পুরোনো দিনগুলোর প্রেম। (২য় পর্ব)

Now Reading
পুরোনো দিনগুলোর প্রেম। (২য় পর্ব)

১ম পর্ব।

১ম পর্বের পর।

প্রদীপ— সাত সাগর তের নদী পাড়ি দিয়ে হয়তো আমি তোমার জন্য ১০১টি নীলপদ্ম আনিতে পারিবো না, রুপকথার রাজকুমারের মতো হয়তো তোমাকে আমার রাজকুমারী করে রাখতে পারিবো না। তবে হ্যা, এই পৃথিবীতে যতটুকু ভালবাসার অস্তিত্ত আছে তার সবটুকু দিয়ে তোমাকে ভালবাসিতে পারিবো। ও আমার হৃদয় হরণী প্রথম দর্শনেই আমার অজান্তে আমার হৃদয়, তোমাকে তার স্থানের অধিকারী করে দিয়েছে. এই অতি নগন্য ব্যক্তির স্থান কি তোমার হৃদয়পটে হবে?

নিলীমা— (অবিরাম হাসি)।
প্রদীপ— ঠাট্টা ভাবছেন?
নিলীমা— কেন? সব হাসি কি ঠাট্টার হয়?
প্রদীপ— হাসি অনেক রহস্যময় বস্তু। তা বোঝা বড় দায়।
নিলীমা— আচ্ছা ঠিক আছে আর হাসবো না।
প্রদীপ— আমার কথার তো কোন প্রতুত্তর পেলাম না।
নিলীমা— আজকে আমার সাজ দেখে আপনি নিশ্চয়ই ভেবেছেন এটা কাকতালীয়। না, ইহা ইচ্ছাকৃত। আপনি এমন কিছু বলবেন সেটা আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। সেদিন আমি যখন মন্দির থেকে বের হই তখন দেখি আপনি লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে দেখছেন। বুঝতে দেইনি যে আমি আপনাকে দেখেছি। আজ বুঝতে পারছি সেদিন এমন কেনো করেছিলেন। আপনি যদি সম্মতি দেন আর সময়ক্ষেপন নয় এখনই আমার হৃদয়ের সবস্থানটুকু আপনাকে প্রদান করিলাম। আপনার ইচ্ছা মতো অবস্থান করুন।

প্রদীপ— বালিকার এতো সহজে সম্মতি দেয়ার যথাযথ কারন আছে কি? অতি সহজে পাওয়া কিছু বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
নিলীমা— ভালবাসা বস্তুটি স্বয়ং ঈশ্বরের দান সে কখন যে কাহাকে দিতে বলে তাহা বুঝা নিতান্তই অসাধ্য। এটা মন ও মস্তিষ্ক থেকে আসে।
প্রদীপ—- তোমার নামের মতোই তোমার মনের বিশালতা অসীম।
নিলীমা— আপনিও প্রদীপের আলোর মতো ভালবাসার আলো দিয়ে আমাকে আলোকিত করে রাখবেন আশা করি।
প্রদীপ আর কিছু না বলে অতিদুঃসাহসে নিলীমার হাত ধরে হাঁটা শুরু করলো। তারপর তারা কি কথা বলতে ছিলো তা অজানাই থাক। (পাঠক মহাদয় ক্ষমা করবেন এই সময় তাদের মাঝে আমার না যাওয়াটাই শ্রেয়। তারা তাদের মত করে সময় কাটাক। তাদের এখনের অনুভূতিগুলো লেখায় প্রকাশ করা আমার পক্ষে নিতান্তই অসম্ভব।)

তারপর দুজনে যার যার গন্তব্যে চলে এলো। পরের দিন ক্লাস ফাকি দিয়ে আবার দুজনে দেখা করলো। এই সময়টায় যেনো পৃথিবীর সবকিছুই তুচ্ছ মনে হয়, শুধু দুজন দুজনের পাশে থাকার প্রচেষ্টা।

প্রদীপ— বহুগুণী রমনী তোমার ঐ সুরেলা কন্ঠে একটি গান শোনার সৌভাগ্য কী আমার হবে?
নিলীমা— সবকিছুর অধিকার তো আপনাকে দিয়েছি তাহলে কেন এত সংশয়।
প্রদীপ— তারপরও সব কিছুতে তাড়াহুড়া করতে নেই।
নিলীমা কিছু না বলে গান গাইতে শুরু করলো—

তুমি সন্ধ্যারো মেঘমালা, তুমি আমারও সাধেরো সাধনা,
মম শূন্যগগনবিহারী।
আমি আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা–
তুমি আমারি, তুমি আমারি,
মম অসীমগগনবিহারী ——

গান শেষ করে নিলীমা বললো এখন আপনার সময়। আমি জানি আপনি খুব ভালো আবৃত্তি করেন।
প্রদীপ— আজ না অন্য একদিন।
নিলীমা— কিছু কাজ সময় মতো না করলে পরে সেটার মূল্য কমে যায়।
প্রদীপ—ঠিক আছে করছি—
আমরা দুজনে ভাসিয়া এসেছি
যুগল প্রেমের স্রোতে
অনাদিকালের হৃদয়-উৎস হতে।
আমরা দুজনে করিয়াছি খেলা
কোটি প্রেমিকের মাঝে
বিরহবিধুর নয়নসলিলে,
মিলনমধুর লাজে—
পুরাতন প্রেম নিত্যনূতন সাজে।

