1
New ফ্রেশ ফুটপ্রিন্ট
 
ফ্রেশ!
REGISTER

মানুষের চিন্তাধারা

Now Reading
মানুষের চিন্তাধারা

“লেবু বেশি চিপলে তেতো হয়ে যায়” বা “দড়িতে বেশি টান দিলে দড়ি ছিড়ে যায়” জাতীয় প্রবাদের সাথে আমরা কম-বেশি সবাই পরিচিত। আমরা সবাই চাপাচাাপিতে একটু বেশিই ওস্তাদ। রিলেশনের পরে নিজের প্রেমিক/প্রেমিকাকে একান্তই নিজের সম্পত্তি মনে করে থাকি আমরা। ছেলেরা তার প্রেমিকার জন্য সংবিধান দিয়ে দেয়, “ফোনে বেশি কথা বলবা না”… আননোন না্ম্বার রিসিভ করবা না”… কোন ছেলে বন্ধু থাকা যাবে না…ফেসবুক ডিএক্টিভেট করে দিবা.. বা থাকলেও ফেসবুকে চ্যাটিং করবা না…. নিজের ফটো আপলোড করবা না…. ক্লাস শেষ করে বাসায় চলে আসবা, কোথাও ঘুরতে যাবা না… নিজের ফোন সব সময় সাথে রাখবা.. আমি ফোন দেয়া মাত্রই রিসিভ করবা… কখনো যেন ওয়েটিং না পাই….. অমুক জায়গায় যাবে না. হেন করবা না, তেন করবা না… ইত্যাদি আরো কত নিষেধাজ্ঞা।” মেয়েরাও কম না, “স্মোক করবা না.. ড্রিংকস করবা না… মেয়েদের দিকে তাকাবা না.. কোন মেয়ের সাথে কথা বলবা না…. ঘুরতে যাওয়ার কথা চিন্তাও করবা না…অমুক পোলার সাথে মিশবা না.. ব্লা ব্লা ব্লা… ইত্যাদি।….

মানছি এটা অধিক ভালোবাসারই একটা বহিঃপ্রকাশ। তাই অন্য কারো সাথে কথা বলতে দেখলে বা ঘুরতে যেতে দেখলে হিংসা হয়….. আমি চাই না আমার মনের মানুষটি হারিয়ে যাক বা অন্য কারো সাথে চলে যাক। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা মানেই অপরাধের প্রথম ধাপ। আমার ঘনিষ্ট বড়ভাই ‘লিও দা’ বলেন, “ঈশ্বর যদি আদম-হবাকে ‘সেই গাছের’ ফল খেতে নিষেধ না করতেন, তবে কখনোই পাপের সৃষ্টি হতো না”…… এবং ব্যাপারটা সত্যিই…. আমি যদি আমার গার্লফ্রেন্ডকে সব ব্যাপারেই লিমিটেশন দিয়ে দেই তাহলে দুটা সমস্যা হয়-

১। মিথ্যা বলার প্রবণতা বাড়ে
২। মানুষটির আসল রূপ চেনা যায় না…

ধরলাম আমি আমার প্রেমিকাকে ফেসবুকে বসার কথা নিষেধ করে দিলাম বা চ্যাটিং করতে মানা করলাম। সে হয়তো প্রথম প্রথম আমার ভয়ে ফেসবুকে বসবে না.. কিন্তু কয়েকদিন পর অলস সময় কাটাতে ফেসবুকে বসলো বা চ্যাটিং করলো… আমি তা জানতেও পারলাম না.. আমি যদি জিজ্ঞাসা করি তাহলে আমাকে খুশি করার জন্য ব্যাপারটা চেপে যাবে। প্রেমিকা ভাববে, “আমি তো অল্প সময়ের জন্য ফেবু তে বসছিলাম, ও জানতে পারলে অনেক রাগ করবে, না বলাটাই ভালো।” এমনি করে ধীরে ধীরে মিথ্যা বলার প্রবণতা বাড়বে। কিন্তু আমি যদি তাকে নিষেধ না করতাম তবে সে কখনোই আমাকে ভয় পেয়ে কিছু লুকাতো না… সব কিছুই আমার সাথে শেয়ার করতো। আমার প্রেমিকার নিজের একটা জগত থাকতেই পারে…. তার বন্ধু-বান্ধবের সাথে ঘুরতে যেতেই পারে…. তার একান্ত ব্যক্তিগত জগতকে তো আমি ছোট করে দিতে পারি না…. সেই অধিকারটা আমার থাকা উচিত নয়। আমি যদি তাকে সত্যিই ভালোবাসি, তবে তার আশেপাশের জগতকেও আমি ভালোবাসতে পারবো।
আর দ্বিতীয় যে ব্যাপারটা তা হল, প্রেম/রিলেশন হল সারাজীবন একসাথে থাকার পূর্বপ্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম। এই সময়ে আমরা একে অন্যকে চিনতে পারি.. জানতে পারি… বুঝতে পারি। তাই আমি যদি তাকে একটা নির্দিষ্ট বাউন্ডারির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখি তবে কখনোই তার আসল চরিত্র বুঝতে পারবো না। যে সত্যিকারেই আমার মনের মানুষ, তাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিলেও আমার হয়েই থাকবে, আর যে মানুষটি আমার জন্য না, তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখলেও আমার অগোচরে তার নিজস্ব কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
সবশেষে আসল কথা হল, নিজের মধ্যে সততা আর স্বচ্ছতা থাকলে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হয় না.. স্বাধীনভাবে যে ভালোবাসাটা আসে, সেটাই সত্যিকারের ভালোবাসা… এর জন্যই কথায় বলে, “ভালোবাসা আর ‘সকালের প্রাকৃতিক ডাক’ ভেতর থেকে আসতে হয়…. চাপাচাপি বা জোর করে কখনোই তা সুসম্পন্ন হয় না।

