা। ছাতাটা সাথে আনা উচিৎ ছিল। অবশ্য ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতেও মন্দ লাগেনা। কিন্তু অসুখ টসুখ বাধিয়ে বসলে তো সমস্যা। আমি অসুস্থ হয়ে গেলে, সংসার চলবে কেমনে? আল্লাহ ব্যবস্থা একটা করবেন ইনশাআল্লাহ। বিপদ কখন আসে তো ঠিক নেই। তাছাড়া বিপদ মহাশয় নাকি মাঝে মাঝে আসলে তার মা-বাবা, দাদা-দাদি সহ পুরো পরিবারকে সাথে করে নিয়ে আসেন। এরকম পরিস্থিতিতে অবশ্য একবারো পড়তে হয়নি। তবু কিছু টাকা জমিয়ে রাখা ভালো। এমুহূর্তে আমি অসুস্থ হয়ে পড়লে সংসার চলার কোন উপায় নেই। আমার অবশ্য তাতে খুব একটা সমস্যা হবে না। ২৫ বছরের জীবনের অর্ধেকই তো কাটিয়ে দিলাম মুড়ি, বাদাম, শসা এসব খেয়ে। ক্ষিদা নষ্ট করতে বেশ ভালো কাজ দেয় এসব। কিন্তু ইরিনার একদিনও খালি পেটে দিন কাটাতে হলে আমি তা সহ্য করবো কীভাবে? আমার কিছু নেই জানার পরও সে বিয়ে করেছে আমাকে। আমার ভালোবাসার মূল্য দিয়েছে। তাকে কীভাবে আমি অসুখী রাখি?

বৃষ্টি পড়লেই দেখি ইরিনার কথা মনে পড়ে। আরো কিসব ভাবতে ভাবতে একটা দোকানে ঢুকে পড়লাম। এখন বৃষ্টিতে ভেজা যাবে না। কোন একদিন ভিজবো। ইরিনার সাথে। যখন আমার অনেক টাকা হবে। বৃষ্টিতে ভিজে অসুখ বাধিয়ে ফেললেও সংসার চালাতে সমস্যা হবে না। জীবনে আনন্দ করতে হলে একটু অসুখ বিসুখ হলে সমস্যা নেই।

দোকানদার উদাস মনে বৃষ্টি পড়া দেখছেন। একজন লোক তার দোকানে এসে দাঁড়িয়ে আছে যেন তার খবরই নেই। বুঝতে পেরেছে বোধহয় বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ক্ষণিকের আশ্রয় পাওার আশায় আসা। এরকম নির্বিকার ভঙ্গির মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়েই জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে দেয়। কথাবার্তাও বলে খুব কম। তারা ভাবে বললেই কী, না বললেই বা কী। আসলে ব্যাপারটা কিন্তু এরকম না। জীবনের কাছে আমরা ঠিক ততটুকুই পাই যতটুকু দেই। একটি ‘কেমন আছেন?’ও মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে অনেকখানি।

ঘড়ির দিকে তাকালাম। বিকেল ৫ টা। আমি প্রায় ১৫ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে আছি একটি মিষ্টির দোকানে। দোকানদারের ভাবভঙ্গির কোন ভাবান্তর নেই এখনো। ঝপঝপ করে বৃষ্টি পড়ছে। ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে। আমি এক এক করে নানা পদের মিষ্টি দেখতে লাগলাম। ইরিনার জন্য এক কেজি মিষ্টি নিয়ে গেলে কেমন হয়? সে কালো জাম খুব পছন্দ করে। আজকে টিউশনির বেতনও পাওয়া গেছে।