এভাবে তাদের দিনগুলো ভালোই যাচ্ছিলো! এটা এমন একটা সময় যে এই সময় সবাই ভালো থাকে। হঠাৎ একদিন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারনে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। আজকের মধ্যেই হলত্যাগ করতে হবে। এটা শুনে প্রদীপ ছুটে নিলীমার হলের দিকে গেলো। কিন্তু হলে প্রবেশ করতে পারলো না। পাগলের মতো চারপাশে ঘুরতে ছিলো। হটাৎ দেখলো নিলীমা তার বাবার সাথে হল থেকে বের হচ্ছে। কিন্তু কথা বলার কোন সুযোগ পেলো না। তারপর হলে ফিরে সবকিছু গুছিয়ে বাড়িতে চলে আসলো। বাড়িতে এসে প্রদীপ একটু অন্যরকম হয়ে গেছে। কারো সাথে তেমন কথা বলে না। একা একা থাকে। কিছুদিন এভাবেই কাটলো। হঠাৎ একদিন প্রদীপের বাবা প্রদীপকে বললো রাতে আমার ঘরে এসো তোমার সাথে কিছু কথা আছে। প্রদীপ বললো ঠিক আছে। রাতে প্রদীপ বাবার ঘরে গেলো।
প্রদীপ— আদাব বাবা! কিছু বলবেন?
বাবা— হুম, বসো। তোমার পড়াশুনা কেমন চলছে?
প্রদীপ— জ্বী, ভালো।
বাবা— ভার্সিটি খুলবে কবে?
প্রদীপ— জানি না বাবা, অনেক ঝামেলা চলছে।
বাবা— দেখো বাবা,আমার শরীরটা বেশি ভালো যাচ্ছে না। আমি চাচ্ছি তুমি এখন বিয়ে করো।
প্রদীপ— কি বলেন বাবা! আমার পড়াশুনা এখনো তো শেষ হয় নি। তাছাড়া আমি এখনো কিছু করছি না। সামনে মাস্টার্স ফাইনাল এক্সাম। তার পর বিসিএস এর প্রস্তুতি। এই সময় বিয়ে!
বাবা— সমস্যা কি? বিয়ের পড়ে পড়বে। তাছাড়া মেয়েও ঢাকায় পড়াশোনা করে বিয়ের পর দুজনে এক সাথে পড়বে। তুমি আমার এক মাত্র সন্তান। আমার যা কিছু আছে তা তোমার জন্য যথেষ্ট। চাকরি ততটা জরুরী না।
প্রদীপ— তারপরও বাবা।
বাবা— আমি কিছু শুনতে চাই না। তোমার কাকা তার বন্ধু কে কথা দিয়েছে। আমিও গিয়েছিলাম তার মেয়েকে দেখতে। তোমার সাথে ভালো মানাবে। এই নাও মেয়ের ছবি আশা করি তোমারও ভালো লাগবে। তুমি এখন আসতে পারো।
তারপর প্রদীপ চলে আসলো। বাবার কথার বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস প্রদীপের হলো না। শুধু প্রদীপ কেনো এই সমাজে সকল সন্তানই বাবার কাছে অসহায়। বাবাদের কথার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস খুব কম সন্তানেরই আছে। প্রদীপ ছবিটি না দেখে ফেলে দিলো। অন্যদিকে নিলীমা কেমন আছে তা নিয়ে প্রদীপ অনেক চিন্তায় আছে। প্রদীপের অনিচ্ছা সত্বেও বিবাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অবশেষে বিবাহের দিন এসে পড়লো। সবাই কনের বাড়ির দিকে যাত্রা করলো। দীর্ঘসময়পর সবাই গন্তব্যে পৌছালো। সেখানে সানাইয়ের প্রতিটা সুর প্রদীপের কাছে ভায়োলিনের করুন সুর মনে হচ্ছিলো। বিবাহের লগ্ন অতিনিকটে। সবাই উদগ্রীব শুধু প্রদীপ ব্যতীত। প্রদীপের মনের অবস্থা বুঝে আদিত্য বললো তোকে স্বান্তনা দেয়ার মতো ভাষা আমার কাছে নেই।
প্রদীপ– নিজের প্রতি খুব ঘৃণা হচ্ছে। স্বার্থপরের মতো আমি তাকে ত্যাগ করে দিতেছি।
এরই মধ্যে বিবাহ কনে এসে প্রদীপের সামনে উপস্থিত। পুরোহিত মশাই বিবাহ কার্যক্রম শুরু করলো। শুভ দৃষ্টিক্ষনে প্রদীপ যা দেখলো তা সে কল্পনাও করে নি। এই তার সেই প্রভাত কন্যা। শুভ দৃষ্টি শুরুর পূর্বেই নিলীমার আঁখি চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। প্রদীপ উঠে ধরার পূর্বেই নিলীমা মাটিতে লুটায়ে পড়ে। বিষ পানে তার শ্বেত মুখখানি নীল হয়ে গেছে। প্রদীপ চিৎকার করে বললো আমার জন্য তুমি এতো কিছু করলে! আমি অনেক স্বার্থপর। আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও, আমার ভালবাসার আলো দিয়ে তোমার জীবনকে আলোকিত করতে পারলাম না।

শীতের সকালে ঘন কুয়াশার ভিতর হালকা রোদের আলোয় যার দেখা হয়েছিলো, বিমর্ষ রাতের অন্ধকারে সে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলো।

(পাঠক মহোদয়, পুরো গল্পটি লেখা হয়েছে অনেক আগের প্রেক্ষাপটে, তাই বর্তমানের সাথে এর অনেক কিছুই মিলবে না। আর এটা শুধুই একটা কল্পিত গল্প। ধন্যবাদ।)

গান ও কবিতা সূত্র: কবি গুরু।
ছবি সূত্র: prothom-alo

পুরোনো দিনগুলোর প্রেম। (১ম পর্ব)

