ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কি এবং কিভাবে কাজ করে

Now Reading
ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কি এবং কিভাবে কাজ করে

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি টেকি দুনিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়গুলির একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্যামসাং, এইচটিসি, অকুলাস রিফট এর মত বড় বড় কোম্পানিগুলো ভার্চুয়াল রিয়েলিটি নিয়ে গবেষণা করছে। যার ফলশ্রুতিতে বাজারে স্যামসাং এর গিয়ার ভিআর বা এইচটিসি ভাইব এসেছে। গুগল ও স্বল্পমূল্যে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কার্ডবোর্ড তৈরী করছে যা আমাদের দেশে খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আমি আজকে আপনাদের সাথে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কি এবং কিভাবে কাজ করে সেটা নিয়েই আলোচনা করব।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কি?
ভার্চুয়াল রিয়েলিটি সংক্ষেপে ভিআর নামে পরিচিত। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিআর ব্যবহারকারী ভার্চুয়াল একটি দুনিয়ায় প্রবেশ করেন। এই দুনিয়ায় তার মধ্যে বিশ্বাস তৈরী করা হয় যে সে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় অবস্থান করছে। ব্যাপারটার সাথে স্বপ্ন দেখার তুলনা করা যেতে পারে। আমরা যখন স্বপ্ন দেখি তখন আমরা স্বপ্নের জগতে উপস্থিত না থেকেও সেখানে যা যা ঘটছে সেগুলো দেখতে পারি। স্বপ্নের অদ্ভুত ঘটনাগুলোকেও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। কিন্তু আমরা যখন ঘুম থেকে উঠি তখন বুঝতে পারি কোন একটা গড়বড় রয়েছে। ভিআর যখন আমাদের ভার্চুয়াল দুনিয়ায় নিয়ে যায় তখন সেটি আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়র মধ্যে চারটিই অর্থাৎ মুখ, চোখ, কান এবং নাক নিয়ন্ত্রণ করে থাকে যেটা আমাদের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে তোলে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটির পরিবেশ বাস্তব বা কাল্পনিক উভয়ই হতে পারে।
ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ব্রেইন কে বোঝায় যে আপনি ত্রিমাত্রিক একটি দুনিয়ায় অবস্থান করছে। এজন্য স্টেরিওস্কোপিক ডিসপ্লে ব্যবহার করা হয়। আমরা জানি যে আমাদের দুই চোখের সাহায্যে চোখ হতে কোন বস্তুর দূরত্ব নিখুঁতভাবে পরিমাপ করতে পারি। এই কৌশলই স্টেরিওস্কোপিক ডিসপ্লে তে ব্যবহার করা হয়। একই দৃশ্য দুটি সামান্য ভিন্ন অ্যাংগেল হতে দেখানো হয়। এছাড়া আরও কিছু কৌশল অবলম্বন করা হয় দৃশ্যটাকে বাস্তব করার জন্য।
Stereoscopic Vision

ভিআর এই অভিজ্ঞতা কে পূর্ণতা দান করার জন্য থ্রিডি অডিও ব্যবহার করা হয় । থ্রিডি অডিওতে ভিন্ন ভিন্ন অ্যাংগেল থেকে শব্দ উৎপন্ন হয় যেটি যথাসম্ভব রিয়েলিস্টিক আউটপুট প্রদান করে।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটির ইতিহাসঃ


Sensorama

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি নিয়ে সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে ৫০ এর দশকে। মরটন হেইলিগ নামক এক ব্যাক্তি সেনসোরামা নামক একটি যন্ত্রের উদ্ভাবন করেন। তার এই যন্ত্র দেখা, শোনা, ঘ্রাণ নেয়া এবং অনুভব করানোর ক্ষমতা ছিল। তিনি এই যন্ত্রে ৫টি শর্ট ফিল্ম প্রদর্শন করেন। শর্টফিল্মের দৃশ্য অনুযায়ী তিনি ঘ্রাণ, বাতাস চালনা, চেয়ার এর মুভমেন্ট, স্টেরিং সাউন্ড ইত্যাদি ব্যবহার করেন। যেটি দর্শকদের অন্য একটি জগতে নিয়ে যায়। মরটন হেইলিগ এর এই আবিষ্কারের জন্য তাকে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির জনকও বলা হয়ে থাকে। এরপর থেকে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এর প্রযুক্তির উন্নতি করা হতে থাকে যা আজকে এই অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটির ব্যবহারঃ