“লেবু বেশি চিপলে তেতো হয়ে যায়” বা “দড়িতে বেশি টান দিলে দড়ি ছিড়ে যায়” জাতীয় প্রবাদের সাথে আমরা কম-বেশি সবাই পরিচিত। আমরা সবাই চাপাচাাপিতে একটু বেশিই ওস্তাদ। রিলেশনের পরে নিজের প্রেমিক/প্রেমিকাকে একান্তই নিজের সম্পত্তি মনে করে থাকি আমরা। ছেলেরা তার প্রেমিকার জন্য সংবিধান দিয়ে দেয়, “ফোনে বেশি কথা বলবা না”… আননোন না্ম্বার রিসিভ করবা না”… কোন ছেলে বন্ধু থাকা যাবে না…ফেসবুক ডিএক্টিভেট করে দিবা.. বা থাকলেও ফেসবুকে চ্যাটিং করবা না…. নিজের ফটো আপলোড করবা না…. ক্লাস শেষ করে বাসায় চলে আসবা, কোথাও ঘুরতে যাবা না… নিজের ফোন সব সময় সাথে রাখবা.. আমি ফোন দেয়া মাত্রই রিসিভ করবা… কখনো যেন ওয়েটিং না পাই….. অমুক জায়গায় যাবে না. হেন করবা না, তেন করবা না… ইত্যাদি আরো কত নিষেধাজ্ঞা।” মেয়েরাও কম না, “স্মোক করবা না.. ড্রিংকস করবা না… মেয়েদের দিকে তাকাবা না.. কোন মেয়ের সাথে কথা বলবা না…. ঘুরতে যাওয়ার কথা চিন্তাও করবা না…অমুক পোলার সাথে মিশবা না.. ব্লা ব্লা ব্লা… ইত্যাদি।….

মানছি এটা অধিক ভালোবাসারই একটা বহিঃপ্রকাশ। তাই অন্য কারো সাথে কথা বলতে দেখলে বা ঘুরতে যেতে দেখলে হিংসা হয়….. আমি চাই না আমার মনের মানুষটি হারিয়ে যাক বা অন্য কারো সাথে চলে যাক। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা মানেই অপরাধের প্রথম ধাপ। আমার ঘনিষ্ট বড়ভাই ‘লিও দা’ বলেন, “ঈশ্বর যদি আদম-হবাকে ‘সেই গাছের’ ফল খেতে নিষেধ না করতেন, তবে কখনোই পাপের সৃষ্টি হতো না”…… এবং ব্যাপারটা সত্যিই…. আমি যদি আমার গার্লফ্রেন্ডকে সব ব্যাপারেই লিমিটেশন দিয়ে দেই তাহলে দুটা সমস্যা হয়-

