ভূতুড়ে গ্রাম

Now Reading
ভূতুড়ে গ্রাম

আজব এক গ্রাম ! চারিদিকে শুধু গাঢ় সবুজের ঘন বন ! গা ছমছমে শুনশান পরিবেশ। মনে হয় এ গ্রামে কোন মানুষ নেই, আবার কদাচিৎ দু চারজনকে চোখেও পড়ে যায় ! তবে দিনের আলো থাকতেই যে যার ঘরে ফিরে আসে এবং ভুল করেও আর কেউ দরজা খুলে বাইরে বের হয়না। কেমন যেন আতঙ্কে বসবাস করে এখানকার মানুষজন। তাদের সেই অজানা আতঙ্ক ভেদ করে আদিখ্যেতার সম্পর্ক গড়ে তোলা অসম্ভব। তবুও নিজেদের প্রয়োজনেই আগ বাড়িয়ে সম্পর্ক তৈরী করার চেষ্টা !

পাহাড়ের গা ঘেঁষে ছোট্ট গ্রামটি। লোকসংখ্যাও কম এবং শান্ত পরিবেশ। সন্ধ্যার পরে যেন আরো ভয়ঙ্কর‌ শান্ত থাকে গ্রামটি। কখনও থেকে থেকে শেয়ালের ডাক আর বন্য কুকুরের কখনও ডাকাডাকি আবার কখনও একদমই নীরবতাকে ভেদ করে কুকুরের অস্বাভাবিক কান্না !

আর মাঝে মাঝে দূর জঙ্গল থেকে কেমন এক অচেনা কোন পশুর ডাকের আওয়াজ ভেসে আসে। কিন্তু খেয়াল করতে গেলেই থেমে যায় ডাকটি ! সত্যিই কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগে পরিবেশ। তবে খুব একটা গুরুত্ব না দেয়ার চেষ্টা করে নতুন আসা দম্পতি। মানুষগুলোও তেমন আগ্রহী নয় কেউ কারো সাথে আলাপচারিতায়। সব যেন নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। সন্ধ্যাটা জানালা খুলে দেখছিলো নীলা আর স্বামী ফেরার অপেক্ষা করছিলো।খেয়াল করল একঝাক মানুষ এলো এবং নিজেদের ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলো কিন্তু মুখে কোন কথা নেই। আশ্চর্যের কথা হল, এত তাড়া কিসের সবার ঘরে ফেরার !

নীলার স্বামী ফিরলে নীলাও যেন নিশ্চিন্ত হল ! নীলার স্বামী রাজু জানায়, বাড়ি ফিরতে যেদিন ভরা সন্ধ্যা হয়ে যায় সেদিন জঙ্গলের পাশ থেকে যে রাস্তা ধরেই আসতে হয়, ঐ পথ দিয়ে হাঁটার সময় মনে হয় কিছু একটা পেছনে ফিরতে বাধ্য করে আর পেছনে ফিরলেই একটা অদ্ভূত মায়ার সৃষ্টি হয় ! যেন জঙ্গলটি কাছে ডাকছে !

একদিন নিকটবর্তী প্রতিবেশীর কাছ থেকে অদ্ভূতুড়ে রহস্যের জাল ভেদ করার চেষ্টা করে নীলা ও তার স্বামী ! কুশল বিনিময় শেষে জানতে চাইলে অপ্রস্তুত হয়ে গেলেও আরো কিছু রহস্যে ঘেরা ঘটনা শুনে হতবাক হয়ে যায় ওরা !

ঘটনাগুলো এমন যে,

– সন্ধ্যার পরে যারাই একাকী বের হয় তারা আর জীবিত ফেরেনা। অদ্ভূত অঙ্গভঙ্গী এবং রক্তশূণ্য মৃতদেহ পাওয়া যায় বনের ভেতরে অথবা পাহাড়ের চূড়ায় ! আবার কাউকে আর খুঁজেই পাওয়া যায়না কোনদিন। অনেকে অন্ধকারে দূর জঙ্গলে এক প্রকারের অশরীরি পশুর মতন কিছু দেখতে পেয়েছে কিন্তু দিনের বেলায় হাজার চষেও এমন কিছু দেখা যায়নি। এগুলো কি এবং কোথায় থাকে কেউ জানেনা। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছে ওরাও দলবদ্ধ থাকে। এমনকি পোষা প্রাণীও যদি বাইরে বের হয় তবে পরদিন মৃত পাওয়া যায়। আর প্রায়ই অদ্ভূত অচেনা কোন প্রাণীর ডাক শোনা যায়। ডাকটি খেয়াল করে শুনলে কেমন যেন ঝিম ধরে যায় ! আর নিজের অজান্তেই অনেকে ভুল করে বাইরে বের হলে সে আর ফেরেনা ! আবার কখনও হঠাৎ করে থেমে যায় ডাকটি !

