অপোর প্রহর

Now Reading
অপোর প্রহর

ইনবক্স চেক করতেই নুসরাতের মেসেজটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে সালমানের। ক’দিন ধরেই ইনবক্সে কথা হচ্ছে তাদের। বেশ আগ্রহ নিয়েই রিপ্লে দিতে কিক করে সালমান।
কেমন আছো? আজ টিউটোরিয়াল এক্সাম শেষ হলো,তাই তোমায় মেসেজ করলাম।
হু ভালো, আর তুমি?
এই তো আছি। তা কী করছিলে?
নাহ, তেমন কিছু না। পড়া শেষ করেই কেবল উঠলাম। আর নতুন কয়েকটা নাটক ডাউনলোড দিলাম, তাই ভাবছি এখন সেগুলো দেখব।
তার পর?
পরীার পড়া তৈরি করতে হবে।
জি আচ্ছা।
ওকে, বাই।
প্রতিদিন এভাবেই কোনো-না-কোনো একটা বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে চলে দুষ্টুমি, রাগ, অভিমান, হাসি-কান্না, শাসন সবই। সেই ছোটবেলার বন্ধু তারা দু’জন। একসাথে কাস এইট পর্যন্ত গ্রামের স্কুলেই পড়েছে। তার পর নুসরাতের পরিবার চলে আসে ঢাকায়। বড় ভাইয়ের সরকারি চাকরির সুবাদে সেখানে তারা সরকারি কোয়ার্টারেই থাকে। সেখানকার একটা স্কুলে ভর্তি হয়েছে নুসরাত, আর সালমান গ্রামের স্কুলেই। সামনে তাদের এইচএসসি পরীা। পড়ালেখায় দু’জনই বেশ ভালো। গ্রামের স্কুলে থাকতে তাদের রোল থাকত এক অথবা দুই। তবে সালমান বেশির ভাগই এক হতো। সেখান থেকেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্বটা গড়ে ওঠে। তবে ঢাকায় যাওয়ার পর থেকে বেশ কিছু দিন তাদের মধ্যকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। ফেসবুকের কল্যাণে প্রায় তিন বছর পর তাদের কথা বলা। সামনে দু’জনেরই ফাইনাল পরীা তাই তেমন একটা কথা বলা সম্ভব হয় না।
টেস্ট পরীার চার-পাঁচ দিন বাকি থাকতেই ফেসবুক আইডি ডিএক্টিভ করে দেয় সালমান। তবে সেটা নুসরাত জানে না। বারবার সালমানের নাম সার্চ করেও আসছে না। ভিন্ন চিন্তা মাথায় এসে ভর করতে থাকে নুসরাতের। তখনই সালমানের মেসেজÑ আইডি ডিঅ্যাক্টিভ করে নিচ্ছি, জাস্ট মেসেঞ্জার ইউজ করব মাঝে মধ্যে।
কেন, কী হয়েছে সালমান?
না রে তেমন কিছু না।
তবে?
জাস্ট স্টাডি!
একটা কথা বলতে চাই, বলব?
আরে বলো, অনুমতির কী আছে!
এই কয় দিন তোর সাথে কথা বলার পর থেকে কেন জানি বারবার মনে হচ্ছে…। যাকগে, একবার দেখা করতে পারবি?
কী সব বলছিস তুই! সামনে টেস্ট তার পর ফাইনাল পরীা, সব মিলিয়ে অনেক চাপ। কিভাবে সম্ভব!
তাহলে…! দেখা হবে না আমাদের আর?
হবে ত, এত তাড়াহুড়ো করছিস কেন?
তাহলে আর কবে?
প্লিজ নুসরাত, আগে পরীাটা ভালোভাবে শেষ হোক, তারপর না হয়।
সত্যি বলছিস তো!
হু, একদম সত্যি!
নুসরাতের বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই। মা সেই ছোটবেলায় মারা যান। আর বাবাও বছরখানেক আগে মারা যান। এখন শুধু বড় ভাইয়া আছেন। আর ভাইয়ার বউ-ছেলে-সন্তান। তাদের সাথেই থাকে নুসরাত। একসময় পরিবারে সবার আদুরে মেয়ে ছিল সে, কিন্তু এখন আর কেউ তেমন আদর করে না। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকে ভাইয়া আদর করলেও তিনি তো আর সব সময় বাসায় থাকেন না, ভাইয়ার নানামুখী ব্যস্ততা। অপূর্ণতা অনুভব করে নুসরাত। এই পরিবারে তার কোনো মূল্য নেই! কী আর করা। ভাগ্যে যে এটাই ছিল তার। তা না হলে বাবা-মা দু’জনই এভাবে একে একে তাকে একা রেখে চলে যাবে! পড়ালেখায় ভালো থাকা নুসরাত এখন আর আগের মতো নেই বললেই চলে। বারবার মনে পড়ছে সেই পুরনো দিনের স্মৃতি সব। কতই না সুখের ছিল সেই দিনগুলো। নিজের
অজান্তেই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে নুসরাতের। মনে মনে ভাবছে যদি সালমানের হাত ধরে এই পরিবার থেকে দূরে যাওয়া যেত, তাহলে মনে হয়…! ফাইনাল পরীা একদম নিকটে তবুও পড়ায় মন বসছে না তার। ভাবছে কত দিনে শেষ হবে পরীা। তার ভাবনায় এখন শুধুই সালমান! সেই ভাবনা নিয়েই অপোর প্রহর গুনছে নুসরাত।

যে মেয়েটা রোজ রাতে বদলায় হাতে হাতে

Now Reading
যে মেয়েটা রোজ রাতে বদলায় হাতে হাতে

দিনের আলো নিভে গেল; রাত নেমেছে। আস্তে আস্তে অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে চার পাশ। ছুটে চলা গাড়ির হর্ন আর রেলের ঝিকঝিক ছন্দে গন্তব্যে যাচ্ছে ক্লান্ত মানুষেরা। শুধু ক্লান্তি নেই এই জনপদের বাসিন্দাদের। এখানে রাত নামে না, নামে হাজারো স্বপ্নের কফিন। হাজারো দীর্ঘশ্বাসের দেহপসরার বিকিকিনি। ব্যস্ত তারা পসরা আকর্ষণীয় সস্তা মেকাপের প্রলেপে। প্রেমহীন এই জনপদের সবাই ভিন্ন জগতের বাসিন্দা।

