বিষধর সাপ চেনার উপায় এবং করণীয় !

Now Reading
বিষধর সাপ চেনার উপায় এবং করণীয় !

সাপ আমরা সবাই ভয় পাই | এর প্রতি সবসময়েই আমাদের শ্রদ্ধা মিশ্রিত এক ভয় কাজ করে | কারণ, এই প্রাণীটিকে পৃথিবীর মানুষ শ্রদ্ধা করে যেমন দেবতার আসনে বসিয়ে পুজো করেছে আবার ঠিক একইভাবে পিটিয়ে তক্তাও করেছে ! পরে মানুষ বুঝতে শিখেছে একে পুজো করার তেমন কিছু নেই, আর পিটিয়ে তক্তা করাও ভালো নয় কারণ, পৃথিবীর বেশিরভাগ সাপই আসলে নিরীহ প্রকৃতির | কাজেই, আজকের এই পর্বে সেই নিরীহ সাপগুলোকে বাদ দিয়ে কিভাবে খারাপ বিষধর সাপগুলোকে চেনা যায় তা নিয়ে আলোচনা করব | এছাড়াও, সাপ কামড় দিলে কি করতে হবে তা নিয়েও আলোচনা করা হবে |

সাপ কি ?
এর টেকনিক্যাল সংজ্ঞা হবে “সাপ হলো রেপটাইল এর অন্তুর্ভুক্ত এক প্রাণী যাদের সাবঅর্ডার হলো “Serpentes” এবং এরা “Squamata” অর্ডার এর অন্তুর্ভুক্ত |” তবে, সহজভাবে সাপ হলো, এমন এক প্রাণী যার হাত-পা থাকেনা বুকে, ভর দিয়ে চলে | (চিত্র দ্রষ্টব্য)

কিন্তু, প্রশ্ন হলো পৃথিবীতেতো অনেক সাপ রয়েছে সকল সাপই কি বিষাক্ত ? যদি না হয় তাহলে কতগুলা বিষাক্ত ? আসলে, বিষাক্ত সাপের সংখ্যা অতি নগন্য | সারা পৃথিবীতে প্রায় ৩০০০ এর উপর সাপের প্রজাতি রয়েছে | কিন্তু, এর মধ্যে ৬০০ এর মত সাপ রয়েছে যারা বিষধর | আর এর মধ্যে ২০০ সাপকে মেডিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হয় |

western_rat_snake_photo_courtesy_of_bill_dedo.jpg

 

আরেকটি পরিসংখ্যান রয়েছে যার তথ্য মতে, সারা পৃথিবীতে ১ মিলিয়ন থেকে ২ মিলিয়ন সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটে কিন্তু, এর মধ্যে কেবল ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ঘটনাকে বিপর্যয় হিসেবে ভাবা হয় |
এসকল, পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায় সাপ মানেই যে ভয়ংকর আর বিপদজনক ভাবা তা আসলে পুরোপুরি সঠিক নয় !

 

বিষধর সাপের বিষের রকমফের


সাধারণত একটা বিষধর সাপের বিষ কিন্তু, বেশ কিছু উপায়ে মানুষকে আক্রমন করে থাকে | এর উপর ভিত্তি করে এসকল বিষকে বেশ কিছু ভাবে ভাগ করা হয়েছে | যেমন–
Hemotoxic: এই সকল বিষ সাধারণত সাধারণত মানুষের লোহিত রক্ত কণিকার উপর ক্রিয়া করে মানুষের রক্ত জমাট বাধার (blood clot) ক্ষমতা হ্রাস করে | এছাড়া এর ফলে সেল এবং টিস্যু ও ডেমেজ হয়ে থাকে | আর, সিম্পটম হিসেবে সাধারণত শরীর প্রচন্ডরকম ব্যথা এবং নাক, মুখ, কান থেকে রক্ত পড়তে পারে |

 

Myotoxic: এই বিষ পুরোপুরি শরীরের মাসল টিস্যুর উপর ক্রিয়া করে, যার ফলে মাসল কনট্রাকশন ফেইল করে আর ধীরে ধীরে পুরো শরীর প্যারালাইজ হয়ে পরে |

 

Neurotoxic: এই বিষ সরাসরি নার্ভ এবং নার্ভাস সিস্টেম এর উপর ক্রিয়া করে | এর ফলে পেশির সংকোচন প্রসারণ সংক্রান্ত কাজগুলো করা সম্ভব হয়না | যার ফলে ধীরে ধীরে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় |

Cytotoxic: এইটা সকল প্রকার সেল ধ্বংস করে এবং প্রচন্ড ব্যথার সৃষ্টি করে | এছাড়াও শরীর ফুলে যেতে পারে |

বিষধর সাপ চেনার উপায়

 

বিষধর সাপ চেনার বেশ কিছু উপায় রয়েছে | যেমন প্রথমেই তাদের চোখের দিকে নজর দিতে হবে | বিষধর সাপের চোখ সবসময় উপবৃত্তাকার (elliptical) হয় | আর বিষহীন সাপের ক্ষেত্রে তা বৃত্তাকার (circular) হয় | (চিত্র দ্রষ্টব্য)