বনবিভাগকে জানানো হয়েছিলো। তারপর তারা একটি টিম এবং সাহসী কিছু গ্রামবাসী সারাদিন, রাত এক করে খুঁজেছে কিন্তু কোন পশু, প্রাণী কোন কিছুরই অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তারপর সবাই বেশ নিশ্চিন্তে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও আমোদফূর্তিতে দিন যাপন করতে লাগলো। সব ভয় যেন মিলিয়ে গেছে এবং হঠাৎ একদিন আবার রহস্যজনকভাবে একের পর এক হারিয়ে যেতে লাগলো, অনেকের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গেলেও অনেকের মৃতদেহ আর খুঁজেও পাওয়া গেলনা। তখন সবাই নিশ্চিত হল যে কোন রাক্ষস অথবা অশরীরি কিছইু হবে। ওরা রাতের অন্ধকারে শিকারে বের হয় !

তারপরে অনেকেই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে কিন্তু নিতান্ত নিরুপায় যারা বা পৈতৃক সম্পত্তির টান যারা উপেক্ষা করতে পারেনি তারাই থেকে গেছে এ গ্রামে। কিন্তু কেউ জীবনের ভয়ে সন্ধ্যার পরে একা বের হয়না।

আজকাল দলবদ্ধভাবেও তেমন কেউ বের হয়না। সবাই বিকেলেই কাজ শেষ করে ঘরে ফিরে দরজা জানালা বন্ধ করে দেয়। হাজার কান্না বা শব্দেও বের হয়না কেউ। ভয় কাটানোর জন্য সন্ধ্যা রাতেই ঘুমিয়ে পড়ে আবার কেউ কেই ধর্ম কর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকে আবার কেউ কেউ বিনোদনের ব্যবস্থা করে নিজের ঘরে। যেন ঐ ঝিম ধরা আওয়াজ বা ডাক শুনতে কেউ না পায় !

একদিন সকালে প্রতিবেশীর থেকে বিদায় নিয়ে নতুন আসা দম্পতি চলে যায় ভূতুরে গ্রাম ছেড়ে! তবে যাবার আগে আরেকটি ঘটনা বলে যায় আর সাবধান করে দিয়ে যায় !

ঘটনাটি হল, আগের রাতে সেই ঝিম ধরা ডাক শুনে তাদের পোষা কুকুরটি জানালা দিয়ে বাইরে চলে যায় ! কুকুরটির খোঁজে নীলাও দরজা খুলে বাইরে এক পাঁ রাখতেই স্বামী তাকে আটকায় ! সেই মুহূর্তে তারা দুজনেই তাদের বাড়ির আশে পাশে কোন কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করে। তারপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে ভয় সংশয় নিয়ে সারারাত পোষা কুকুরটির ভাবনায় বসে থাকে। কিন্তু খুব সকালে তারা কুকুরটির খোঁজে বের হলে কুকুরটির অর্ধেক অংশ খুঁজে পায় পেছনের দিকটায় ! এই ঘটনার পরে তারা গ্রাম ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয় এবং চলেও যায় চিরদিনের জন্য…।

জীবনের কালবৈশাখ

Now Reading
জীবনের কালবৈশাখ

#ঝড়

পশ্চিম আকাশটা ঘন কালো রঙের জমাট পিন্ড হতে দেখেই হাতের গতি বেড়ে গেলো ফাহিমার। ঝড় শুরু হওয়ার আগেই পাতাগুলো বস্তায় ভরে শুকনো জায়গা খুজে পৌছুতে হবে নাহলে সারাদিনের এত খাটুনি সব বৃথা!

পাতাগুলো জমানো শেষ, বস্তাটাও প্রায় ভরে এসেছে এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এলো রুহুল। ফাহিমার ছোট সৎ ভাই।

-আফা, মাও জলদি বুলায়। মোক্ পাঠালো, যা তো বুইনা কট্টুক আগালে দ্যাখে আয় গিয়ে। মুই হাঁপাতি হাঁপাতি এলুম,মাগো! কিমুন হাঝ জমি আসিছে আকাশত! জলদি জলদি চলেক্।
দ্রুত শ্বাস নেয়ার ফাঁকে এতগুলো কথা বলে রুহুল আবার হাঁপাতে লাগলো।

ভাইয়ের কথা শুনে ফাহিমা আরো জলদি পাতা ভরা শুরু করলো।

– মরন আমার। মুই যেন বসি বসি ঘাস চিবুচ্চি! এত মুখ না চালাই হাত চালাই সায়াইয্য কর দিকিনি মুর সাথ্।
রুহুলকে কষে একটা ধমক লাগালো ফাহিমা।

মনে মনে গজ গজ করছে ও।
ইহ! নিজে করবার পারলোনা আবার জলদি করি যাবার জন্য তাড়া দেয়া কিসের জন্যি! মুক্ যেনো চাকরানী পেইয়ে গ্যাছেনে তিনি। সৎ মেয়ে বলি এত আলগা দরদ বেইয়ে পরিছে একেবারে।হুহ!

গজ গজ করতে করতে বস্তা ভরা শেষ হলো ফাহিমার। রুহুলকে নিয়ে বস্তাটা মাথায় নিয়ে হাটছে যত দ্রুত সম্ভব। হাটছে আর বার বার আকাশের দিকে সভয়ে দেখছে দুজনেই,না জানি কখন কাল বৈশাখি তার তান্ডব শুরু করে দেয়!