ভিডিও গেমঃ
অকুলাস রিফট এবং এইচটিসি ভাইভ ভার্চুয়াল গেইমিং এর জন্য বিশেষ হেডফোন তৈরী করেছে। এছাড়া সনি প্লেস্টেশন ভিআর নিয়ে কাজ করছে যেটা কম্পিউটার এর সাহায্য ছাড়াই প্লেস্টেশনে ব্যবহার করা যাবে। অনেক জনপ্রিয় গেইম এর ই ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ভার্শন বের করা হয়েছে। জনপ্রিয় গেম মাইনক্র্যাফট এর নির্মাতা মোজ্যাং ২০১৬ সালে স্যামসাং গিয়ার ভিআর উপযোগী মাইনক্র্যাফট অকুলাস স্টোরে মুক্তি দেয়।
সিনেমাঃ
সিনেমায় ভার্চুয়াল রিয়েলিটি আপনাকে ৩৬০ ডিগ্রি এঙ্গেলে দেখার সুযোগ করে দেয়। এজন্য বিশেষ প্রযুক্তির ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বর্তমানে বিভিন্ন খেলাধুলা, ইভেন্ট ইত্যাদি ভার্চুয়াল রিয়েলেটির আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।

শিক্ষাঃ

শিক্ষাদানে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি অনেক বড় অবদান রাখছে। শুধু বই পড়ার ফলে কোন জিনিস কিভাবে কাজ করে সে বিষয়ে সঠিক ধারণা অনেকের মধ্যেই তৈরী হয় না। কিন্তু ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী যেকোন বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারছে।

মিলিটারি ট্রেইনিংঃ

মিলিটারি ট্রেইনিং এ ভিআর এর মাধ্যমে কমব্যাট এর প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরী করে আহত সৈনিকের কিভাবে চিকিৎসা করতে হবে তা দেখানো হচ্ছে। মিলিটারির বিভিন্ন স্কিল যেমন ফায়ারআর্মস, সাবমেরিন চালনা, বিমান চালনা ইত্যাদি কাজে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি অবদান রাখছে।

চিকিৎসাঃ
চিকিৎসা ক্ষেত্রে ভিআর দারুণ কার্যকরী ভূমিকা রাখছে। একজন সার্জন সার্জারি সিম্যুলেটর ব্যবহার করে সার্জারি করতে পারছেন কোন প্রকারের দুর্ঘটনা ছাড়াই। যারা বাস্তবে ডিজাবল তাদেরকে ভিআর কিছুটা হলেও আনন্দ দিতে পারছে। ব্যথা কমানোর কাজে ভিআর ব্যবহার করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে ভিআর ব্যবহারের সময় রোগীর ব্রেইন ভিআর এর প্রতি থাকে যেটা তার ব্যথার অনুভূতি দূর করে দেয়।

এছাড়া আর্কিটেকচার, ইঞ্জিনিয়ারিং, ফাইন আর্টস ইত্যাদি ক্ষেত্রেও ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার হচ্ছে।
ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ডিভাইসঃ
পূর্ণাঙ্গ ভিআর অভিজ্ঞতার জন্য অনেক ধরণের ডিভাইস তৈরী করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভিআর হেডসেট, মোশন ট্র্যাকার, ভিআর সিমুলেটর, হেড ট্র্যাকার, হেড মাউন্টেড ডিসপ্লে ইত্যাদি।

ডেস্কটপ কম্পিউটারে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী কম্পিউটারের প্রয়োজন হয়। স্টিম পিসিতে ভিআর ব্যবহারের জন্য কমপক্ষে ইন্টেল কোর আই ৫ সিপিউ এবং এনিভিডিয়া জিটিএক্স ৯৭০ মডেলের গ্রাফিক্স কার্ড রিকমেন্ড করেছে। কিন্তু অধিকাংশ পিসিই এরকম শক্তিশালী নয়। তবে অ্যান্ড্রয়েড এ ভিআর এর জন্য কিটক্যাট অপারেটিং সিস্টেম ই যথেষ্ট।

ভিআর এর ভালো দিক থাকলেও এর নেতিবাচক দিকও আছে। এর ফলে সাইবার অ্যাডিকশন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল এবং অনেকের কাছে ভার্চুয়াল দুনিয়াই আসল দুনিয়ায় পরিণত হয়। এছাড়া আরও বিভিন্ন স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

আর্টিকেল টি আপনার কেমন লেগেছে তা কমেন্ট সেকশনে জানাতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।

 

বিঃদ্রঃ অভ্র দিয়ে লেখার সময় কিছু কিছু ক্ষেত্রে লেখা ভেঙ্গে গিয়েছে। অনাকাঙ্ক্ষিত এ সমস্যার জন্য দুঃখিত।
তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া
ছবির কার্টেসীঃ গুগল ইমেজ