১। মিথ্যা বলার প্রবণতা বাড়ে
২। মানুষটির আসল রূপ চেনা যায় না…

ধরলাম আমি আমার প্রেমিকাকে ফেসবুকে বসার কথা নিষেধ করে দিলাম বা চ্যাটিং করতে মানা করলাম। সে হয়তো প্রথম প্রথম আমার ভয়ে ফেসবুকে বসবে না.. কিন্তু কয়েকদিন পর অলস সময় কাটাতে ফেসবুকে বসলো বা চ্যাটিং করলো… আমি তা জানতেও পারলাম না.. আমি যদি জিজ্ঞাসা করি তাহলে আমাকে খুশি করার জন্য ব্যাপারটা চেপে যাবে। প্রেমিকা ভাববে, “আমি তো অল্প সময়ের জন্য ফেবু তে বসছিলাম, ও জানতে পারলে অনেক রাগ করবে, না বলাটাই ভালো।” এমনি করে ধীরে ধীরে মিথ্যা বলার প্রবণতা বাড়বে। কিন্তু আমি যদি তাকে নিষেধ না করতাম তবে সে কখনোই আমাকে ভয় পেয়ে কিছু লুকাতো না… সব কিছুই আমার সাথে শেয়ার করতো। আমার প্রেমিকার নিজের একটা জগত থাকতেই পারে…. তার বন্ধু-বান্ধবের সাথে ঘুরতে যেতেই পারে…. তার একান্ত ব্যক্তিগত জগতকে তো আমি ছোট করে দিতে পারি না…. সেই অধিকারটা আমার থাকা উচিত নয়।