-“জলদি পা চালা ছ্যামড়া।”
রুহুলকে ধমক দিলো ফাহিমা। নিজেও পা দ্রুত করলো। গ্রামের কাঁচা রাস্তায় চলে এসেছে ওরা।
মোয়াজ্জিনকে দেখা যাচ্ছে মসজিদের চালা বাঁধছে গুনা দিয়ে। আগের বারের ঝড়ে চালা উড়ে চলে গিয়েছিলো বল্লা পাড়া গ্রামের আম গাছের উপর! এইবার আবার চালা হারানো চলবেনা মুয়াজ্জিনের।

উঠানে বস্তাটা রাখতেই মুরগীর বাচ্চাগুলো হাতে নিয়ে মা এগিয়ে এলো।

-মাইও রে, গরুডা ছুটি গ্যাছে, ধরি আনতো জলদি করে।

-হ যাচ্চি। কোন দিক গ্যালো?

-পুব দিক।

হনহন করে পুব দিকে হেটে চলেছে ফাহিমা। মার উপর রাগ করেছে। সামান্য একটা গরু ঠিক মতো বেঁধে রাখতে পারলোনা।

-হ সৎ মেইয়ে তো, তাই আবার পাঠালে!

হাটতে হাটতে কলুদের আম বাগানে চলে এসেছে ফাহিমা। গরুটার দেখা নেই এখনো। আকাশটা এখন একদম ঘন কালো কালির রূপ ধরেছে, চারদিক রাতের মতোই আঁধার,বাতাসও থেমে আছে সেই কখন। ভয়ঙ্কর ঝড় আসবে, তারই লক্ষণ।

হঠাৎ ঝড়টা শুরু হলে কি করবে ভেবে চিন্তিত হয়ে বিপন্ন, উদভ্রান্ত চোখে গরুটাকে খুজতে শুরু লাগলো আবার। সামনে আবছা আলোয় একটা ঝোপ নড়ে উঠতে দেখে আস্তে এগিয়ে গেলো ফাহিমা। গরুটা নয়তো? কিছুতেই ভয় পাওয়ানো চলবেনা ওটাকে এখন নয়তো আবার ছুট লাগাবে।

ঝোপটার আরেকটু কাছে যেতেই ওপাশে একটা ছায়া নড়ে ওঠলো। না না, একটা না! তিনটা ছায়া! পেছন থেকেও একটা ছায়া এগিয়ে এসে জাপটে ধরলো ফাহিমার মুখ!
তখনই বিকট শব্দে বাজ পড়লো কাছেই কোথাও।

শো শো শব্দে বাতাস শুরু হলো।
কাল বৈশাখি!
ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়ে গেলো সব।
সেই সাথে ফাহিমার জীবনটাও!

ঝকমারি প্রেম

Now Reading
ঝকমারি প্রেম

এবাড়ির বউদের গায়ের রঙ কেমন মাজাঘষা। চকমকি ব্লাউজ আর শাড়ির ভাজে ঘিয়ে বরন পিঠের একাংশ বের হয়ে থাকে।

যে বউটা হারুন পাল আর কার্তিকদের দু’বেলা চা বিস্কুট নাস্তা দিতে আসে সে লম্বা সিঁথি টেনে সিদুঁর পরে। ফর্সা কপালের মাঝে সিঁদুর টিপ জ্বলজ্বল করে। বাঁকা ভ্রুর নিচে দুখানা টানা টানা চোখ। কাছে এলে
মিষ্টি প্রসাধনীর সুবাস পাওয়া যায়।

 

হারুন পাল সে বউয়ের গমন পথের দিকের চেয়ে মন্তব্য করে,

-বড়লোকের বউগুলি কেমন সাদা সাদা।

-হ। কত দামী দামী স্নো পাউডার মাখে।

-তারজন্যে নারে। ওরা অনেক পরিষ্কার থাকে।পাকা দালান ঘরে স্যান্ডেল পায়ে হাঁটে।

-তার সত্য কইছস। আর আমগো বউ ঝিরা…

কার্তিক বাকি কথাটুকু শেষ করে না। ন্যাতানো টোস্ট বিস্কুট চায়ে ভিজিয়ে বড় বড় কামড়ে সাবাড় করে। সুরুত সুরুত টান দিয়ে চায়ের কাপ খালি করতে থাকে।

হারুন পালের চা খাওয়া শেষ। সে লুঙ্গির গাঁট থেকে ম্যাচ বের করে বিড়ি ধরায়। লম্বা টান দিয়ে নিজের বউয়ের কথা ভাবতে থাকে।

 

মালতী বিয়ের সময় গায়ের রঙ ফর্সা না হলেও বেশ হালকা ছিল। রোদে পুঁড়ে সে দেহ ছাই রঙ ধারন করেছে। মালতী সাত সকালে চাল ডাল ফুটিয়ে পুকুরপাড় থেকে এটেল মাটির চাক নিয়ে আসে। পরনের শাড়ি হাঁটু অবধি তুলে নেয়। গাছকোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে মাটির চাকের উপর লাফাতে থাকে। সরু সরু কালচে পা, নখের ফাঁকে হ্যাজা।