এই জগতের বাসিন্দাদের কোনো ভেদাভেদ নেই। তারা টাকার বিনিময়ে নতুন করে বাসর সাজায়। সোহাগ বিক্রি করে। সমাজ যাকে ডাকে পতিতা বলে। রোজ রাতে হাতে হাতে বদল হওয়া এমনি একজন স্বপ্না (ছদ্মনাম)। বয়স আর কত হবে? ২০-২২। অভাবের তাড়নায় ১৫ বছর বয়সে এক গার্মেন্টে কাজ শুরু করেন। সেই বেতনের টাকাতে অনেক কষ্টে চলত তার আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জীবন। একমাত্র ভাই ভিটেবাড়ি বিক্রি করে ভাগ্য উন্নয়নের জন্য বিদেশ পাড়ি জমায়। কিন্তু তার আর কোনো খোঁজ পায়নি তার পরিবার। বাধ্য হয়েই সংসারের হাল ধরতে হলো মেয়েটিকে। এলাকার এক আপা গার্মেন্টে চাকরি করত। তার সাথেই গার্মেন্টে চাকরিতে যোগ দেয় স্বপ্না। বছরখানেক পরে ভালো বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়ে এক দালাল তাকে ধরে এনে বিক্রি করে দেয় দৌলতদিয়ার এই পতিতালয়ে। এর পর থেকেই সে অন্ধকার জগতের বাসিন্দা। এভাবেই কেটে যাচ্ছে তার জীবন নামের রেলগাড়িটা।

নারী পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে টাঙ্গাইলের এক পতিতালয়ে বিক্রি হওয়া একজন কিশোরী রানী (ছদ্মনাম)। জন্মের পর বাবা-মা আদর করে একটি নাম রাখলেও সেটি হারিয়ে গিয়েছিল নারী পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে। পতিতালয়ে ওকে দেয়া হয়েছিল এই রানী নামটিই। প্রায় ছয় মাস এই পতিতালয়ের চার দেয়ালের মাঝে প্রতিদিন ভোগের পণ্য হয়ে বন্দী জীবন কাটাচ্ছিলেন তিনি। অবশেষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার অদম্য বাসনায় মুক্তি মিলেছে তার। সম্প্রতি স্থানীয় সাংবাদিকের হস্তক্ষেপে অভিভাবকদের হাত ধরে তিনি ফিরে গেছেন তার আপন ঠিকানায়। তার পিতা নিশ্চিত করেছেন তাদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা। তবে তার জীবনে আবার স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে কি না এটিই সময়ের প্রশ্ন হয়ে থাকবে।
রানীদের মতো আরো শত শত মেয়ে এখনো প্রতিদিন বোবাকান্না করে যাচ্ছেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে। পতিতালয়ের চার দেয়ালে বন্দী ওদের কান্না শোনার মতো যেন কেউ নেই। মুক্তির পর রানীর জবানবন্দীতে জানা গেছে এসব তথ্য।
রানীর ভাষ্য মতে, মোবাইল ফোনে পরিচয়, প্রেম; অতঃপর বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে সাভারের আশুলিয়া এলাকায় সংসার পাতেন রানী। ছেলেটির বাড়ি টাঙ্গাইল সদরে, শুধু এটুকুই জানতেন রানী। বিয়ের সপ্তাহখানেক পরে তার স্বামী বলে তাদের বিয়ে তার পরিবার মেনে নিয়েছে। তাই আজ রাতেই তারা টাঙ্গাইল যাবে। খবরটি শুনে আনন্দে রানীর চোখে জল এসে যায়। কারণ প্রতিটি নারীই চান তার স্বামী, শ্বশুরবাড়ি আর সংসার নিয়ে সুখে থাকতে। তার স্বামী আর তার এক বন্ধু মিলে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে তারা রওনা হয়, রাত গভীর হয়ে আসে, গাড়ির ঝাঁকুনিতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে আসে রানী। টাঙ্গাইল ঠিকই গেলেন রানী কিন্তু শ্বশুরবাড়ি নয়; পতিতালয়ে। পতিতালয়ের সর্দারনীর কাছে বিক্রি করা হয় এক লাখ টাকায়। এরপর চলে ভয়ভীতি দেখিয়ে পোষ মানানোর প্রক্রিয়া।

রানীর মতো এমন অনেক কিশোরীর বুকভরা ভালোবাসার সলিল সমাধি হয় প্রতি রাতে। নারীপাচারকারী, দালাল ও পতিতা সর্দারনীদের ভয়ভীতির মুখে তারা কাউকে সহজে জানাতেও সাহস পান না তাদের বন্দিদশার কথা। রোজ রাতে হাতে হাতে বদলায়।

এখানে নারীরা দুর্বল, আবার কেউ কেউ ক্ষমতাধর। সবচেয়ে খারাপ সময় কাটে যখন প্রথম তারা এখানে প্রবেশ করেন। অনেকেই আসে নারী পাচারচক্রের মাধ্যমে, যাদের বিক্রি করে দেয়া হয় পতিতালয়ের কোনো এক সর্দারনির কাছে। নতুন আসা বেশির ভাগেরই বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছর। পাচারচক্র সর্দারনির কাছ থেকে নেয়া টাকাটা সর্দারনিকে শোধ করে দেয়ার আগে তাদের কাজের কোনো স্বাধীনতা থাকে না। আর বাইরে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই তাদের। সুযোগ নেই খদ্দের বাছাইয়ের।

আরেক কিশোরী শেফালী (ছদ্মনাম)। তার মতো অনেক মেয়ের স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর বয়স হয়নি। কিন্তু পরিস্থিতির শিকার হয়ে, ফাঁদে পা ফেলে তারা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে অন্ধকার গলির পথ। পরিণত বয়স না হলেও তাদেরকে ‘মাসিরা’ রাতারাতি বড় করে তুলছে গরু মোটাতাজাকরণে ব্যবহৃত ওষুধ খাইয়ে। এর ফলে খুব দ্রুত শেফালীদের শরীরের বৃদ্ধি ঘটে। দিন-রাতে তাদেরকে প্রায় ১০ জন খদ্দেরকে সামাল দিতে হয়। কখনো তারও বেশি। প্রতিজন খদ্দের থেকে তারা আয় করে প্রায় ১০০ থেকে ৫০০ টাকা। এ পেশা থেকে তাদের বেরিয়ে আসায় মানা নেই। কিন্তু সমাজ ও পরিবার তাদেরকে মেনে নিতে চায় না। ফলে অন্ধকারেই জীবন কেটে যায় তাদের।

কোনো মেয়েই খারাপ হয়ে জন্মায় না। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক সমস্যা, পক্ষপাতদুষ্ট সামাজিক নিয়ম, পারিবারিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাব ইত্যাদি পরিস্থিতির স্বীকার হয়েই একটা মেয়ে বেছে নিতে বাধ্য হয় এই ঘৃণিত জীবন। এটা কোনো মেয়েরই কাম্য জীবন নয়।

একটা মেয়ের পতিতা হয়ে উঠার পেছনের কাহিনী যাই হোক এটা ঠিক যে, কোনো মেয়েই স্বেচ্ছায় পতিতার জীবন বেছে নেয় না। কিন্তু প্রায় সব সময়ই যে বা যারা এই মেয়েটিকে অন্ধকার জীবনে ঠেলে দিচ্ছে তারা রহস্যময়ভাবে থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। যে পুরুষটি তাকে ব্যবহারের মাধ্যমে পতিতার সিলমোহর লাগিয়ে দিচ্ছে সে-ও সমাজের বুকে কোনো নারীর সন্তান, ভাই, স্বামী বা বাবা হিসেবে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আজও কেন এমন হয় ৭–পর্ব [শেষ পর্ব ]