Now Reading
পুরোনো দিনগুলোর প্রেম। (১ম পর্ব)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কারো কাছে এটি অহংকার আর গর্বের নাম, কারো কাছে তীব্র আক্ষেপের নাম, আবার কারো কাছে না জানা একটি নাম। সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজীতে মাস্টার্সে পড়ে একজন। তার নাম হলো, না থাক তার নাম বলার উপযুক্ত সময় এখনো হয়নি। (পাঠক মহোদয়, নাম না বলার জন্য ক্ষমা করবেন তবে উপযুক্ত সময়েই তার নামটা জানতে পারবেন)। তবে আপাতত তাকে “ছেলেটি” বলেই পরিচয় করানো হলো। ছেলেটি থাকে জগন্নাথ হলে। পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী। সাহিত্যে পড়ার কারণে তার মনে রসবোধ আছে অনেক। প্রতিদিনের মতো একদিন শীতের সকালে মন্দিরের পাশ দিয়ে হাটতে ছিলো। হটাৎ সকালের ঘন কুয়াশার ভিতর থেকে নূপুরের নিক্বণ শব্দ শুনতে পায়। শব্দটি তার মস্তিষ্ক থেকে হৃতপিণ্ডে যেতে বেশি একটা সময় নেয় নি। চারদিকে খুজতে থাকলো তবুও নূপুরানীর দেখা পেলোনা। অনেক খোজার পর মন্দিরের ভিতর তার দেখা পেল। সে দেখতে পেল কোনো এক রমনীর পৃষ্ঠদেশ। সুদীর্ঘ ঘনকৃষ্ণ কেশগুলো তার মধ্যমা পর্যন্ত অবস্থান করিতেছে। ছেলেটি তা একনয়নে দেখছে। তখন তার মনের ভিতর কী খেলা করতেছে তা জানা নিতান্তই অসম্ভব। আর ঐ দিকে মেয়েটি একঠায় দাড়িয়ে গভীর সাধনায় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে। কিছুক্ষন পরে মেয়টি প্রার্থনা শেষ করে মন্দির থেকে বের হলো। এতো সময় তাহার পৃষ্ঠদেশ দেখা গেছে। এখন তার অগ্রভাগ দেখার সৌভাগ্য হলো। তার কাজল মিশ্রিত দুটো হরিণির চোখ যা দেখলে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়, হালকা লম্বা মুখমন্ডলে বাকা ঠোট যেন তার সৌন্দর্যকে আরো বিকশিত করেছে। ঠোটের উপরে কালো ছোট্ট তিলটা আরো সৌন্দর্য যোগ করেছে, ছিপছিপে গড়নের দৈহিক আকৃতি, সব মিলিয়ে সে “অনন্য”।

ছেলেটি একটু লুকিয়ে থেকে তাকে যেতে দিলো। রমনী যখন হাটতেছিল তাহার নূপুরের ধ্বনিতে শুধু ছেলেটি কেনো, মন্দিরের ভিতরে থাকা দূর্গাও নিশ্চয়ই খুশি হয়ে আশীর্বাদ দিচ্ছে। সবশেষে বালিকা রিকসা করে তার গন্তব্যে চলে গেল। ছেলেটি পিছন পিছন গেলো কিন্তু হারিয়ে ফেলে। তারপর হলে ফিরে আসলো। রুমে এসে তার রুম মেইট এবং খুব কাছের বন্ধু আদিত্যের কাছে সব কিছু বলে। সেইদিন মেয়েটিকে নিয়েই ভাবতে ভাবতে তার দিন চলে গেলো। এভাবে মেয়েটিকে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই কয়েকদিন চলে গেলো। একদিন সকালে আদিত্য বললো চারুকলায় আজ বসন্ত উৎসব হবে চল যাই। ছেলেটি বললো ঠিক আছে চল। প্রস্তূতি শেষে দুজনে চারুকলায় গেলো। মঞ্চের অতি নিকটে তারা অবস্থান করছিলো। আকস্মিক কে যেন ছেলেটির পাশ দিয়ে দ্রূতগতিতে ছুটলো। ছেলেটি এদিক সেদিক তাকালো তারপর সে যাকে দেখলো তা হয়তো কল্পনাও করেনি। এই সেই প্রভাত বালিকা। মেয়েটি মঞ্চের দিকে যাচ্ছে। পরনে বসন্ত রঙের শাড়ি, অলক মধ্যে ফুলের গুচ্ছ। একটু পর ছেলেটি বুঝতে পারলো নৃত্য করবার জন্য বালিকার আগমন ঘটেছে। ছেলেটির ভাব দেখে আদিত্য বিষয়টা বুঝতে পারছে। সে জিজ্ঞেস করল এই সে মেয়ে? ছেলেটি বলল হুম এই সেই মেয়ে যে এক পলক দেখা দিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলো। আদিত্য বলল আজকে কথা বলতে হবে তার সাথে। ছেলেটি বলল এতো তাড়াতাড়ি আগানো কি ঠিক হবে?? আদিত্য বলল বন্ধু তাড়াতাড়ি না করলে তো আবার হারিয়ে ফেলবে। পরে ছেলেটিও রাজি হলো কথা বলতে। তারপর তারা দুজনেই মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলো। মেয়েটি তখন মাত্র নাচ শেষ করে মঞ্চ থেকে নামছে। আদিত্য ছেলেটিকে বলছে এখন কথা বলার সুযোগ আছে। ছেলেটির অনেক ভয় লাগছে। এই ভয়টা যেন সব পুরুষের মাঝেই বিদ্যমান। সে যেইহোক, যুদ্ধের ময়দানের সাহসী সৈনিক হোক কিংবা শত শত মানুষকে হত্যকারী ফাঁসির দন্ড পাওয়া আসামী হোক নারীর সামনে সবাইকেই আগে “ভয়” নামক শব্দটির সাথে পরিচিত হতে হয়। যাইহোক সেই ভয় কে দূরে ঠেলে দিয়ে ছেলেটি মেয়েটিকে বললো “এই যে শুনছেন আপনার সাথে কিছু সময় কথা বলার সুযোগ পেতে পারি কি?” এই বলে ছেলেটি মেয়েটির সামনে এসে দাড়ালো।
মেয়েটি– কিছু বলবেন কি?
ছেলেটি— আপনার নামটা জানতে পারি কি?
হূঁম! পারেন, আমি নিলীমা। আপনি?
(এতো সময় অপেক্ষা করার জন্য পাঠকদের কাছে কৃতজ্ঞ)
ছেলেটি— আমার নাম প্রদীপ! কোথায় পড়াশুনা করেন?
নিলীমা— চারুকলায় ১ম বর্ষে, আপনি?
প্রদীপ— ইংরেজীতে মাস্টার্স করছি।
নিলীমা— হুঁম! এখন যেতে হবে। ভালো থাকবেন।
এই বলেই নিলীমা হাঁটা ধরল।
প্রদীপ চিৎকার করে বললো— বালিকার দেখা আর কি কখনো পাওয়া যাবে?
নিলীমাও চিৎকার করে বললো— মনে বিশ্বাস রাখুন। হলেও হতে পারে (হাসি)।