সে পায়ে দক্ষভাবে মাটি পিষতে থাকে। কুমোরপাড়ার আরসব বউদের মত মালতীরও শাড়ির আঁচল ঠিক থাকে না। ছেঁড়া ব্লাউজের ফাঁকে নগ্ন কাঁধ পিঠ উঁকি মারে। কুমোরপাড়ার পাশ দিয়ে কত নাম না জানা পথিক বাজারে যায়। তারা মালতীদের দিকে এক নজর তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়।

এমুখ না দুর্গা ঠাকুরের না কৃষ্ণকলির। একবার তাকানো চলে বারবার নয়! তাই এমুখে কেউ তাকায় না।

 

মালতীরা জন্ম থেকেই ঝগড়া করতে জানে। বিশ টাকার মাটির পাতিল পঁচিশ টাকা বিক্রি করার জন্য নথ নেড়ে নেড়ে তর্ক করে। পাঁচটা টাকা বাড়তি পেয়ে বিক্রি করতে না পারলে আফসোস করে আবার পাঁচ টাকা বেশি দামে বিক্রি হলে আরো দুটাকা বেশি কেনো দাম হাকলো না তাই ভেবেও হতাশায় মরে!

পাশের বাড়ির বিনতির মায়ের পোষা বিড়াল তরকারীতে মুখ দিলে অকথ্য ভাষায় ঝগড়া করে।মালতীর স্বামী হারুন পাল জুয়া খেলে সব টাকা খুইয়ে এলে হারুনের বাপ-দাদা চৌদ্দগোষ্ঠী তুলে গালি দেয়।

মালতী তিনবেলা ভরপেট ভাত আর বছরে দু’খানা মোটা কাপড় পেলেই নিজেকে তৃপ্ত মনে করে। পুজোর সময় ঠাকুর গড়িয়ে দু’পয়সা বাড়তি ইনকাম হয়। তা দিয়ে পুজোর বাজার করা হয়।বড় মেয়েটার দু’চার বছর পর বিয়ে দিতে হবে। বাপের তো সে খেয়াল নাই। মালতীকেই সব দিক দেখতে হয়।

সুবোধ ঘোষালের বাড়ির ঠাকুর গড়ানো শেষ।বায়না টাকা আগে দিয়েছে আজ বাকিটুকু পরিশোধ করার কথা। হারুন পাল খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবে চৌকিতে এসে শুয়েছে। পান চিবোতে চিবোতে মালতী কাছে এল। আঙুলের ডগা থেকে একটুখানি চুন জিবে ছুঁইয়ে জিজ্ঞেস করল,

-ঘোষালরা টাকা দিছে?
-হ।
-কই রাখছ?
-শার্টের পকেটে।

শার্টের পকেট থেকে টাকা বের করে মালতী গুনতে থাকে। ভ্রু কুঁচকে জানতে চায়,

 

-তিনশ টাকা কম ক্যান?
-তাতে তোর বাপের কী?
-বাপ তুলি কথা কইবা না কলাম।
-ইহি। মাগীর বাপের লাগি দরদ কত!

 

এক কথায় দু’কথায় দুজনের গলার স্বর বাড়তে থাকে। হারুন পাল তেড়ে মারতে আসে। মালতী ঝাটা হাতে রুখে দাঁড়ায়,

-বান্দীর পুত, গায়ে হাত তুলি দেখ একবার।

কী মনে করে হারুন পাল শান্ত হয়। আলনায় ঝোলানো শার্ট গায়ে চড়িয়ে বিড়বিড় করতে করতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

 

এতক্ষনের ঝগড়ায় মালতীও পেরেশান।চৌকিতে এসে লম্বা হয়ে শুয়ে পরে। হাত পাখা খুঁজতে হাত বাড়াতে পলিথিনে মোড়া কী যেন হাতে ঠেকে। মালতী উঠে বসে। হারিকেনের সলতে একটু বাড়িয়ে দেখতে পায়,

“পলিথিনে মোড়া চকমকি কাপড়ের ব্লাউজ পিস!”

খুশিতে পান খাওয়া লাল দাঁত বেরিয়ে আসে মালতীর। তিনশ টাকার রহস্য জেনে আর কিছুক্ষন আগের ঝগরার কথা মনে পড়তেই আধহাত জিভ টেনে কামড়ে ধরে হাসে,

-ইহ! বান্দির পুতের দেহি পিরিত জাগছে!!

আজও কেন এমন হয় পর্ব—৬

Now Reading
আজও কেন এমন হয় পর্ব—৬

– ঘরের দরজা খোলা । শয়তান গুলো আমার জন্যেই খুলে রেখেছে  হয়তো । আমি ঢুকতেই বাদল দরজাটায়  ছিটকিনি লাগিয়ে দিলো । আমি দেখলাম ঘরে একটি খাট । খাটের দুইপাশে আলমারি আর টেবিল ।  খাটের সামনে মেঝেতে মাদুর পাতা । ওরা মেঝেতে বসে বসে মদ গিলছিল । আমাকে দেখে দিগুন উৎসাহে দুজনে খাটে হেলান দিয়ে আয়েশ করে ধূমপান ও শূরা পান চলছিলো । ধোঁয়ায় ঘর ভরে আছে । দুর্গন্ধ আর ধোঁয়ায় আমার কাশির সাথে বমিও আসছিলো ।

– মুখে বিজয়ের হাসি হেসে অভি বলল,   ‘এলে তাহলে ।’

-‘উপায় কি ছিল  আর ?’