Now Reading
আজও কেন এমন হয় ৭–পর্ব [শেষ পর্ব ]

প্রথম পর্ব থেকে  ষষ্ঠ পর্বের পর  – [শেষ পর্ব ]

– এতক্ষন আমি ওদের দিকে নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে ছিলাম । যেন ওরা কি বলছে বা করছে সে ব্যাপারে আমার কিছুই করার নেই । ওরা ওদের ইচ্ছেমত ছটফটানির সাথে সাথে ওদের মনের বিচিত্র সব ভাব প্রকাশ করছে ।  কিন্তু হটাত এমন  ত্রাহি চিৎকার করছে-  এবার আর  চুপ করে স্ট্যাচু হয়ে  থাকা যায় না । খুব কাছাকাছি কেউ না থাকলেও পথিক বা আর কেউ এদিকে এলে শুনতে পেতে পারে । উঠে টেপ দিয়ে ওদের মুখ বেঁধে দিলাম । আরও আতংকিত হয়ে  বাঁধনগুলো  খোলার জন্য চরম ছটফট করছিল । কিন্তু সেটা তো  সম্ভব নয় । সময় নিয়ে বেশ করে বেঁধেছি ।

– যখন দেখল কিছুতেই কিছু হচ্ছে না তখন  আতংকিত বিস্ফারিত চোখে,  নিজের ইম্পরট্যান্ট পার্টটির দিকে তাকাচ্ছে দুজনেই । আর চোখের ভাষায় আমাকে কাকুতি মিনতি ভয় ধমক দয়াভিক্ষা  যা পারছে প্রকাশ করছে । আমি উঠে ওদের খুব কাছাকাছি এসে ধীর কোমল কণ্ঠে বললাম , ‘উহ , এত অস্থিরতার কি আছে ডিয়ার, যে অংশটিকে বেশি ভালবাসতে, বেশি গুরুত্ব দিতে, যাকে ছাড়া চলেই না, যার জন্য এতো কিছু– তাকে তো আমিও  খুব গুরুত্ব দিয়ে মায়া মমতায় জড়িয়ে নিয়েছি । মিথ্যেই অভিযোগ করছ ।‘

– আমি কাজলের পেন্সিলটা নিয়ে এগিয়ে গেলাম । একে একে দুজনের কপালে গালে বুকে পেটে লিখে দিলাম  আমি ধর্ষক, আমি খুনি, আমি অত্যাচারী,  আমি জুলুমকারী,  আমি ইভটিজার,  আমি মাতাল,  আমি জুয়াড়ি,  আমি সন্ত্রাসী  ইত্যাদি যা যা  ওদের কর্মকাণ্ড বলে শুনেছি  । যে সব ওরা নিষ্ঠার সাথে করে বলে শুনেছি ।  লিখছিলাম জোরে জোরে উচ্চারন করে , যেন ওরা শুনতে পায় । শুধু শুনতে পেলে তো হবে না দেখাও চাই । তাই  আয়নার দরকার । খুঁজাখুঁজি করে একটি আয়না পেয়ে গেলাম ।

-লিখা শেষ করে  আয়নাটি  এনে ওদের সামনে একটি চেয়ারের সাথে হেলান দিয়ে জুত মতো বসিয়ে দিলাম । ওরা এটায় নিজের নিজের প্রতিচ্ছবি দেখুক ।

-দুজনেই অসম্ভব অবিশ্বাস্য চোখে আয়নার দিকে তাকিয়ে আছে । দেখছে  বহু মিশ্রিত অনুভবের ঘোলাটে চোখে । একটি পূর্ণ নারী,  বালিকা নারী, ও নারী শিশুর  দেহ মন হৃদয় আর আত্মাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে ব্যাবচ্ছেদ করে এবং কখনও কখনও মেরে ফেলে যারা,  তাদেরই আত্বজ, তাদেরই সাথী, তাদেরই অনুগামী এই বিভীষিকাময় নারকীয় কিট – দেখুক নিজেকে । কি তার প্রাপ্য ।  সেই ভিকটিম নারীটির কষ্টের গভীরতম অনুভবের কিঞ্চিৎ অনুভব করুক ।

-আমার কাজ শেষ । এই ঘরে আমার চিহ্ন গুলো মুছে দিলাম । আমাকে বেরুতে হবে । আলো ফোটার আগেই প্রথম বাসটি ধরতে হবে ।  আবার ওদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে চোখের ওপর চোখ রেখে বললাম , ‘জানিনা তোমাদের ভাগ্যে কি আছে  ? কি হবে এর পরে  ?  আশাকরি শুধরে যাবে । আরও কঠিন কোন শাস্তি হতে পারে এই ভাবনা মাথায় রেখে । আর শুধরাবে তাদেরও,  বিষাক্ত মনের সেই সব পাপীকে । যারা তোমাদের দলভুক্ত । তোমাদেরই মত পিশাচ । হা,  সবচেয়ে বড় কথা,  আদৌ যদি  পৃথিবী তোমাদেরকে  আরও কিছুদিন চায় ।‘

-আমার ব্যাগ নিয়ে বের হবার সময় ওদের গোঙানির শব্দ কানে আসছিলো । যেন কোন আহত  হিংস্র পশু । অবশেষে পশুদের আওয়াজ পশুদের মতই হচ্ছে ।  পেছনে না তাকিয়ে  বেরিয়ে এলাম । বাইরে ঝোপে লুকিয়ে রাখা আমার ব্যাগ উঠিয়ে নিলাম ।

-তখন শেষ রাত একটু পরেই আজান দিবে । বিলের পাড় ধরে আসার সময় ব্যাগটা পায়ের কাছে রেখে চারিদেকে তাকিয়ে আমার প্রিয় জায়গাটিকে দেখলাম ।  যেখানে এলে আমার মন ভালো হয়ে যেতো । দুহাত দুদিকে মেলে দিয়ে চোখ বন্ধ করে নির্মল বাতাসটুকু টেনে নিলাম নিজের  ভেতর । ঝির ঝির করে বাতাস বয়ে যাচ্ছে । অপুর্ব  আনন্দময় অনুভতি হচ্ছে আমার । প্রকৃতিও যেন  জেনে গেছে  আমি কি করেছি । প্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজ তো প্রকৃতিও পছন্দ করেনা । যারা বিধাতার নিয়মের বাইরে, অকল্যাণ – যা কিনা তাঁর সৃষ্টিকে, অনৈতিকতায় আহত করে, ধ্বংস করে,  স্বেচ্ছাচারিতা করে, তাঁদের শাস্তি তো অনিবার্য ।  তাই তো প্রকৃতি  আমাকে আদরে আদরে কোমল পরশে সোহাগ করছে । চাঁদ আর তারাটিও যেন খুব কাছে চলে এসে হাসছে, রাতের ফোটা ফুলগুলোও সুগন্ধে জড়িয়ে নিচ্ছে ।

-জানিনা কবে আবার এই গ্রামটিকে দেখতে পাবো । আদৌ দেখতে পাবো কি ? এই বিশাল প্রশ্ন নিয়ে আমি গাড়িতে উঠলাম ।