অবশেষে প্রদীপ আর আদিত্য হলে ফিরে আসলো। পরেরদিন প্রদীপ একাই চারুকলার দিকে গেলো। অনেক সময় খোজাখুজির পরও নিলীমার দেখা পেলো না। এভাবে দুই, তিনদিন খোজার পর একদিন টিএসসি তে তার দেখা পেলো।
প্রদীপ— এই যে শুনছেন?
নিলীমা— হায় আপনি যে! আমাকে খুজছিলেন নিশ্চয়ই?
প্রদীপ— কিছুটা, একটু সময় হবে কি?
নিলীমা—হুম! হবে, তবে এখন না। বিকেলে আমি এখানেই থাকব। আপনি চলে আইসেন।
প্রদীপ— ঠিক আছে।

বিকেলে প্রদীপ কথামতো টিসএসসি তে গেলো। একটু পরে নিলীমাও আসলো।

প্রদীপ— কেমন আছেন?
নিলীমা— ভালো। আপনি?
প্রদীপ— ভালো। চলেন সামনে হেঁটে হেঁটে কথা বলি।
নিলীমা— চলেন।
প্রদীপ— আচ্ছা আপনার দেশের বাড়ি কোথায়?
নিলীমা— ফরিদপুর। আপনার?
প্রদীপ— গোপালগঞ্জ।
নিলীমা— ফরিদপুর আসছেন কখনো?
প্রদীপ— অনেক আগে একবার গিয়েছিলাম। আমার কাকাবাবু ওখানে চাকরি করে, তার বাসায়।
নিলীমা— আচ্ছা, আপনি আমার পিছু নিচ্ছেন কেনো?
প্রদীপ— কেন বেশি অপরাধ করে ফেললাম? সময় হোক জানতে পারেন।
নিলীমা— তা না, তবে অজানা লোকের সাথে কথা বলতে একটু অস্বস্তি লাগছে আর কি!
প্রদীপ— কেনো পরিচয়তো দিলাম!
নিলীমা— পরিচয় দিয়ে একজনকে চেনা যায় কিন্তু জানা যায় না।
প্রদীপ— বাহ! আপনি তো খুব ভালোভাবে কথা বলেন।
নিলীমা— (হাসি)। আজ যেতে হবে।
প্রদীপ— কাল কি দেখা হতে পারে?
নিলীমা— হুম! হতে পারে (হাসি)।
প্রদীপ— আচ্ছা, এখন আসি।
নিলীমা— ঠিক আছে।

তারপর দুজনে যার যার গন্তব্যে চলে এলো। এভাবে তাদের মধ্যে কয়েকদিন দেখা হলো, কথা হলো, দুজন দুজনকে জানাশোনা হলো। একদিন প্রদীপ ভাবলো নিলীমা কে সে ভালবাসার কথাটা বলেই দিবে। এতো দিন ধরে হৃদয়ের গহীন কোণে একটু একটু যেই অনুভূতিগুলো জমা হয়েছে সেগুলো প্রকাশ করার উপযুক্ত সময় হয়েছে। প্রতিদিনের মতো প্রদীপ নিলীমার সাথে দেখা করতে গেলো।
প্রদীপ— আপনার সাথে কিছু বিশেষ কথা ছিলো।
নিলীমা— হুম, বলেন (হাসি)।
প্রদীপ— আজ না, কাল বলবো।
নিলীমা— ঠিক আছে।
প্রদীপ— কাল বিকেল ৪ টায় কার্জন হল এলাকার পুকুর পাড়ের দিকে দেখা হবে।
নিলীমা— হুম! (হাসি)
প্রদীপ— আচ্ছা, আজ আসি। কাল সময় মতো দেখা হবে।
নিলীমা—- ঠিক আছে।
পরের দিন যথাসময়ে প্রদীপ সেই স্থানে পৌছালো। কিছু সময় অপেক্ষার পর নিলীমা আসলো। আজ নিলীমাকে দেখে প্রদীপ একটু অবাকই হয়েছে কারণ সেদিন সকালে তাকে যেমন দেখাচ্ছিলো আজ ঠিক তেমনই দেখাচ্ছে। সেই পোশাক, সেই সাজসজ্জা। সব থেকে বড় বিষয় হচ্ছে সেই নূপুর। আজ সে নূপুর পড়েছে।
প্রদীপ— অপরুপা আপনাকে স্বাগতম!
নিলীমা— (হাসি)!
প্রদীপ— চলেন হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা যাক।
নিলীমা— আপনার বিশেষ কথা কি এখন শুনতে পারি?
প্রদীপ— নিশ্চয়ই। জানি না আপনি কিভাবে নিবেন। তারপরও বলছি। কারণ কিছু অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে নেই।
নিলীমা— ঠিক বলছেন। লুকিয়ে রাখলে অনুভূতিগুলো মনের ভিতর খেলা করে। তাতে কষ্ট বাড়ে। বলেন কোন ভয় নেই।
প্রদীপ— সাত সাগর তের নদী পাড়ি দিয়ে হয়তো আমি তোমারি জন্য ১০১টি নীলপদ্ম আনিতে পারিবো না, রুপকথার রাজকুমারের মতো হয়তো তোমাকে আমার রাজকুমারী করে রাখতে পারিবো না। তবে হ্যা, এই পৃথিবীতে যতটুকু ভালবাসার অস্তিত্ত আছে তার সবটুকু দিয়ে তোমাকে ভালবাসিতে পারিবো। ও আমার হৃদয় হরণী প্রথম দর্শনেই আমার অজান্তে আমার হৃদয়, তোমাকে তার স্থানের অধিকারী করে দিয়েছে. এই অতি নগন্য ব্যক্তির স্থান কি তোমার হৃদয়পটে হবে?
চলবে————-
( পাঠক মহাদয় অপ্রত্যাশিতভাবে এখানে শেষ করার জন্য ক্ষমা করবেন। অতিশীঘ্রই ২য় পর্ব দেয়া হবে।)