-‘হুম , বুদ্ধি যত জলদি হবে তত ভালো হবে , মনে রেখো ।’

-‘যেটা করা উচিত সেটাই তো করে ফেলা চাই । ‘ বলে কাশতে লাগলাম । ইসস কি ধোঁয়া যে খেতে পারে ।

-‘কাশি  হচ্ছে  তাই না ? সুন্দরী এমন ধোঁয়া সহ্য তো করতেই হবে ।  ‘এসো বস ।‘ ওর পাশে বসতে  ইঙ্গিত করলো অভি ।

-‘লম্বু বলল, টানতেও হবে । এই নাও একটু খেয়েই দেখো দারুণ জিনিস ।‘ বলে ও ওর হাতের সিগারেটটা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে ।

-আমি স্পর্শের দুরত্বে বসে কাশতে কাশতে  বললাম   ‘সময় দাও, তোমাদের চেয়ে বড় স্মোকার হয়ে দেখিয়ে দেব । আজ থাক ।’  মনে মনে ভাবছি ওদেরকে কিভাবে সামলাবো । ওরা ক্রমশই মাতাল হচ্ছে । আর আমার ভেতর ভয় বাড়ছে । আমি যথেষ্ট সাহসী মেয়ে । তাই এখানে আসতে  পেরেছি । জীবন মান হাতে নিয়ে ।  তারপরও–।

–  ‘কি সুন্দরী , এতো দূরে বসে কেন ? কাছে এসো,  একটু ঢেলে টেলে দাও, তোমার জন্য এতদিন অপেক্ষা করেছি , একটু তো রহম করো । হা হা হা । হা হা হা । দুজন কি কি  যে বলছে আর হাসছে ।

– আমি সহাস্যে বললাম,  ‘নিশ্চয়ই , আগে খাবারটা খেয়ে নাও ।‘

– ‘পরে  খাবো ।‘  অভি বলল ।

-‘এতো ভালো করে রেঁধেছি ,শুধু তোমাদের জন্য । সেই কোন সকালে গঞ্জে গিয়েছি । কত কি এনে রেঁধেছি । গরম জিনিসটা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে যে । এতো কষ্ট করে কি হোল  বল ?’   মিষ্টি হেসে বললাম ,’ তিনজন একসাথে ড্রিংক করবো তারপরে ,প্লিজ ।‘

-অভি বলল, ‘না না , পরে  খাবো । আগে তোমার সাথে বসে কথা বলি । খাবার তো জরুরি নয় ,আসল জিনিস তো তুমি ।‘

-আমি কৃত্তিম দুখের ভাব করে বললাম, ‘জানি তোমরা পয়সাওয়ালা আমার হাতের খাবার কি আর ভালো লাগবে ?’

– ‘ আরে তা নয় , কি বলছ । আয় তো অভি খেয়ে নি । সেটাই ভালো ।‘ বাদল বলল । ‘খিদেও পেয়েছে । কই সাজিয়ে দাও ।‘

-আমি মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে   ভেতর থেকে প্লেট বাটি এনে খুব যত্ন করে ওদেরকে আপ্যায়ন করতে লাগলাম । ওরা যখনই না বলছে অমনি  আমি আরও এক চামচ খাবার পাতে তূলে দিতে লাগলাম । অভি খেতে খেতে অন্য টিফিন বাটির দিকে ইঙ্গিত করে বলল,  , ‘ওটায় কি ? ওটা তো খুললে না । ওখানে আবার কি খাবার ?’

-‘আমার হৃৎপিণ্ডে কেউ যেন খামছে ধরল । কষ্টে নিজেকে সামলে  আমি মধুময় হেসে বললাম, ‘ ওটা ? ও আচ্ছা ।  আমার প্রিয় গেস্ট, তোমরা কি জানো না, প্রিয়জনকে খাবারের পর কি দিতে হয় ?’

-ওরা বোকার মত তাকিয়ে থাকলো চোখে প্রশ্ন নিয়ে । আরে অবুজ ভালো মানুষেরা  তোমাদের জন্য পায়েস আর মিষ্টি এনেছি ।  খাবারের পর সেটা দিচ্ছি ।‘

-‘ভালো মানুষ ?’ কথাটা অভি হজম করতে পারল না । নিজেই নিজের প্রতি সন্দেহে কনফিউজ চোখে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো । কিন্তু মাতাল মন মাতাল শরীর বেশি চিন্তা করতে পারল না ।

-‘ বাহ বাহ ‘ । বাদল খুব খুশির গলায় বলল ,  ‘শিক্ষিত মানুষের কাজই আলাদা । কেমন করে  কি করা উচিত ওরা ভালো জানে ।‘