-বাস ছুটছে ঢাকার পথে । নিজেকে নির্ভার মনে হচ্ছে ।  সবাই জানে গতকালই আমার বাড়ি  চলে গেছি আমি । গতকাল ভোরে সুমিদের বাড়ি গিয়েছিলাম । যাবার আগে ওকে একটু দেখবো আর কিছু কথা বলবো ।  আমাকে দেখেই ওর মা তেড়ে এলো । আমাকে টেনে এক কোনায় নিয়ে রাগত স্বরে জানতে চাইলেন আমি কেন আবার এর মাঝে আসছি । আমাকে কিছু বলতেই দিচ্ছিলেন না । আমার কোন কথা শুনতে তিনি রাজি নন । উনার ভালো উনিই বোঝেন । এবং উনার মেয়ের বিষয়ে আমি যেন কক্ষনও মাথা না ঘামাই  । অবশেষে, আমি আজ চলে যাচ্ছি এটা বুঝিয়ে বলার পর  সুমির সাথে কথা বলার অনুমতি পেলাম । সফুরা আমাকে ইশারায় দেখিয়ে দিলো ঘরে যেখানে ওর মেয়ে আছে ।

-ঘরে ঢুকে দেখি বেশ বড় একটি মাত্র কামরা । ঘর বলতে এই একটি মাত্র কামরাই । সুমিকে দেখতে পাচ্ছিলাম না । ওর মা ইশারায় কোনার দিকে দেখালেন । দেখলাম এক ভীষণ কষ্টময় দৃশ্য ।  ওর মা ওকে ঘরের এক কোনায় চৌকিতে শুইয়ে রেখেছে ।   কাপড় ঝুলিয়ে দিয়ে চৌকিটা আড়াল করে রাখা হয়েছে– যেন কেউ ঢুকেই ওকে দেখতে না পায়  । এখানেই থাকতে হবে ।  স্কুল বা অন্য কোথাও যাওয়া  তো দূর,  উঠোনে যাওয়াও মানা । সুমি কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়েছিল । আমাকে দেখেই উঠে বসলো । চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে । শুকিয়ে গেছ । শরীরের এখানে ওখানে ব্যান্ডেজ । হাঁপাচ্ছে বসে বসে ।

-এখানে এভাবে পর্দার আড়ালে শুইয়ে রাখার অর্থ  কি ?  অবাক হয়ে এর কারন জানতে চাইলে যা শুনলাম , তা হল যতদিন না ওর উপর হওয়া  লজ্জাজনক নির্যাতনের  সব  চিহ্ন গুলো মিলিয়ে যায় ততদিন সুমিকে এভাবেই বন্দি হয়ে থাকতে হবে । যেন দুনিয়া জানতে না পারে এ নির্মম বেদনাদায়ক  লজ্জার কাহিনী । মেয়ে বলে কথা । ভবিষ্যৎ আছে না ওর ? সুমির আর সুমির মায়ের এই বুকভাঙ্গা  নিঃশব্দ  কান্না,  আহাজারি,  এই ক্ষরন  আমাকে পায়ের আঙ্গুল থেকে মাথার তালু পর্যন্ত শরীরে মনে ভাবনায় চেতনায় একেবারেই এক আলাদা একজন মানুষে পরিনত করলো । যে শুধু কোমলই নয় কঠিনও হতে পারে ।

– ওর মা সরে গেলে ওর পাশে এসে বসলাম । ওকে একা পেয়ে কিছু কথা  বলেছিলাম,  ‘তোর জন্য তেমন কিছু তো করতে পারলাম না সুমি । তোকে সুবিচার দেয়ার খুব ইচ্ছে ছিল । ইচ্ছে ছিল তোর জন্য এমন কিছু করি যেন তুই শক্ত ভাবে নিজের পায়ে দাড়িয়ে  কিছু করতে পারিস । জানিনা কখনও সে ইচ্ছা পূর্ণ হবে কিনা ।‘ সুমি করুন ছলছল চোখে তাকিয়ে কি বুঝল কে জানে । মানসিক ভাবে অথর্ব মেয়েটির চিবুক ধরে বলেছিলাম , ‘শোন সুমি , আজ কাল পরশু বা যেদিনই হোক- ওই দুই বদমাশ কুকুরদের নিয়ে  একটা জিনিস দেখবি । শুনবি । ভেবে নিস এটা তোর জন্য আমার কিছু একটা করার চেষ্টা । সাবধান কাউকে কিছু বলতে যাবিনা । শুধু চুপচাপ দেখবি আর শুনবি ।

-সুমি আমার আরও কাছ ঘেসে বসলো । ওর নিষ্প্রভ চোখে একটু যেন আলো ফুটেছে । আমি খুব মমতায় ওর হাতখানি ধরে বলতে লাগলাম,   ‘শোন সব চেয়ে জরুরি যেটা,  লিখা পড়ার ব্যাপারে এতদিন কি কি বলেছিলাম মনে রাখিস । পড়বি খুব পড়বি । বড় হবি । যতটা হলে মনে প্রশান্তি আসে, উদারতা আসে, শুদ্ধতা আসে ।  এবং সেইসাথে ময়লা আবর্জনা আর সব পোকামাকড় ঝেড়ে মুছে সাফ করতে পারিস চাইলেই । ঠিক ততটুকু বড় হতে হবে তোকে । এই কষ্টকে কষ্টে নয়,  হতাশায় নয় । নিজেকে বিশাল করতে এই কষ্টকে শক্তিতে রূপান্তরিত করবি । জানিনা কতটুকু বুঝতে পারছিস । কিন্তু মনে রাখিস কথাগুলো,  কোন একদিন বুঝে যাবি ।‘

-আমার কথায় ওর দুচোখে একটুকরো আশার আলোর সাথে কষ্টের বন্যার অবিরল ধারা নেমে এলো ।  এবার হটাত ও আমার হাঁটুর উপর মাথা রেখে  হু হু করে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলো । সাথে আমারও চোখের পানি টুপটুপ করে পড়ছিল ওর মাথায় ।

 

©সেলিনাজান্নাত

ঢাকা-রচনাকাল

১২/০৫/২০১৭ইং

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আজও কেন এমন হয় পর্ব—৬

Now Reading
আজও কেন এমন হয় পর্ব—৬

– ঘরের দরজা খোলা । শয়তান গুলো আমার জন্যেই খুলে রেখেছে  হয়তো । আমি ঢুকতেই বাদল দরজাটায়  ছিটকিনি লাগিয়ে দিলো । আমি দেখলাম ঘরে একটি খাট । খাটের দুইপাশে আলমারি আর টেবিল ।  খাটের সামনে মেঝেতে মাদুর পাতা । ওরা মেঝেতে বসে বসে মদ গিলছিল । আমাকে দেখে দিগুন উৎসাহে দুজনে খাটে হেলান দিয়ে আয়েশ করে ধূমপান ও শূরা পান চলছিলো । ধোঁয়ায় ঘর ভরে আছে । দুর্গন্ধ আর ধোঁয়ায় আমার কাশির সাথে বমিও আসছিলো ।

– মুখে বিজয়ের হাসি হেসে অভি বলল,   ‘এলে তাহলে ।’

-‘উপায় কি ছিল  আর ?’