গল্পঃ নীলাঞ্জনা

Now Reading
গল্পঃ নীলাঞ্জনা

arjansoul_1417015196_1-01.jpg

অফিস থেকে বাসায় ফিরে রাসেল ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত এগারোটা। বাসায় কেউ নেই। রেহানা এখনো হাঁসপাতাল থেকে আসেনি। রেহানা তার স্ত্রী। পেশায় একজন ডাক্তার। সরকারী হাঁসপাতালে ডিউটি শেষ হলে ধানমণ্ডিতে একটা বেশ নাম করা প্রাইভেট হসপিটালে বসে। সব কাজ শেষ করে রেহানা বাসায় ফিরে প্রায় সাড়ে বারোটায়। ততক্ষণে রাসেল খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পরে। রাসেল একটি সরকারী ব্যাংক এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অফিস অনেক আগেই শেষ হয়, কিন্তু বাসায় এসে এতটা সময় একা থাকতে ভাল লাগে না। অফিস শেষে রেস্তোরায় বা কফি-শপে বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে আড্ডায় মেতে উঠে। আর বৃহস্পতিবারে বারে গিয়ে ড্রিংক করে। এই হল রাসেলের বর্তমান জীবন-যাপন।
আজ বৃহস্পতিবার ছিল। রাসেল কিছুটা অন্যমনস্ক। সে রেহানাকে ফোন দিল। রেহানা বলল আজ তার আসতে দেরী হবে। সুতরাং রাসেল যাতে খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পরে। দাম্পত্য জীবন নিয়ে রাসেলের কোন অভিযোগ নেই। দিব্যি কেটে যাচ্ছে দিন। দুইজনের সংসার। বাচ্চা-কাচ্চা নেয় নি এখনো। যে যার মত জীবন উপভোগ করছে।
রাসেল ফ্রেশ হয়ে এসে সোফায় বসলো। আজ ড্রিংক করে আসায় কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না তার। একটা সিগারেট ধড়িয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ পর আকাশ ভেঙে বৃষ্টি শুরু হল। ভিজে মাটির ঘ্রাণ, দমকা হাওয়া আর বৃষ্টির ছিটে রাসেলকে কেমন উদাস করে দিচ্ছিল। কেন যেন তার ইচ্ছে হচ্ছিল কেউ একজন এক কাপ চা বানিয়ে দিত তাকে। অথবা পরম মমতায় তাকে জড়িয়ে ধরে একসাথে এই বৃষ্টি রাত উপভোগ করত। হঠাৎ যেন রাসেলের অতৃপ্ত যৌবন কাউকে খুঁজছে। কিন্তু কে সে? রাসেল ভেবে পায় না। রেহানা? কিন্তু রাসেল তো রেহানাকে ঠিক মত বুঝতেই পারে না। তাহলে কে সে? নীলাঞ্জনা? হ্যাঁ, নীলাঞ্জনা। রাসেলের জীবনে এক নীলাঞ্জনা ছিল। দমকা হাওয়া আর বৃষ্টির শব্দে রাসেল যেন কল্পনায় ডুবে যাচ্ছিল।
তখন রাসেল সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে। জীবনে অর্থ, লোভ-লালসা কিছুই ছিল না তখন। শুধু ছিল শ্বেত-শুভ্র মন, আর পবিত্র এক ভালবাসা। কলেজে যেত। ঘুরে বেড়াত আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিত। একদিন কলেজ থেকে বাসায় আসার পথে রাসেলের জীবনে শুরু হয় নতুন এক উন্মাদনা। সেদিন হাস্যোজ্জল কিছু স্কুল ফেরত মেয়েদের মধ্যে একটি মেয়ে রাসেলের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। সেই মেয়েটি ছিল নীলাঞ্জনা। রাসেল যেন চোখ ফেরাতে পারছিল না। তার সকল অনুভূতিগুলো যেন থমকে গিয়েছিল। অদ্ভুত সুন্দর সেই হাসি। খোলা চুলে বাতাস যেন ইচ্ছে করেই দোলা দিচ্ছিল। এরপর থেকে প্রতিদিন রাসেল দূর থেকে নীলাঞ্জনা কে দেখত আর অদ্ভুত মুগ্ধতায় হারিয়ে যেত অন্য এক দুনিয়ায়। এভাবে প্রায় এক মাস রাসেল নীলাঞ্জনাকে দেখে কাটিয়ে দিল। একদিন সে চিন্তা করলো নীলাঞ্জনার সাথে কথা বলবে। সেদিন রাতে রাসেলের আর ঘুম আসছিল না। দেখা হলে কি বলবে নিজের মধ্যে গুছিয়ে নিচ্ছিল। কয়েকবার আয়নার সামনে রিহার্সালও করল। পরদিন রাসেল রাসেল রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ তার বুক ধর-ফর করা শুরু হল। নীলাঞ্জনা আসছে। যত কাছে আসছে রাসেলের হৃদকম্পন বাড়তে থাকে। নীলাঞ্জনা যখন কাছে চলে এসেছে তখন রাসেল ডাক দিল,
নীলাঞ্জনা।
নীলাঞ্জনা বেশ অবাক হয়ে বলল,
আমাকে ডাকছেন?
হুম।
কিন্তু আমার নাম তো নীলাঞ্জনা না।
এই একটা কথায় রাসেলের সারা রাতের প্রস্তুতি কর্পূরের মত ঊবে গেলো। সে ইতস্তত করে বলল,
না, মানে, আমি তোমাকে নীলাঞ্জনা বলে ডাকি।
কখন! আপনার সাথে তো আগে কখনো কথা হয় নি। কে আপনি?
না, মানে, আমি রাসেল। তোমার নাম কি?
বৃষ্টি।
বাহ খুব সুন্দর নাম। কোন ক্লাসে পড়?
ক্লাস নাইন।
কিন্তু আপনি আমাকে কি বলার জন্য দাড় করালেন?
না, কিছু নাহ। এমনি।
এমনি-এমনি মানুষকে দাড় করিয়ে সময় নষ্ট করবেন না। আসি।
না, নীলাঞ্জনা, দাড়াও। কিছু কথা ছিল।
আমার নাম বৃষ্টি। নীলাঞ্জনা না।
সে যাই হোক। আমি নীলাঞ্জনা বলেই ডাকব। নীলাঞ্জনা আমি গত এক মাস ধরে তোমাকে দেখছি। খোলা চুলে তোমার হাসি আমি এক মুহূর্তও ভুলতে পারছি না। ভালবাসি তোমাকে। অনেক ভালবাসি। ভালবাসবে আমাকে?