-‘হুম ঠিক । এবার অভি বলল, চমৎকার খাবারের সাথে যদি চমৎকার সুন্দরী নারী থাকে তো তার তুলনা হয় না । এর চেয়ে সুখ আর কি হতে পারে ?‘ আচমকা হাত বাড়িয়ে আমার হাত টেনে ধরে বলল ,  ‘তুমিও খেতে বসে যাও সুন্দরী । সত্যি চমৎকার রেঁধেছ ।‘

–   ওদের সাথে খাবো না বলেই আমি বাসায় আগেই খেয়ে নিয়েছিলাম । আমি কষ্টে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম , ‘আজ রান্নার খাটুনিতে খুব খিদে পেয়েছিলো তো খেয়ে এসেছি । তোমরা মুল খাবারটা শেষ করো । মিষ্টি একসাথে  খাবো ।‘ আর কিছু না বলে দুজন সানন্দে গোগ্রাসে  গিলছে । মদ আর খাবার ।

– আমি মাদুরের এক কোনায় বসে বসে ওদের দেখছি । আর মনে মনে মিনিট  গুনছি । পাঁচ মিনিট , দশ মিনিট , পনর মিনিট । দুজনেরি হাত আস্তে আস্তে  স্লো হয়ে আসছে । মুখে খাবার দিতে গিয়েও পারছে  না । ঢলছে । কাঁপছে ।

– নিজেদের এই অবস্থা দেখে ওরা আমার দিকে বোকার মত তাকাল ।  ‘কি হল , হাত কাঁপছে কেন ? ম্যাডাম কি খাইয়েছ ? কি ছিল খাবারে ? শক্তি পাচ্ছি না কেন ?’ একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে , প্রশ্ন করছে কি হচ্ছে ?

– আমি নিরাপদ দুরত্বে বসে আছি । হাত বাড়িয়ে আমাকে ছুঁতে চাইলো । ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসার কারনে হাত তুলতে পারছিল না । ভয়ংকর খুনে চোখে তাকিয়ে আছে ওরা ।

– হাসছিলাম । ঘৃণার হাসি । প্রতিশোধের হাসি । বিজয়ের হাসি । হাত বাড়িয়ে ওরা আমাকে ধরতে চাইলো বার বার । আমি নাগালের বাইরে  ঠায় বসে তাকিয়ে থাকলাম ঠাণ্ডা চোখে । ওরা এক সময় ঢলে পড়লো জ্ঞান হারিয়ে ।

-ওদের চেতনা নেই । এবার আমাকে দ্রুত কাজ সারতে হবে । অপর টিফিন বাটিটা খুললাম । ভেতর থেকে বের করলাম  দড়ি,  স্কচ টেপ  কাজল পেন্সিল । এবার ওদের শরীর থেকে কাপড় গুলো খুলে নিলাম । লজ্জায় ঘৃণায় গা রি রি করছে আমার । এবার দড়ি দিয়ে দুজনের হাত পা বেঁধে ফেললাম ।  খাটের দুই পায়ের সাথে দুজনের কোমর বাধলাম । এবার একটি দড়ির টুকরো নিয়ে দড়ির একমাথা  দিয়ে অভির এবং  অন্য মাথা দিয়ে বাদলের  বিশেষ অঙ্গকে বাধলাম ।

– এরপর কাজল পেন্সিলটা হাতে নিয়ে  বসলাম । ওদের সামনে । পানি ছিটিয়ে অপেক্ষা করছিলাম ওদের সচেতন হবার ।

–  ওরা আস্তে আস্তে চেতনা ফিরে পেতে শুরু করলো । এবং যখন বুঝল যে , ওদের সাথে কি করা হয়েছে,  আমাকে ওদের ডিকশনারিতে যত গালাগালি আছে সব উজাড় করে দিলো । তার পর ভয় । ওদের কতোটা ক্ষমতা আছে আর ওরা কি কি করতে পারে তার ফিরিস্তি দিতে লাগলো ।

– আমি নির্বাক বসে আছি । এতো কিছু বলেও  কাজ হচ্ছে না দেখে কাকুতি মিনতি শুরু করলো । অবশেষে চিৎকার জুড়ে দিলো ।

 

চলবে………………।

 

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা- রচনাকাল

১২/০৫/২০১৭ইং

 

 

আজও কেন এমন হয় -পর্ব — ৪

Now Reading
আজও কেন এমন হয় -পর্ব — ৪

দুতিন দিন হল আমি একাই যাচ্ছি । পঞ্চম  দিন ওদের দেখা পেলাম । আমাকে দেখে সোজা সামনে এসে পথরোধ করে দাঁড়াল। আমি এগিয়ে যেতে চাইলে একজন সামনে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল–   ‘প্লিজ।‘  একি কাণ্ড আমার বুক ধুপ ধুপ করে কাঁপছে । নিজেকে স্বাভাবিক রাখার প্রয়াস পেলাম । লম্বু এগিয়ে এলো , কিছু কথা আছে ম্যাডাম।