-‘হুম , বুদ্ধি যত জলদি হবে তত ভালো হবে , মনে রেখো ।’

-‘যেটা করা উচিত সেটাই তো করে ফেলা চাই । ‘ বলে কাশতে লাগলাম । ইসস কি ধোঁয়া যে খেতে পারে ।

-‘কাশি  হচ্ছে  তাই না ? সুন্দরী এমন ধোঁয়া সহ্য তো করতেই হবে ।  ‘এসো বস ।‘ ওর পাশে বসতে  ইঙ্গিত করলো অভি ।

-‘লম্বু বলল, টানতেও হবে । এই নাও একটু খেয়েই দেখো দারুণ জিনিস ।‘ বলে ও ওর হাতের সিগারেটটা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে ।

-আমি স্পর্শের দুরত্বে বসে কাশতে কাশতে  বললাম   ‘সময় দাও, তোমাদের চেয়ে বড় স্মোকার হয়ে দেখিয়ে দেব । আজ থাক ।’  মনে মনে ভাবছি ওদেরকে কিভাবে সামলাবো । ওরা ক্রমশই মাতাল হচ্ছে । আর আমার ভেতর ভয় বাড়ছে । আমি যথেষ্ট সাহসী মেয়ে । তাই এখানে আসতে  পেরেছি । জীবন মান হাতে নিয়ে ।  তারপরও–।

–  ‘কি সুন্দরী , এতো দূরে বসে কেন ? কাছে এসো,  একটু ঢেলে টেলে দাও, তোমার জন্য এতদিন অপেক্ষা করেছি , একটু তো রহম করো । হা হা হা । হা হা হা । দুজন কি কি  যে বলছে আর হাসছে ।

– আমি সহাস্যে বললাম,  ‘নিশ্চয়ই , আগে খাবারটা খেয়ে নাও ।‘

– ‘পরে  খাবো ।‘  অভি বলল ।

-‘এতো ভালো করে রেঁধেছি ,শুধু তোমাদের জন্য । সেই কোন সকালে গঞ্জে গিয়েছি । কত কি এনে রেঁধেছি । গরম জিনিসটা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে যে । এতো কষ্ট করে কি হোল  বল ?’   মিষ্টি হেসে বললাম ,’ তিনজন একসাথে ড্রিংক করবো তারপরে ,প্লিজ ।‘

-অভি বলল, ‘না না , পরে  খাবো । আগে তোমার সাথে বসে কথা বলি । খাবার তো জরুরি নয় ,আসল জিনিস তো তুমি ।‘

-আমি কৃত্তিম দুখের ভাব করে বললাম, ‘জানি তোমরা পয়সাওয়ালা আমার হাতের খাবার কি আর ভালো লাগবে ?’

– ‘ আরে তা নয় , কি বলছ । আয় তো অভি খেয়ে নি । সেটাই ভালো ।‘ বাদল বলল । ‘খিদেও পেয়েছে । কই সাজিয়ে দাও ।‘

-আমি মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে   ভেতর থেকে প্লেট বাটি এনে খুব যত্ন করে ওদেরকে আপ্যায়ন করতে লাগলাম । ওরা যখনই না বলছে অমনি  আমি আরও এক চামচ খাবার পাতে তূলে দিতে লাগলাম । অভি খেতে খেতে অন্য টিফিন বাটির দিকে ইঙ্গিত করে বলল,  , ‘ওটায় কি ? ওটা তো খুললে না । ওখানে আবার কি খাবার ?’

-‘আমার হৃৎপিণ্ডে কেউ যেন খামছে ধরল । কষ্টে নিজেকে সামলে  আমি মধুময় হেসে বললাম, ‘ ওটা ? ও আচ্ছা ।  আমার প্রিয় গেস্ট, তোমরা কি জানো না, প্রিয়জনকে খাবারের পর কি দিতে হয় ?’

-ওরা বোকার মত তাকিয়ে থাকলো চোখে প্রশ্ন নিয়ে । আরে অবুজ ভালো মানুষেরা  তোমাদের জন্য পায়েস আর মিষ্টি এনেছি ।  খাবারের পর সেটা দিচ্ছি ।‘

-‘ভালো মানুষ ?’ কথাটা অভি হজম করতে পারল না । নিজেই নিজের প্রতি সন্দেহে কনফিউজ চোখে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো । কিন্তু মাতাল মন মাতাল শরীর বেশি চিন্তা করতে পারল না ।

-‘ বাহ বাহ ‘ । বাদল খুব খুশির গলায় বলল ,  ‘শিক্ষিত মানুষের কাজই আলাদা । কেমন করে  কি করা উচিত ওরা ভালো জানে ।‘

-‘হুম ঠিক । এবার অভি বলল, চমৎকার খাবারের সাথে যদি চমৎকার সুন্দরী নারী থাকে তো তার তুলনা হয় না । এর চেয়ে সুখ আর কি হতে পারে ?‘ আচমকা হাত বাড়িয়ে আমার হাত টেনে ধরে বলল ,  ‘তুমিও খেতে বসে যাও সুন্দরী । সত্যি চমৎকার রেঁধেছ ।‘

–   ওদের সাথে খাবো না বলেই আমি বাসায় আগেই খেয়ে নিয়েছিলাম । আমি কষ্টে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম , ‘আজ রান্নার খাটুনিতে খুব খিদে পেয়েছিলো তো খেয়ে এসেছি । তোমরা মুল খাবারটা শেষ করো । মিষ্টি একসাথে  খাবো ।‘ আর কিছু না বলে দুজন সানন্দে গোগ্রাসে  গিলছে । মদ আর খাবার ।

– আমি মাদুরের এক কোনায় বসে বসে ওদের দেখছি । আর মনে মনে মিনিট  গুনছি । পাঁচ মিনিট , দশ মিনিট , পনর মিনিট । দুজনেরি হাত আস্তে আস্তে  স্লো হয়ে আসছে । মুখে খাবার দিতে গিয়েও পারছে  না । ঢলছে । কাঁপছে ।

– নিজেদের এই অবস্থা দেখে ওরা আমার দিকে বোকার মত তাকাল ।  ‘কি হল , হাত কাঁপছে কেন ? ম্যাডাম কি খাইয়েছ ? কি ছিল খাবারে ? শক্তি পাচ্ছি না কেন ?’ একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে , প্রশ্ন করছে কি হচ্ছে ?