ছবিসূত্র: Prothom-alo

সত্যিই ভালোবাসিতো ?

Now Reading
সত্যিই ভালোবাসিতো ?

শক্ত করে হাতটা ধরতে না পারলে, হাতটা না ধরাই ভালো।  প্রেম এবং তথাকথিত ভালোবাসার প্রতি আমার বরাবরই কিছুটা অনাগ্রহ ছিল এবং এখনো আছে। ওনারা বলেন একটা সম্পর্ক গড়তে সময় দিতে হয়, ভালোবাসতে হয়। আমার কাছে সবকিছুই আবেগের অপচয় মনে হয়। ৭-৮ টা বছর একজনকে নিয়ে স্বপ্ন দেখলাম আর তারপর বিয়ে হলো আরেকজনের সাথে। আর বিয়ের ঠিক পরেই তার সাথে আবেগ আর অনুভূতির বাণিজ্যে বড় একটা ভাটা পড়লো। ব্যতিক্রমও আছে কিন্তু সেটা শুধুই ব্যতিক্রম। হ্যাঁ , ব্যতিক্রম। সবারই একটা গল্প থাকে। কেউ প্রকাশ করে আর কেউ করে না। কেউ পুরোনো গল্পের চরিত্রের নানা রঙে আটকে থাকে, কেউ সামনে এগিয়ে যায়। প্রায় ৬-৭ মাস লাগে একজনকে বুঝতে , তার পছন্দ- অপছন্দ জানতে। তার পরে কারো কারো বোধোদয় হয় এটা আসলে একটা “মেয়ার ক্রাশ” ছিল তার! ভালবাসাটাকে আমরা বেশ সস্তা করে ফেলেছি এই ফোন আর ইন্টারনেট এর যুগে। রাতকে ভোর করে দিয়ে ফোনে যার সাথে কথা বলতে ভালো লাগতো তাকেই আর কিছুদিন পর ভালো লাগছে না ! সহজ করেই বলে দিচ্ছি, “আমার আর তোমার প্রতি ইন্টারেস্ট নেই। মুভ অন” আসলে ভালো না লাগারই কথা কারণ তাদের মধ্যেতো নতুন করে  খুঁজে পাওয়ার  কিছু থাকে না একটা সময় পরে। তারা খুব সহজেই বোরড হয়ে যায়। অনুভূতি আর আবেগের ব্যবচ্ছেদ হয়ে যায় মেসেঞ্জার, হোয়াটস্যাপ আর মিনিট কেনার মধ্যে ! ওয়েট…বলছিনা যারা ফেস টু  ফেস ডেটিং এ যাচ্ছে তাদের মধ্যে সমস্যা নেই। এতো জায়গায় যায় তারা যে একটা সময় এ চেক ইন দেয়ার আর কোনো প্লেস থাকে না।

আবার কেউ নিজের ব্যক্তিস্বাধীনতা কে বিকিয়ে দেয়া শুরু করে ফেইসবুক এর পাসওয়ার্ড দেয়া থেকে শুরু করে, নিজের সর্বস্ব বিলীন(!) করে দিয়ে। ভালোবাসলে কি সত্যিই নিজের পছন্দের আর ভালো লাগার জায়গায় ভাটা পরে? কখনোই না। তাহলে সেই সম্পর্কে মনের মিল নেই।আর এমন সম্পর্কে  ভাটা পরে চোখের পলকে। তারপর এক সময় বহুদিনের যোগাযোগ এর ফসল “মায়া” কাওকেই এমন দূষিত সম্পর্ক থেকে মুক্ত হতে দেয় না! এই মায়া বারবার সব ঠিক হয়ে যাবার এক মিথ্যা আশ্বাস দেয়। এই মায়ার জাল বন্ধু প্রেমিক জুটিকেও ছাড় দেয় না। ধীরে ধীরে একসময় এই মায়ার জাল বন্ধুত্ব থেকে সৃষ্টি হওয়া প্রেমের সম্পর্কটাকেও  বিষিয়ে তোলে যার শেষ হয় ঘৃণা আর বিদ্বেষ দিয়ে। আর এভাবে অপমৃত্যু ঘটে দুইজনের মানুষের ব্যক্তিত্বের মিষ্ট সৌজন্যতাবোধেরও! হুটহাট ব্লকিং আর সিম পরিবর্তন এর হিড়িক লেগে যায়। আফসোস! স্মৃতি থেকেও কি আপনি এভাবেই সব মুছে ফেলতে পারবেন? যদি সেটা করতে না পারেন তবে কেন এই বিদ্বেষ আর ঘৃণা পোষণ? আমরা কি পারি না একটু ধীরস্থির হয়ে, আরেকটু ম্যাচিউর আচরণ করতে? জানি, কষ্ট লাগে অন্য কারো সাথে তাকে হাসতে দেখলে অথবা নিউজ ফিড এ অন্য কারো সাথে চেকইন দেখলে। …কিন্তু ওই যে সময়, সময়ের সাথে সাথে মায়াও ও সৌজন্যতাবোধে রূপ নেয়। তবে কেন এতো ফরম্যাটিং এর আয়োজন? আপনার শত চেষ্টার পরও সে “মুভ অন” করতে চাইলে তাকে মুক্ত করে দিন এবং সেটা হাসিমুখেই করুন।