— আমি গলা চড়িয়ে বললাম ,  ‘কি ?হয়েছে ?’  কাল গ্লাস এগিয়ে এলো । ওর চোখ দেখা যাচ্ছেনা । কিন্তু মুখ জুড়ে শয়তানি হাসি । বলল , ‘আপনি আপনি করছিস কেন  বাদল ?  ডার্লিংকে কেউ কি আপনি বলে ?   তুমি করে বল ।‘   লম্বু যদি বাদল হয়,  আমি ভাবলাম,  কালো গ্লাস তাহলে অভি । আমার ভাইও কালো গ্লাস পরে । কি সুন্দর লাগে ওকে । মুখ জুড়ে তারুন্য আর সরল মুখের মায়াময় লাবন্যে গ্লাস পরা  ভাইটি  আরও যেন সুন্দর হয়ে উঠে । আর এই অভি ? আস্ত একটা শয়তান লাগে ।  লম্বু মানে বাদল এগিয়ে এসে বলল,  ‘তুমি খুব সুন্দর ডার্লিং ।‘  আমার রাগে শরীর ফেটে  যাচ্ছিল । বললাম,  ‘পথ ছাড়ো বেয়াদপ,  যেতে দাও ।‘

— অভি বলল,  ‘নিশ্চয় যেতে দেব,  নিশ্চয় ।  তার আগে একটু  আবদার আছে । মহামান্য ।‘

— আমি কড়া  ভাষায় বললাম,  ‘তোমাদের মত বেয়াদপের সাথে কোন কথা নেই। সর,  সরে দাঁড়াও।‘

— ‘ডার্লিং কথা তো তোমার শুনতেই হবে ।‘  বাদল বলল । সাথে অভিও গলা মেলাল,  ‘হা শুনতেই হবে ।‘

—‘  আমার শুনার ইচ্ছে নেই সময়ও নেই ।‘ ভেতরে ভেতরে খুব ভয় পাচ্ছিলাম । কিন্তু নিজেকে কঠিন দেখালাম ।

—‘ না ডার্লিং , না , সময় আর ইচ্ছা আমাদের হাতে বন্ধি থাকে । একটু কথা শুনলে তো ক্ষয়ে যাবে না । কথা না বাড়িয়ে মন দিয়ে শুন , আমরা একটা জায়গা খুঁজছি। পিপাসা পেয়েছে তো তাই ।‘

— ‘মানে ?’ আমি কিছুটা বিস্মিত।

— ‘একটু পান টান করতে চাই । পিপাসার্ত  মানুষকে পানিয় দেয়া কর্তব্য তোমার । তাই তোমার বাড়িটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে । আমরা চাই তুমি আমাদেরকে দাওয়াত দাও । খুদারতকে  খাবার দাও । পিপাসার্ত কে  পানীয় দাও । কি ,  ওই দিন বলেছিলাম  না ? মনে রাখা উচিত ছিল ।‘

—লম্বু বলল, আমাদের কথা আমরা ভুলিনা ।  কাউকে ভুলতেও দেই না ।‘

—‘ আমরা পান করবো আর ডার্লিং তুমি তো আছোই । মেহমানদারী করবা । বড়ই  খিদা,  বড়ই  পিপাসা ।‘  জিব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কালো গ্লাস বলল ।

— বাদল খুব উৎসাহের সাথে বলল,  ‘বিদেশী বোতল । তোমার মত সুন্দুরি মেমের জন্য বিদেশী,  আমদানি ‘

— প্রবল রাগে আমার চোখ জ্বালা করে মনে হচ্ছে মাথা ফেটে যাবে । আমি আমার পায়ের দুটো  স্যান্ডেল দু হাতে নিয়ে ওদের দুজনের গায়ে মারলাম । অভির হাতে আর বাদলের পেটে  গিয়ে লাগলো বাড়ি । এবার অভি আমার হাত ধরে ফেলল, এবং আমার চোখের দিকে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,  ‘তোমাকে সাত দিন সময় দিলাম । সাত দিন । তারপর দেখো ।‘

— বাদল বলল,  ‘সাত দিনের মধ্যেই জানাইতে হবে । আমরা এখানেই থাকবো দাওয়াতের অপেক্ষায়।‘

— অভি আমার হাতে জোরে চাপ দিয়ে বলল,  ‘তোমার সাথে সুন্দর সিস্টেমে আসতে চাচ্ছি । অন্য কেউ হোলে—‘ বলে , অনেকক্ষণ আমার দিকে  অর্থ পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঝটকা মেরে আমার হাত ছেড়ে ওরা উল্টো পথে টার্ন করলো ।

— আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছিল । আমি একটা গাছের শিকড়ে বসে অসহায় রাগে কাঁদলাম কিছু সময় । পরে  নিজেকে ধাতস্থ করে স্কুলে রওনা দিলাম । এসব কথা বলার মত কাউকে পাচ্ছিলাম  না । চার পাশ দেখে শুনে যা বুঝলাম , সবাই গা বাচিয়ে চলতে চায় । উল্টো আমাকেই গ্রাম ছাড়া করবে হয়তো । সাধারন নিরীহ নিরুপায় লোক আমার কষ্ট বুঝবে । কিন্তু ওদের চাটুকারী ও অধিনস্থ  যারা তারা নিজেরাই  আগুন দিবে আমার জীবনে ও সেই আগুনে ইন্দনও  দিবে ওরাই । আমার চাই একজন ওয়ান ম্যান আর্মি কেউ । এমন কেউ তো নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও আছে ।  অন্তত সাহসী কেউ । আমারই  চোখে পড়ে নি শুধু ।