– আমি নিরাপদ দুরত্বে বসে আছি । হাত বাড়িয়ে আমাকে ছুঁতে চাইলো । ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসার কারনে হাত তুলতে পারছিল না । ভয়ংকর খুনে চোখে তাকিয়ে আছে ওরা ।

– হাসছিলাম । ঘৃণার হাসি । প্রতিশোধের হাসি । বিজয়ের হাসি । হাত বাড়িয়ে ওরা আমাকে ধরতে চাইলো বার বার । আমি নাগালের বাইরে  ঠায় বসে তাকিয়ে থাকলাম ঠাণ্ডা চোখে । ওরা এক সময় ঢলে পড়লো জ্ঞান হারিয়ে ।

-ওদের চেতনা নেই । এবার আমাকে দ্রুত কাজ সারতে হবে । অপর টিফিন বাটিটা খুললাম । ভেতর থেকে বের করলাম  দড়ি,  স্কচ টেপ  কাজল পেন্সিল । এবার ওদের শরীর থেকে কাপড় গুলো খুলে নিলাম । লজ্জায় ঘৃণায় গা রি রি করছে আমার । এবার দড়ি দিয়ে দুজনের হাত পা বেঁধে ফেললাম ।  খাটের দুই পায়ের সাথে দুজনের কোমর বাধলাম । এবার একটি দড়ির টুকরো নিয়ে দড়ির একমাথা  দিয়ে অভির এবং  অন্য মাথা দিয়ে বাদলের  বিশেষ অঙ্গকে বাধলাম ।

– এরপর কাজল পেন্সিলটা হাতে নিয়ে  বসলাম । ওদের সামনে । পানি ছিটিয়ে অপেক্ষা করছিলাম ওদের সচেতন হবার ।

–  ওরা আস্তে আস্তে চেতনা ফিরে পেতে শুরু করলো । এবং যখন বুঝল যে , ওদের সাথে কি করা হয়েছে,  আমাকে ওদের ডিকশনারিতে যত গালাগালি আছে সব উজাড় করে দিলো । তার পর ভয় । ওদের কতোটা ক্ষমতা আছে আর ওরা কি কি করতে পারে তার ফিরিস্তি দিতে লাগলো ।

– আমি নির্বাক বসে আছি । এতো কিছু বলেও  কাজ হচ্ছে না দেখে কাকুতি মিনতি শুরু করলো । অবশেষে চিৎকার জুড়ে দিলো ।

 

চলবে………………।

 

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা- রচনাকাল

১২/০৫/২০১৭ইং

 

 

আজও কেন এমন হয় পর্ব—৫

Now Reading
আজও কেন এমন হয় পর্ব—৫

– গ্রামের জন্য রাত এগারোটা অনেক রাত। একঘুম হয়ে যায় এখানে। আমি আর সুমিই যা একটু রাত  জাগি । পড়াশুনা  করি । গল্প করি । আমি গান শুনি ও ছবি আঁকে । আমি আরেকটু অপেক্ষা করবো ভাবলাম। সফুরাও এসে কিছু বলে গেলো না। মনে হয় খুব ব্যস্ত ছিল । ঘুমিয়ে পড়েছে । গত দুবার তো বলে গিয়েছিল যে সুমি আজ আসবে না । আজকে কি ভুলে গেছে ?

– চোখ ভারি হয়ে আসছিল। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম রাত পৌনে বারোটা বাজে। ইচ্ছে হচ্ছিল না একা খেতে, তবুও প্লেটে খাবার নিয়ে কয়েক লোকমা খেলাম। আর না, রেখে দিলাম। ওকে রেখে খেতে মন চাইছে না । এখন কেন যেন  মনটা হটাতই কেমন কেমন যেন করছে। খাবারেও  রুচি নেই । ওকে এতটা মিস করছি কেন ? আমিও পাগল , সকালে বকে দিলেই হবে । হুট করে আসবে না, এটা কি ?

– ঘুমিয়ে পড়াটাই বেটার মনে হল । কাল সকালে সফুরাকে ডেকে বলে দেব সুমি না এলে যেন জানিয়ে দেয় । আর সুমি আসতে  না পারলে যেন  অন্য কাউকে রেখে যায় । আজকাল একা থাকাটা মোটেই ভালো লাগে না । গা ছম ছম করে ।  পাজী ছেলেগুলোর কথা মনে এসে যায় । তখুন খুব অসস্থি হয় । আজ আর কিছুই করার নেই । অতএব আলো নিভিয়ে শুয়ে  পড়লাম । পুরোপুরি অন্ধকারে আমি থাকতে পারি না । তাই দুই রুমে ও বারান্দায় সব সময় ডিম লাইট জ্বালিয়ে রাখি ।

– ঘুমিয়ে পড়লাম। হটাত যেন একটা আওয়াজ শুনলাম মনে  হল । চমকে জাগলাম । আধো আলোতে চারিদিকে তাকালাম, আর কোন শব্দ নেই । একটু পর আবারও হোল । এবার বারবার টোকার শব্দ । দরজায় কেউ ? উঠে বসলাম, সুমি হয়তো । কোন কারনে আসতে দেরি হয়ে গেছে ?  না তো, জানালায় টোকা পড়ছে । ও তাহলে সফুরা হবে। বলতে এসেছে সুমি আজ আসবে না । আমি উঠে আলো জ্বালালাম,  জানালা খুললাম । তাকালাম অন্ধকারে । নেই কেউ ।

– কিন্তু কেউ তো টোকা দিয়েছে । আমি মৃদু গলায় বললাম, ‘কে সফুরা ? সুমি ? সুমি তুই ?’ কাউকে তো দেখছি  না । সফুরা টোকা দিয়ে কোথায় গেলো । এতো রাতে এমন ফাজলামি করার মানে কি ?

-এবার  আমাকে প্রচণ্ড অবাক করে যে লোকটি সামনে এসে দাঁড়াল – সে অভি । আমি বিস্মিত ভয়ার্ত কণ্ঠে বললাম, ‘তুমি ? তুমি এখানে কি করছ ?’  উত্তরের অপেক্ষা না করে আমি দ্রুত জানালা বন্ধ করতে চাইলাম । তখুনি অভি দ্রুত একটা হাত গ্রিলে ঢুকিয়ে জানালার পাল্লা আঁটকে দিলো । আমি তড়িতাহতের মত পেছনে সরে এলাম । কি চায় ও ?  কি চায় ওরা ?

-অভি  তেরছা  চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল , ‘ কি সুন্দুরি , কেমন আছো ? মনে নেই — তোমাকে বলেছিলাম আমাদেরকে দাওয়াত দাও , শুনলে না তো ?’

– আমি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললাম, ‘ প্রশ্নই উঠে না । তমাদেরকে দাওয়াত করে খাওয়াবো এটা কেমন কথা ? বাজে কথা বল না  ছি , ছি , এমনটা  ভাবো কি করে তোমরা ? এমন কথা বলছ কোন সাহসে ,চলে যাও ।‘

– ও আর  একটু কাছে সরে এসে বলল,  ‘শুনবে না  ?’