যেদিন ভয়ে ভয়ে প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলাম ইরিনার বাবার কাছে, ভরাট কন্ঠে তিনি কথা বলে আমাকে কী ভয়টাই না লাগিয়েছিলেন! উনার সাথে আমার কথাবার্তা অনেকটা এরকম ছিল-
‘কি করো তুমি?’
আমি আমতা আমতা করে বললাম, ‘টিউশনি।’
তিনি রেগে মেগে হড়বড় করে বলতে লাগলো, ‘ফাইজলামি করতে এসেছো এখানে! তোমার ধারণা হল কেমনে শুধুই টিউশনি করাবে এরকমন একজন হারামজাদাকে আমি আমার মেয়ে দিব!’
‘জ্বি, আমি আসলে বুঝতে ভুল করেছি। কি করে আসলাম জিজ্ঞেস করেছেন মনে হল। আসলে মাথা ঘুড়ছে তো।’
‘এখন বের হও বাসা থেকে। ইউ যাস্ট গেট আউট। রাইট নাও!’
‘জ্বি, গাড়ি তো মা বাবাকে আনতে আমাদের বাড়িধারার ফ্ল্যাটে গেছে। গাড়ি আসা পর্যন্ত একটু বসতে দিলে ভালো হয়।’
এবার ইরিনার বাবার মুখে কিছুটা বিভ্রান্তির ছাপ ফুটে উঠল। সে আগের কর্কশ কন্ঠ বদলে বললো, তুমি টিউশনি করিয়েই গাড়ি বাড়ি সব কিনে ফেলেছো?…

কথার এক পর্যায়ে ইরিনাকে ডেকে আনা হলো। সে মাথা নিচু করে আসলো রুমে। পরনে একটা হালকা নীল রঙের শাড়ি। মাথার চুল খোলা। কোন সাজগোজ নেই। এত সাধারণের মধ্যে তাকে যেন আরো বেশি অসাধারণ লাগছে। ঠোটে লিপিস্টিক, কানে কানেরদোল, মুখে মেকআপ এসব থাকলেই যেন তাকে মানাতো না। আমি খুব বেশিক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম না। এক পলক দেখেই মাথা নিচু করে ফেলেছিলাম। তার বাবা কোন ভাবে যাতে সন্দেহও না করে আমাদের আগে থেকে পরিচয় আছে।


বৃষ্টি পড়া বন্ধ হয়েছে। আজকে আর রামিজদের বাসায় যাওয়া হলো না। এখন বাসায় ফিরছি। হাতে এক কেজি কালো জামের প্যাকেট। ইরিনা দেখে নিশ্চয় খুশি হবে।

সন্ধ্যা হয়ে এলো বাসার কাছাকাছি আসতে আসতে। চারদিকে ভীষণ নির্জন। জায়গাটা ভালো না। সন্ধ্যা হতে হতে সকলে এই রাস্তায় চলাচল বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করে। ডাস্টবিন থেকে ময়লার দুর্গন্ধ আসছে। পকেট থেকে রুমাল বেড় করে নাকে চাপলাম। একটা ভালো চাকরি পেলে প্রথম কাজ হবে একটা ভালো জায়গায় বাসা নেয়া।

বাসায় পৌছে গেলাম। একটু পরেই আবার ইরিনাকে দেখতে পাবো, ভাবতেও মন ভালো হয়ে যায়। অথচ আজকে সকালেও দেখলাম, প্রতিদিনই দেখছি। কয়েক বছর পর পর আমাদের দেখা হচ্ছে এমন কিছু না, তবু অনুভূতিটা যেন এমনই। ইরিনা এখন শুধুই আমার, অন্যকারো নয়- এই বোধের সংস্পর্শে আসলে, এত দুঃখের মাঝেও মনে হয় জীবনটা খারাপ না।

প্রায় ১০ মিনিট পর্যন্ত টোকা দেয়ার পরও কেউ দরজা খুলছে না। আমি চিৎকার করে ইরিনাকে ডাকতে লাগলাম। কোন সাড়াশব্দ নেই। বাসার ভেতর থেকে কোন শব্দও আসছে না। শুনশান নীরবতা। রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে প্রস্তুতি নিলাম দরজা ভাঙ্গার। এক লাথিতেই দরজাটা বিকট শব্দ করে পড়ে গেলো। ধীরে ধীরে কয়েক পা আগালাম সামনে। সবকিছু কেমন এলোমেলো, অগোছালো। চেয়ারটা উল্টানো। বাথরুমের দরজা খোলা। টেপ বন্ধ করা হয়নি। পানি পড়ছে তো পড়ছেই। বেডরুমে যেয়ে চোখে পড়লো রুমের একটা কোণে পড়ে আছে ইরিনার শাড়ি। ঠিক তার পাশে… আমার বুক  উঠল। ধপধপ করছে ভেতরটা। কী হয়েছে না হয়েছে তা ভাবারও বোধশক্তি হারিয়ে ফেললাম।