আর যারা লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করে তারাতো “মহাচোর !” আমি তোমাকে চিৎকার করে “ভালোবাসি” বলতে চাই কিন্তু কে জানি দেখে ফেলে ?! হাহ ! শুধুই একটা দীর্ঘশ্বাস! হ্যাঁ, চিৎকার করে জানান দিতে না পারলে তাকে হাতটা ধরতে দিয়েন না ! লুকুচুরি খেলতে নামিনি আমরা কেউ। আমার মতো রোবটিক মেয়ে অনেক বেশি চিন্তা  করে কারণ সে “মহাচোর” হওয়ার চেয়ে “মহারিসার্ভ” হয়ে থাকাকে প্রাধান্য দেয়। “ভালোবাসি” বলার আগে হাজারোবার চিন্তা করে। কেন করে ? সে আবেগের অপচয়ে বিশ্বাসী না তাই !

“চলো, আমরা বড় একটা পথে হাঁটতে শুরু করি।”

-“আমরা হাঁটতে শুরু করেছিলাম হঠাৎ ওর বাসায় একটা বিয়ের প্রস্তাব আসলো। …বাকিটা শুধুই ইতিহাস। ”

“আমি প্রতিদিনই কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে ফেলি।…আমার হাজব্যান্ড এর সাথে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না । ” কিভাবে ভালো যাবে সম্পর্ক? স্বপ্নতো দেখেছিলো অন্যকাউকে নিয়ে!

“কিরে তুই সিগারেট ধরলি কবে ?”

-“ওকে ভুলতে পারিনা, দোস্ত। জীবনটাকে শেষ করে দিতে ইচ্ছা হয় !”

সংলাপগুলো জীবন থেকেই নেয়া। তাই শুনতে এতো সুপরিচিত লাগছে।

হয়তো ভাবছেন, “মেয়েটা বলছে কি আবোল তাবোল ? এই মেয়ে, চিন্তা করে কেউ কি
‘আই লাভ ইউ ‘ বলে ? নিশ্চয়ই তুমি অনেক বড় ধাক্কা পেয়েছো!” ঠিকই ধরেছেন অনেক বড় ধাক্কা পেয়েছি জীবন থেকে শিখতে গিয়ে। ভালোবাসাটা ‘বিষ’ না। আমরা যে কেউ যেকোনো সময় কাওকে ভালোবাসতে পারি কিন্তু একবার ভেবে দেখা উচিত যাতে আবেগের অবক্ষয় না হয়, যাতে মোহগ্রস্ত হয়ে নিজেকে গভীর সমুদ্রে হারিয়ে না ফেলি।

“তুমি প্রিন্স / প্রিন্সেস না যে আমাকে এসে জয় করে নিতে হবে। যার পাঁজরের হাড্ডি থেকে তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে , সে এসে তোমাকে নিয়ে যাবে। তোমাকে শুধু করতে হবে অপেক্ষা আর সবর। কি লাভ হবে একটা ভাঙা বিশ্বাসকে জোড়া লাগানোর জন্য “সিইং” করা? তার চেয়ে ঢের ভালো তার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করো একদিন তুমি যার হবে। নিজের ভালোবাসাটাকে সস্তা করো না। নিজের আত্মবিশ্বাসকে অন্যের হাতে তুলে দিয়ো না। নিজের পায়ের নিচের মাটিকে শক্ত করো। আত্মবিশ্বাসী হও! সঠিক সময় এবং সঠিক মানুষের  জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করো! ভালো কিছুই হবে!”- এই কথাগুলো আমাকে আমি নিজেই বলেছি। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে, কেঁদে চোখ ভিজিয়ে যখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছি; তখন নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করেছি, “কি চাই এবং কেন চাই?” তখন মনের গভীর থেকে কে যেনো এই কথাগুলো বলে উঠলো!  বিবেকের শব্দের কম্পনে কেঁপে উঠলো ভঙ্গুর আত্মবিশ্বাস…..আমিও নিজেকে প্রতিদিন প্রস্তুত করি পায়ের নিচের মাটি শক্ত করার জন্য যেন প্রয়োজনে সেই প্রতীক্ষিত মানুষটার হাত শক্ত করে ধরে উঁড়তেও পারি!