– আমি আঙ্গুল তূলে  কঠিন ভাষায় বললাম, ‘ দূর হ কুকুরের দল, আমার সামনে থেকে সর । শয়তান বদমাশ গুন্ডা । তোদেরকে পুলিসে যদি না দেই তো দেখিস । বজ্জাত ছেলে ।

-‘পুলিশ ? ভালোই বলেছ । যাও না একবার মন যদি চায় । প্রয়োজনে বাইকে করে পৌঁছে দেব । বড্ড দূর কিনা ।‘ বলে হাসতে লাগলো ।

-‘সব পুলিশ তোদের চাটুকার নয় । তোদের মত শয়তানদের কিভাবে শায়েস্তা করতে হয় সেসব পুলিশরা ভালোই জানে ।‘

-‘ ওকে ।‘   হাল ছেড়ে দেয়ের ভঙ্গিতে  বলল অভি, ‘জানতাম সুন্দরী  এটাই তুমি করবে । কিছুতেই হাতে আসবে না। এরকম দুয়েকটা ঘাড় তেড়া  মেয়ে পাওয়া যায় । নানান কথা তাঁদের । নানান ভাবনা । আর  তাই তোমার ঔষধের ব্যবস্থা করে এসেছি ।‘

-‘ বাজে কথা না বলে যাও ।  দুর হও । সবাইকে ডাকবো এখনি ।‘

– হা হা হা । এ কথায় অভি খুব হাসল ।  ‘ডাকবে ? ডাকো ? শুধু রাতে নয় , দিনেও যদি মাঝ রাস্তায় দাড়িয়ে আমাদের বিরুদ্ধে কিছু বল তো দেখবে আমাদের নাম শুনলেই মুহূর্তেই সব ফাঁকা । কোথাও কেউ নেই । দেখবে নাকি একবার পরিক্ষা করে ?  বাজে কোথায় সময় নষ্ট করতে চাই না । যা দেখাতে এসেছি তা দেখে নাও ।‘  ও পেছনে তাকিয়ে শিস বাজাল । অমনি অন্ধকার চিরে আলোয় বেরিয়ে এলো বাদল ।

– আমি তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছি কি দেখাবে ওরা ? ভালো করে তাকালাম । দেখলাম । দেখে আমি একেবারে বজ্রাহত। বাদল সুমির হাত ধরে আছে । সুমির হাত বাঁধা । মুখে রুমাল বাঁধা । সুমি হাত ছাড়াতে ছটফট করছে । ও আতঙ্কে কাঁপছে । সেই সাথে আমিও চরম আতঙ্কিত হয় তাকিয়ে আছি ।  আমি ওদের দুজনের দিকে তাকালাম । কুৎসিত হাসি হাসছে ওরা ।

– অভি খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল ,  ‘তোমার শাস্তি হিসাবে আজ আমরা লাল ফিতা নিল ফিতাকে  নিয়ে যাচ্ছি ম্যাডাম, আজকে ও  আমাদের আদর যত্ন দেখভাল করবো । আজকের মেহমান ।‘

–  ওর পেছন থেকে বাদল বলল ,  ‘মেহমানদারী , সুন্দরী মেডাম । মেহমানদারী । তোমার মত  কৃপণ নই যে মেহমানদারীকে ভয় পাবো । ‘ কথাটা বলেই খিক খিক করে হাসতে লাগলো ।

‘-ছাড়ো , ছাড়ো  ওকে।‘ আমি ফ্যাস ফ্যাসে  গলায় বললাম । অভি মুখ বাকা করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো । এবার আমি মিনতি শুরু করলাম। কান্নায় আমার গলা বুজে আসছিলো।  ‘প্লিজ,  ওকে ছেড়ে দেও,  প্লিজ।‘

– ওরা আমার কোন কথাকেই  পাত্তাই দিলো না । আমার ধমক আমার কান্না মিনতি অনুরোধ আমার ভয় দেখানো। সবই ওদের কাছে ছেলেমানুষি যেন ।

– হটাত করে অভি গম্ভীর হয়ে বলল ,  ‘চুপ করো , কথা শোন । আজ আমরা যাচ্ছি লাল ফিতা নিল ফিতাকে নিয়ে ।আর  তোমাকে সাত দিন সময় দিচ্ছি । এর মধ্যে যদি মত না পালটাও তাহলে তুমি ভাবতেই পারবেনা  আর কি কি করবো । আর একটা কথা, যদি তুমি এ বিষয়ে কাউকে কিছু বল তাহলে—ও হাত দিয়ে কুচি কুচি করে কাটার  ভঙ্গি করলো। ‘এই ভাবে । হা এই ভাবে, লাল ফিতা নিল ফিতাকে টুকরো করবো । আর ফিতা গুলো তোমাকে উপহার হিসাবে পাঠিয়ে দেব । তারপর তুমিও আমাদের জন্য লাল নিল ফিতা তোমার ওই লম্বা চুলে বেঁধে নেবে ।‘ কথা গুলো বলেই  অভি নিজেই  জানালার পাল্লা টেনে বন্ধ  দিলো ।

– আমি নিরুপায় রাগে ক্ষোভে  ভয়ে  লজ্জায় আধ্মরা হয়ে আছি । এখন কি করবো ? কি করা উচিত ? কাকে বলবো ? থানায় যাবো ? আব্দুল চাচার বাড়ি যাবো ? সুমিদের বাড়ি যাবো ? বেরিয়ে কারও সাহায্য চাইবো ? আর বাইরে যাবোই বা কোন সাহসে । বাইরে আজ কে কোথায় ওঁত পেটে আছে কে জানে ? আর  কিছু করতে গেলে সুমিকে না মেরে ফেলে । হয়তো আমাকেও ।

– কত কি ভাবছিলাম । কত উপায়, কত পথ । যেটাই ভাবছিলাম সাথে সাথে চাচির কথা গুলো মাথায় আসছিলো । চাচির কথায় যদি সত্যতা একটুও থাকে এরা খুব ভয়ঙ্কর একটি দল । এ গাঁয়ের অলিখিত স্বেচ্ছাচারী রাজত্ব ওদের । কাছের শহর আর কাছের থানাটিও বহু দূরে । আর কাছে থাকলেই বা  কি এমন ফায়দা হতো  তাতে ।  পুলিশ বাবারা ওদের কাছে ঘন ঘন আপ্যায়িত হত আর পকেট ভর্তি করতো । আমার মত সামান্য এক স্কুল শিক্ষয়িত্রী  কি করতে পারে ?  আর কতটুকু করার ক্ষমতাই বা  রাখে ।

– সারাটি রাত জুবু থুবু হয়ে বসে বসে ভাবলাম । আমি অনেক পথেই যেতে পারি । কিন্তু তাতে সফলতার সম্ভাবনা জিরো । যাদের হাতে আইন এবং অগুনিত টাকা তারাই তো এলাকার একচ্ছত্র হুকুমের মালিক হতে পারে মন চাইলেই । যাদেরকে প্রচলিত নিয়মে কিছু করা না যায় তাদেরকে কে কিভাবে কি করার ক্ষমতা রাখে । তাদেরকে কিছু করতে হবে একেবারে কঠিন কোন পদ্ধতিতে । এই দূর প্রত্যন্ত গ্রামে ওদেরকে এসে রুখে দেবার ক্ষমতা কি কারও আছে ?