— এর পর সুমি সুস্থ হয়ে এলে আমি আবার ওকে নিয়ে স্কুলে যেতে লাগলাম । ওরা এখন আর কাছে আসে না । গান টানও গায় না । ওরা তো আমাকে ওয়ার্নিং দিয়েই রেখেছে তাই দূরে দাড়িয়েই হাসাহাসি করে ।

— নিজের অজান্তেই আমি দিন গুলো গুনছিলাম। আজ সপ্তম দিন । তাই ভেতরে ভেতরে খুব অস্থির হয়ে আছি ।

— বরাবরের মত সুমিকে নিয়ে আজও যাচ্ছিলাম । ওদেরকে আগের জায়গাতেই পেলাম ।  না তাকিয়েও বুঝলাম ওরা আজ চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । কিন্তু কিছুই করলো না।

— বাসায় ফেরার সময়ও ওদের দেখলাম। ওরা কিছুই করলো না , দূরে দাড়িয়ে ফিসফাস করছে ।

— আমার ভেতরে কি ভীষণ উদ্বিগ্নতা ছিল সেটা আমি জানি । ভয়ার্ত দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকাতে তাকাতে জলদি পা চালিয়ে বাসায় এলাম । সুমি ওর বাড়ি চলে গেল । ও রাতে আবার আসবে । আমি নিজের ঘরে এসেই হাত পা ছড়িয়ে খাটে শুয়ে পড়লাম । ভালো লাগছে ।  ওরা কিছুই করলো না । আরও তিনটি দিন কেটে গেছে এভাবেই । কিছুই করলো না ওরা ? এতো ভালো লাগছিলো । নতুন করে নিজের জন্য স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম । সুমির জন্যও ।

—শোনা কোথায় কান দিতে নেই । যতটা খারাপ ওদের ভাবছিলাম ওরা ততটা খারাপ নয় । একটু বিগড়ে গিয়েছে এই আর কি । সঙ্গ দোষ আর বেহিসাবি সম্পদ অনেক সময়ই  মানুষকে বাঁকা পথে টানে । ভাবলাম একদিন ওদেরকে স্কুলে ডেকে সবাই মিলে সুন্দর করে বোঝাবো । ওরা  হয়তো নিজের  অজান্তেই কতোটা  গর্হিত ঘৃণিত  কাজ করছে ।

— দিনগুলো  কাটছে ভারহীন । মনটা ফুরফুরে । এই গ্রাম নিয়ে মনে মনে কত কি করার কল্পনা করছি । নিজেকে নিয়ে , সুমিকে নিয়ে , সুমির মা আর চাচিকে মানে আমার বাড়িওয়ালীকে  নিয়ে । গান বাজিয়ে নিজেও গুন গুন  করছিলাম । ভাবলাম আজ সুমির সাথে রবীন্দ্রনাথ ও তার গান নিয়ে সুমিকে কিছু বলবো । সেই সাথে উনার গানের সাথেও  ওর পরিচয় করিয়ে দেব ।

—রাতে খাবার রেডি করে চলে গেল সফুরা। ও গেলেই মেয়ে সুমিকে পাঠিয়ে দেবে। সুমি এলেই ওকে নিয়ে একসাথে খেতে বসবো। বই পড়ছিলাম। রাতে এই সময়টুকু আমি বই পড়ি। স্কুলের পেন্ডিং কাজগুলো দেখি। সুমি এলে খাবার পর আমরা একটু গল্প গুজব করি, ও স্কুলে কেমন পড়াশুনা করছে সে ব্যপারে কথা বলি। ওকে মাঝে মাঝে পড়া দেখিয়ে দেই। কখনও আবার দুজনই বই পড়তে থাকি।  আমি ওকে কিছু ছড়ার বই জোগাড় করে দিয়েছি। ও ওগুলো  খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ে। আজ ওর সাথে শুধু  রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আলাপ আর গান শুনা ।

— একদিন খেয়াল করেছিলাম ও আঁকতে খুব পছন্দ করে। এবং ওর আকাঁর হাতও দারুণ ভালো। ভাবছি এবার যখন ছুটিতে বাড়ি যাবো ওর জন্য আকাঁর সব সরঞ্জাম  নিয়ে আসবো। মেয়েটাকে এ বিষয় গাইড করলে বহুদুর যাবে। ভালো একজন আর্টিস্ট হবার সম্ভাবনা ওর মধ্যে আছে। এবং আমি ওকে যতদূর সম্ভব সাহায্য করবো।

— বই পড়তে পড়তে কখন যে এতো রাত হয়ে গেল খেয়ালই করিনি। ঘড়িতে রাত এগারোটা । চিন্তিত চোখে দরজার দিকে তাকালাম। সুমি এখনও আসছে না কেন। আজ কি আসবেনা?  আরও দু একবারও এমন হয়েছে  আসেনি । একবার ওর নানি এসেছিল তাই আসেনি । আবার যখন ও অসুস্থ্য তখন । আজ কি হল? হয়তো পরে আসবে ।

 

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা- রচনাকাল

১২/০৫/২০১৭ইং