গল্পঃ চন্দ্রকথন

Now Reading
গল্পঃ চন্দ্রকথন

শুভ্র আজ সকাল থেকেই কেমন যেন অস্থিরতা অনুভব করছে।আজকের দিনটা তার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আজ একটা জায়গায় যেতে হবে তার। সকাল-সকাল নাস্তা সেরে বেরিয়ে পরল। বাসে উঠে চুপ-চাপ বসে বাহিরের প্রকৃতি দেখছিল আর ভাবছিল।অনেক দূর যেতে হবে তাকে। তবুও প্রতিবারের মত এইবারও শুভ্রর পুরনো স্মৃতি গুলো ভাবতে-ভাবতে সময় কেটে যায়। একটা সময় বাস পৌঁছে গেল। আরও পাঁচ কিলো পথ রিকশায় যেতে হবে। বাস থেকে নেমে সে ঘড়ি দেখল। রাত আটটা বেজে গেছে। চারদিক বেস নিরব। আজ পূর্ণিমা। শুভ্র জানে কিন্তু সে কেন যেন আকাশের দিকে তাকাল না। আশে-পাশে কোন রিকশা দেখছিল না। প্রায় পাঁচ মিনিট পর শুভ্র দেখতে পেল, টিম-টিমে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে খুব দ্রুত গতিতে একটা রিকশা আসছে। রিকশাটা কাছে আসতেই শুভ্র বলল, ‘মামা যাবেন।’
মামা বেস তাড়াহুড়ো করে বলল, ‘কোথায়?’।
শুভ্র বলল, ‘মায়া নদীর ঘাটে’।
মামা বলল, ‘উঠেন’।
শুভ্র দেরি না করে উঠে বসলো। নিরিবিলি পথ ধরে চাঁদের আলয় আগিয়ে চলছে রিকশা। রিকশা যত এগিয়ে যাচ্ছিল, শুভ্রর মনে একটা নারী চেহারা স্পষ্ট হচ্ছিল। একটা সময় রিকশা মায়া নদীর ঘাটে পৌঁছে গেল।
মামা বেস তাড়াহুড়ো করে বলল, ‘মামা নামেন, চইলা আসছি।’
শুভ্র রিকশা থেকে নেমে পকেট থেকে একটা পাঁচশো টাকার নোট মামা কে দিয়ে বলল’ ‘ভাড়া রাখেন’।
মামা পাঁচশো টাকার নোট টা হাতে নিয়ে বলল, ‘ ভাংতি নাই’।
শুভ্র বলল, ‘মামা আমার কাছেও তো নাই। আশে-পাসে কোন দোকানে ভাংতি পান কিনা দেখেন’।
মামা বলল, ‘সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে’। শুভ্র আশে-পাসে তাকিয়ে দেখল আসলেই সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।
রিকশাওয়ালা মামা টাকাটা ফেরত দিয়ে বলল, ‘ভাড়া লাগবে না, যান।’
শুভ্র কিছুটা ইতস্তত করে জিজ্ঞাস করল, ‘মামা আপনার নাম? না মানে পরে আপনাকে খুজে টাকাটা দিয়ে যাব।’
মামা বলল, ‘ জুবায়ের প্রামাণিক।’
এরপর শুভ্র আস্তে আস্তে মায়া নদীর তীরে এগিয়ে গেল।
নদীর তীরে দাঁড়িয়ে শুভ্র এবার চাঁদের দিকে তাকাল। শুভ্রর চোখে পানি জমতে থাকল। চাঁদের আলোয় তার চোখ জ্বল-জ্বল করছিল। হঠাৎ চোখ মুছতে গিয়ে শুভ্র দেখল তার থেকে প্রায় আট-দশ হাত দূরে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখও জ্বল-জ্বল করছে। শুভ্র সন্ত্রস্ত পায়ে লোকটার কাছে এগিয়ে গেল। দেখল লোকটা আর কেও না, সেই রিকশাওয়ালা মামা, জুবায়ের মামা।
শুভ্র ডাকল, ‘জুবায়ের মামা’।
জুবায়ের মামা চমকে তাকিয়ে বলল, ‘ মামা আপনে? এত রাতে নদীর পারে কি করেন?’
শুভ্র উত্তর না দিয়ে বলল, ‘আপনে কি করেন?’।
জুবায়ের মামা বলল, ‘ভালবাসার শব্দ শুনি’।’
শুভ্র বলল, ‘ তাই নাকি? কিভাবে?’
জুবায়ের মামা ইতস্তত করে বলল, ‘মামা সে অনেক কথা। আপনে বুঝবেন না।’
শুভ্র নাছোড়বান্দার মত বলল, ‘ বুঝব, আপনার অনেক কথা গুলো বলেন, আমি শুনব।’
জুবায়ের মামা বলল, ‘ আচ্ছা বলতেসি, কিন্তু শোনার পর কিন্তু হাসবেন না।’
শুভ্র জুবায়ের মামাকে আশ্বস্ত করল, সে হাসবে না।
জুবায়ের মামা বলতে শুরু করল-
মামা তখন আমার জুয়ান বয়স। পড়া-লেখা করি নাই। অনেক দূর থিকা চাচা-বড় ভাইগো সাথে কাজের জন্য এই গ্রামে আসি। তখন এই গ্রামে সব চেয়ে প্রভাবশালী আর অনেক জমির মালিক ছিল আব্দুল মতালিব। আমরা সবাই তারে হুজুর বইলা ডাকতাম। আমার চাচারা তার জমিতে কামলা খাটতো, হুজুরের বাইরের ঘরে থাকত, হুজুরের ঘরেই খাইত। হুজুর আবার মুজুরিও দিত। তো নতুন আইসা আমিও চাচাগো সাথে কামলা খাটা শুরু করলাম। ভালই কাটতেছিল দিনগুলা। হুজুরও খুব ভাল পাইতেন আমারে। হুজুরের সংসারে ছিল তার স্ত্রী, এক ছেলে আর তার ছোট মেয়ে। ছোট মেয়ের নাম ছিল নাজমা বেগম। বয়স খুব বেশি হইলে পনের কি ষোল। কিন্তু সে ছিল খুব চঞ্চল, আর দেখতে ছিল পরীর মত। আমরা যখন জমিতে কাজ করতাম, তখন নাজমা জমির আশে-পাসে ঘুইরা বেরাইত। আমি দেখতাম সে আমার দিকে বেস নজর রাখত। আমিও তাকায় থাকতাম পরীর দিকে। আস্তে-আস্তে আমি তারে ভালবাইসা ফেললাম। সেও যে আমারে ভালবাসত আমি বুঝতাম। একদিন অনেক সাহস কইরা গোপনে ওরে বললাম। ভাবছিলাম লজ্জা পাইবো। কিন্তু সে আমারে অবাক কইরা দিয়া বলছিল ‘এতদিনে বুঝলেন?’ এরপর থেকে আমাদের প্রেম শুরু। আমি ওরে পরী কইয়া ডাকতাম। যখন হুজুর কোন কাজে শহরে যাইতেন, তখন আমি আর পরী এই মায়া নদীর তীরে হাইটা বেরাইতাম। প্রায় এক বছর পর হুজুর কইল পরীর নাকি বিয়ে ঠিক করছেন। ভিন গ্রামের চাকুরীজীবী ছেলে। সামনে মাসেই বিয়ে। দুই দিন পর হুজুর বিবাহর কেনা-কাটা করতে শহরে গেলেন। আমি আর পরী আবার নদীর তীরে আসলাম। আমার খুব মন খারাপ ছিল। পরীরও মনে হয় মন খারাপ ছিল, কিন্তু সে আমারে বুঝতে দিল না। হঠাৎ কইরা পরী বলল, ‘চল পালায় যাই।’ আমি বললাম, ‘কেমনে? কই যামু? আমার কাছে তো টাকাও নাই।’ পরী বলল, ‘ওইসব আমি বেবস্থা করমুনে। তুমি এখন যাও। আমি রাইতে বাইরের ঘরে আসলে তুমি বাইর হইও।’ আমরা যে যার মত চইলা আসলাম। ভোর রাইতে পরী বাইরের ঘরে আসলো। আমি নিঃশব্দে বাইর হইলাম। পরী আমার হাতে একটা গামছা বান্ধা পোটলা দিল। দেখলাম ভেতরে সব সোনার গয়না। পরীরে আমি যতবারি কিছু বলতে যাই পরী আমার মুখ চাইপা ধরে। দেখলাম পরীর চোখে পানি। নিঃশব্দে কাঁদতেছিল। ওর কান্না দেইখা আমি ওরে জড়াইয়া ধরলাম। মনে হইতছিল অন্য এক দুনিয়ায় আছি। হঠাৎ একটা শব্দ পাইয়া চেতন ফিরল। দেখলাম হুজুর ওযু করার পানি হাতে আমার দিকে তাকায়া আছেন। হুজুর তখন আর কিছু বললেন না। পরী দৌড়াইয়া ঘরে ঢুইকা গেল। আমি হতবুদ্ধি হইয়া দাঁড়াইয়া ছিলাম। দেখলাম হুজুর নামাজে গেলেন। নামাজ থেকে আইসা আমারে ডাকলেন। আমি বের হইয়া দেখলাম হুজুরের সাথে আরও দুইজন কামলা। তারা আমারে বেদম মাইরধর করল। প্রায় আধঘণ্টা পর হুজুর আমারে বললেন, ‘তোর জিনিসপত্র গুছাইয়া চইলা যা। আর একটা কথা, আর কোন দিন যাতে তোরে এই গ্রামে না দেখি।’ আমি সব গুছাইয়া যখন বাইর হইলাম তখন পরী দৌড়াইয়া আইসা একটা চিঠি আমার হাতে দিয়া আবার দৌড়াইয়া চইলা গেল। আমি গ্রাম ছাইড়া বের হইয়া চিঠিটা খুললাম। দেখলাম পরী লেখছে, ‘অনেক ভালবাসি তোমারে। সারাজীবন ভালবাসমু। জানি অনেক কষ্ট হইতাছে তোমার। যত দিন আমারে ভুলতে পারবানা ততদিন প্রতি পূর্ণিমা রাইতে ওই মায়া নদীর পারে আসবা। দেখবা ওই চাঁদ তোমার সব কষ্ট ভুলায় দিব। আর আমারে কখনো দেখতে আইস না। ভাল থাইক।’ এরপর আমি পাশের গ্রামে কষ্টে-বিস্টে থাকা শুরু করি। রিকশা চালাই। আর প্রতি পূর্ণিমা রাইতে এই মায়া নদীর পারে আসি।
জুবায়ের মামার কথা থামল। কিছুক্ষণ নীরব থাকল। এরপর শুভ্র বলল, ‘আপনার পরী এখন কেমন আছে?’
জুবায়ের মামা বলল, ‘ভাল, দুইটা ছেলে সন্তান আর স্বামীরে নিয়া ভালই আছে।’
শুভ্র বলল, ‘আপনি বিয়ে করেছেন?’
জুবায়ের বলল, ‘না মামা। অপেক্ষা করি কবে এই চাঁদ আমার সব কষ্ট ভুলাইয়া দিবে।’
শুভ্র চুপ করে রইল। জুবায়ের মামা বলল, ‘মামা আপনে এইখানে আসছেন ক্যান?’
শুভ্র একটু চুপ করে থেকে বলল আমারও একটা গল্প আছে। হয়ত সেই গল্প অন্যরকম। তবে সেই গল্পেও চাঁদটা খুব কষ্টের। সেই গল্পও ভালবাসার গল্প। আবার কোন পূর্ণিমাতে আপনাকে সেই গল্প শোনাবো।
এরপর মায়া নদীর তীরে দুই জন নীরব বসে থাকে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে মনে-মনে কি যেন বলে। চাঁদের সাথে তাদের যেন কত কথা। আস্তে-আস্তে সময় যায়, আর চাঁদটাও সরে যেতে থাকে। অস্ফুট স্বরে শুভ্র বলতে থাকে, ‘চন্দ্রমায়া, চন্দ্রমায়া অনেক ভালবাসি তোমাকে’।