এছাড়া বিষধরদের মধ্যে pit viper দের ক্ষেত্রে প্রথম বৈশিষ্ট থাকার সাথে সাথে আরেকটি বৈশিষ্ট রয়েছে | যেমন সাপের নাসারন্ধ্র (Nostril) এবং চোখের (eye) এর মাঝে একটা ছোট গর্ত রয়েছে | (চিত্র দ্রষ্টব্য)

 

snake-diagram.jpg

এছাড়া কোরাল সাপদের ক্ষেত্রে এর জন্য আরেকটি বৈশিষ্ট আছে | যেমন তাদের ডোরাকাটা রঙের মধ্যে যদি লাল আর কালো রং একসাথে থাকে তাহলে, তা বিষধর নয় | অর্থাত, তা নিয়ে আমাদের চিন্তা করার দরকার নাই | কিন্তু, যদি লাল আর হলুদ একসাথে থাকে তাহলে, আমাদের চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে কারণ, তা বিষধর ! (চিত্র দ্রষ্টব্য)

 

coral_snake_0.gif

 

আর এইটা মনে রাখার জন্য বাচ্চাদের একটা মজার ছড়াও আছে | **
                         “Red touch black, venom lack. Red touch yellow, kill a fellow.”
বিষধর সাপ কামড়ের লক্ষণ


এইটা মূলত সাপের প্রকার ভেদে ভিন্ন হতে পারে | যেমন- “pit viper” এর ক্ষেত্রে ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে সারা শরীর তীব্র ব্যথা, ফুলে যাওয়া, লাল হওয়ার সিম্পটম দেখা দেয় | এছাড়াও, জ্বর, দুর্বলতা এসব লক্ষণ ও উল্লেখ করার মত |
অপরপক্ষে, “Coral snake” এর ক্ষেত্রে এই সিম্পটম সহজে দেখা দেয়না | মোটামুটি ঘন্টাখানেক পর এর সিম্পটম দেখা যায় | আর সিম্পটম হিসেবে দুর্বলতা, লালা নিঃসরণ ইত্যাদি দেখা যায় |

তবে, আক্রান্ত হবার পর মারা যেতে কত সময় লাগবে তা মোটামুটি অনেকগুলো বিষয়ের উপর নির্ভর করে যেমন- ইমিউন সিস্টেম, কি পরিমান বিষ প্রবেশ করেছে, কত তারাতারি ট্রিটমেন্ট নিচ্ছি, কত দ্রুত সেই ট্রিটমেন্ট কাজ করে এরকম নানাবিধ বিষয়ের উপর |

ফার্স্ট এইড : ডু’স এন্ড ডোন্ট

 

অতি প্রচলিত একটা ধারণা হলো, সাপ কামড় দিলে যত তারাতারি সম্ভব তার উপর কাপড় দিয়ে শক্ত করে বাধতে হবে, এরপর সেই রক্ত যতখানি সম্ভব কারো দ্বারা চুষে নিতে হবে এবং সর্বশেষে চ্যাংদোলা করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে ! ধারনাটা, ভুল ! এই বিষয়ে New England Journal of Medicine এ একটা স্টাডি পাবলিশড হয় যেখানে, তারা পুরোপুরি এই প্রচলিত ধারণার বিরোধিতা করেন | কারণ, প্রথমত, উপরে বেধে রাখার ফলে বিষ কেবল একটা জায়গার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে যার ফলে, টিস্যু ডেমেজ করতে পারে | এছাড়াও, যদি মুখ দিয়ে কেউ রক্ত চুষে নেই তাহলে, আসলে খুব বেশি লাভ নাই কারণ, বিষ খুব দ্রুত ছড়ায় | বরং যেই ব্যক্তি এই কাজ করবে তার নিজেরই আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে যদি মুখের কোথাও ঘা বা কাটা অংশ থাকে |

এরচেয়ে বরং যা করা যেতে পারে তাহলো-

  • যতখানি সম্ভব মুভমেন্ট কম করতে হবে কারণ, এর ফলে বিষ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পরবেনা |
  • বিভিন্ন অর্নামেন্ট (যেমন- রিং )এসব খুলে ফেলা যেতে পারে |
  • আক্রান্ত অংশটুকু হৃদপিন্ডর (heart) নিচে অবস্থান করাতে হবে |
  • এছাড়াও, কিছু “pump suction” ডিভাইস পাওয়া যায় যেগুলো খুব সহজে বিষ টেনে নিতে পারে | এইটা বরং রক্ত চুষে খেয়ে ফেলার চেয়ে শতগুনে কার্যকরী !
  • আর, সর্বশেষে যত দ্রুত সম্ভব আক্রান্ত ব্যক্তিকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে |

 

যাইহোক, আজকে এই পর্যন্তই | আশা করি সবার ভালো লেগেছে | সবাইকে ধন্যবাদ |

 

 


 

References:

  1. http://apps.who.int/bloodproducts/snakeantivenoms/database/
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/Snake_worship
  3. https://www.thailandsnakes.com/venom-types-in-thailand-snakes/
  4. https://www.timsreptiles.co.za/venom/types-of-snake-venom-and-their-effects-on-humans
  5. http://adventure.howstuffworks.com/snake-bite1.htm