নীলাঞ্জনা অবাক দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর রাসেলের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে কিছু না বলে হেঁটে চলে গেল। রাসেলও একসাথে অনেকগুলো কথা গড়-গড় করে বলে নিজেকে একটু অদ্ভুত লাগছিল। সে চুপ-চাপ দাঁড়িয়ে রইল।
পরদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। রাসেল ছাতা নিয়ে নীলাঞ্জনার স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। একটু পর স্কুল ছুটি হলে নীলাঞ্জনা যখন বের হল, রাসেল দৌড়ে গিয়ে নীলাঞ্জনার মাথায় ছাতা ধরল। নীলাঞ্জনা কিছু না বলে নিঃশব্দে হাঁটছিল। রাসেলও চুপ-চাপ হেঁটে যাচ্ছিল। হাঁটতে-হাঁটতে একটা সময় তারা নীলাঞ্জনার বাসার কাছে চলে আসে। তখন নীলাঞ্জনা রাসেলের দিকে তাকাল। একটু হেসে বলল,
ভালবাসি। আর ‘নীলাঞ্জনা’ নামটাও অনেক সুন্দর।
রাসেল হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। রাসেলের যেন কথা আটকে গেছে। কিছু বলতে পারছিল না সে। নীলাঞ্জনা সেই চীরচেনা হাসি দিয়ে চলে গেল। রাসেল হাত থেকে ছাতাটা ফেলে দিয়ে খুব জোড়ে দৌড়াতে শুরু করল। এক দৌড়ে কলেজের মাঠের মাঝখানে গিয়ে থামল। হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল সে। অঝর ধাড়ায় বৃষ্টি পড়ছিল তার সারা শরীরে। প্রথম প্রেমে হতাশ হওয়ার অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সফল হতে পেরে সে সব চাইতে খুশি। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সব চাইতে ভাগ্যবান ব্যক্তিটি সে।
হঠাৎ রাসেলের কল্পনায় ছেদ পড়ল। ফোন বাজছে। রেহানা ফোন করেছে। রাসেল ফোন ধরল। ওপাশ থেকে রেহানা বলল,
বাহিরে অনেক বৃষ্টি হচ্ছে। আজ আর বাসায় আসছি না। আমি গাড়ি নিয়ে খালার বাসায় যাচ্ছি।
হুম। সাবধানে যেয়ো।
আমি পৌঁছে ড্রাইভারকে দিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি।
রাসেল আর কিছু না বলে ফোন রেখে দিল। রান্নাঘরে গিয়ে এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসে বসলো। চায়ের কাপে চুমুক দিতে-দিতে ভাবছিল, কত সুন্দর ছিল নীলাঞ্জনার সাথে কাটানো সময়গুলো। কতবার নীলাঞ্জনার কোলে মাথা রেখে শুয়ে ছিল সে। নীলাঞ্জনা আদর করে বলত, ‘ঘুমিয়ে পড় বাবু’। আর রাসেল সাথে-সাথে চোখ বন্ধ করে ফেলত। প্রায় চার বছরের প্রেম। চার বছর পর পরিবর্তন হল অনেক। রাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিল। নীলাঞ্জনা কলেজে। হঠাৎ রাসেলের বাবা মারা গেল। অনেক দায়িত্ব এসে পড়ল রাসেলের উপর। লোভ-লালসাহীন ছেলেটি হঠাৎ টাকার পেছনে ছোটা শুরু করল। ভার্সিটিতে ক্লাস, তারপর পায়ে হেঁটে টিউশনি, ঘামে ভেজা শরীর এসব কিছুই রাসেলের নির্বিঘ্ন জীবনটাকে অনেক জটিল করে দিল। আস্তে-আস্তে সে ভুলে যাচ্ছিল কীভাবে ভালবাসতে হয়। ভুলে যাচ্ছিল প্রথম প্রেম নীলাঞ্জনাকে। নীলাঞ্জনাও সব বুঝত। সেও কোন অভিযোগ করত না। সময় যত কাটতে থাকে জীবন তত কঠিন হতে থাকে রাসেলের। তার একটাই চিন্তা কবে মিলবে মুক্তি। একটা সময় সে ভুলেই যায় নীলাঞ্জনার কথা। সে জীবন গুছাতে অনেক ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নীলাঞ্জনা ঠিকি মনে রেখেছিল রাসেলকে। সে শুধু অপেক্ষার প্রহর গুনত। কিন্তু কখনো বলতো না রাসেলকে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়া শেষ করে রাসেল ভাল সরকারী চাকরী পেয়ে গেল। কিন্তু ততদিনে নীলাঞ্জনার কি হল এসব নিয়ে একটুও ভাবে নি রাসেল। এরই মধ্যে তার পরিচয় হয়েছিল রেহানার সাথে। রেহানা তখন ডাক্তারি পড়ছে। রাসেল যখন বেকার তখন প্রায়ই তার পাশে ছিল রেহানা। কিছুদিন পরই রাসেল রেহানাকে বিয়ে করল। কিন্তু হঠাৎ নীলাঞ্জনা কোথায় হারিয়ে গেল রাসেল জানে না। কখনো জানার প্রয়োজন বোধও করেনি।
চা শেষ করে রাসেল ফোন টা হাতে নিলো। অনেক দিন আগে সেভ করা নীলাঞ্জনার নাম্বারটা বের করে ফোন দিল। রিং হচ্ছে। রাসেলের বুকে যেন প্রথম প্রেমের ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। প্রায় পাঁচ বছর পর সে নীলাঞ্জনার সাথে কথা বলবে। ফোন রিসিভ হল। ওপাশ থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ হ্যালো-হ্যালো করে যাচ্ছে। রাসেল চুপ করে রইল। একটু পর ফোনে শুনতে পেল, একটা বাচ্চা ছেলে কাঁদছে। হয়ত ঘুম ভেঙে যাওয়ায় কাঁদছে। আর চীরচেনা একটা মেয়ে কণ্ঠ পরম মমতা অথবা ভালবাসায় বলছে, কাঁদে না বাবু; ঘুমিয়ে পড়।

ফুটপ্রিন্ট লেখক লগিন