– ঘুম তো দূর ,  দমবন্ধ অস্থিরতায় সময় যেন স্থির হয়ে আছে ।

– খুব ভোরে । তখনও আলো ফোটেনি । দরোজার বাইরে কারও কান্নার আওয়াজে চমকে লাফিয়ে উঠলাম। কণ্ঠ শুনে  মনে হল সুমি ।  দরজা খুলতে সাহস হল না । খুব কাঁদছে । এ সুমিই । হা এটা ওরই কণ্ঠ । সাবধানে জানালা দিয়ে দেখলাম ।  হা সুমিই তো । বসে আছে  মাটিতে ।  কাঁদছে । চারিদিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম আসে পাশে কেউ নেই ।  আমি খুব সাবধানে ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে সুমিকে টেনে ঘরে ঢুকিয়ে দ্রুত দরজা লাগিয়ে দিলাম । ওকে খাটে বসিয়ে আহত বিস্ময়ে দেখলাম,  ওর সে সকল চিহ্ন গুলো । যা বয়ান করে তার উপর যৌন নির্যাতনের দুর্বিষহ কাহিনী । যা একটি মেয়েকে সারা জীবনের জন্যেই  হয়তো শারীরিক মানুষিক আত্মিক ভাবে শেষ করে দেয় । অথর্ব করে দেয় । হৃদয় মনকে এমনই ছিঁড়ে ছিঁড়ে রাখে যে  সেই দুঃস্বপ্ন গুলো দেখতে দেয় না নতুন কোন মধুময় স্বপ্ন ।

-ওর সাথে সাথে আমিও কাঁদছিলাম। ভাবলাম সফুরা আসুক , তিনজন একসাথে থানায় যাবো । এবং যেভাবেই হোক আমি লড়বো । সুমির হয়ে লড়বো । অবশ্যই লড়বো । ওকে সুবিচার দিবই । ওকে নিয়ে শহরে যাবো । যতটুকু করার তা  করবো । তার চেয়ে বেশি করতে চেষ্টা করবো ।

-সকালে সফুরা যখন কাজে এলো আমি কিছু বলতে যেতেই ও একপলকে সব বুঝে গেলো । দ্রুত ও  দরজাটা বন্ধ  করে সুমিকে জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগলো । আমি ওকে বললাম চল থানায় যাই ।  কথাটা শুনে সুফুরা কান্না থাময়ে মিনতি ভরা গলায় যা বলল , তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে , সফুরা কিছুতেই এম পির লোকদের সাথে ঝামেলায় যেতে রাজি নয় । কারন ও এ বিষয়ে নিশ্চিত যে ও এম পির লোকদের বিরুদ্ধে  কিছু করতে গেলে তারা ওর পুরো পরিবারকে শেষ করে দেবে । ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেবে । গ্রাম ছাড়া করবে । কিম্বা কোন মিথ্যা মামলায় ফাসিয়ে দেবে । তার উপর মেয়ের সম্মান । তার তো  বিয়ে দিতে হবে । মেয়ের বদনাম বা নিজের ক্ষতি , কোনটাই ও চায় না ।

– তারপরও আমি জোরাজুরি করছি । এতো বড় অন্যায়ের পরও চুপ থাকা বা ওদেরকে হাতে নাতে ধরিয়ে দেবার সুযোগটা হাতছাড়া করাটা মারাত্বক ভুল । বেশি জোরাজুরি  করতেই সফুরা আমার পা জড়িয়ে ধরল । অনুনয় করতে লাগলো  আমি যেন কিছুতেই  এ ব্যাপারে কিছু না করি  । এবং কখনওই  মুখ না খুলি । আমি সফুরার হাত ধরে কিছু বলতে চাইলে ও ঝটকা মেরে আমার হাত ছাড়িয়ে কঠিন কণ্ঠে বলল, ‘টিচার আফা আপনের আর আমার মাইয়ার জন্যি কিছু ভাবতে হইব না । আমার মাইয়ার ভালো আমি বুঝি  । আপনে কে ?’ খুব রেগে কথাগুলো বলে ও আহত সুমিকে টেনে নিয়ে চলে গেলো ।

– আমি কিছু করতে গেলে ওর মেয়ে নয় শুধু ওর পুরো পরিবারই ভুগবে । আর আমি যেন ওর মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট না করি । এই যদি ওর বক্তব্য হয় তাহলে ওর দোষ কি দেয়া যায় ?

– এম পি সাহেব পারিবারিক ভাবেই  বহু আগেই  এরা অর্থ আর  ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত । নৈরাজ্য সৃষ্টি করা ছেলেগুলো উনার জ্ঞাতে কি অজ্ঞাতে এসব করছে এটা জানা কঠিন । ওরা মা মেয়ে চলে যেতেই আমি ভাবতে বসলাম সামনে যে বিপদ আমার উপর আসছে তার কি করা । কিছু তো করতেই হবে ।

– ভাবতে ভাবতেই সহসাই একটা উপায় মাথায় এলো। কয়েক দিনের ছুটি নিলাম স্কুল থেকে । ওদেরকে নিমন্ত্রন করবো । অতিথি হবার জন্য যারা এতটা মরিয়া,  এতটা হা পিত্যেশ, এতটাই নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী তাঁদের স্পেশাল নিমন্ত্রন পাবার শতভাগ ।  তাই গঞ্জে যেতে হবে কিছু কেনাকাটার জন্য । স্কুল থেকেই গঞ্জে যাবার পথেই দুই শয়তানকে পেলাম । আমাকে দেখেই বলল,  ‘ কি সুন্দুরি কেমন আছো ? কোন খবর আছে ?’

– নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে । শান্ত গলায় বললাম, ‘পরশুদিন রাতে তোমাদের নিমন্ত্রন ।‘

– কথাটা এমন আচমকা শুনে ওরা হকচকিয়ে গেলো । কিন্তু আমার শান্ত অসহায় আচরন দেখে ওরা খিক খিক হাসতে লাগলো । ভাবখানা এমন যে,  কি ? উপায় ছিল ? পথে তো এলেই মিছেই কথা খরচ করেছো । আমি বললাম, ‘পরশু রাতে এসো । তবে আমার বাসায় নয় ।‘

– ‘এ কেমন দাওয়াত ? বাসায় নয় তো কোথায় খাওয়া দাওয়াত ? ‘

– আমি মিনতির সুরে বললাম, ‘দেখো, আমি একজন টিচার। আমার বাসায় তোমরা আস এটা সেটা পান করো এটা ঠিক নয় । তোমরা অন্য জায়গা দেখো ।  আমি টিফিন বাটিতে করে তোমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসবো । ওখানেই আপ্যায়ন হবে তোমাদের । তাই কিছু ভালো বাজার আনতে গঞ্জে যাচ্ছি ।‘

– ওরা মহা খুশিতে আমাকে এক পরিচিতের বাড়ি চিনিয়ে দিলো । মালিক সপরিবারে কয়েকদিনের জন্য কোথাও গিয়েছে । তবে আমার বাসা হলেই যে ওরা স্বস্তি  পেতো । সেটা বার বার বলতে লাগলো ।

– আজ আমি বদমাসদের জন্য রাঁধছি । এছাড়া আর কোন পথ নেই । অনেক ভেবেই এটা করা । এ গাঁয়ের বিভীষিকা ওদেরকে যখন ফেরাতে পারবোনা তখন এটাই পথ । খুব সুন্দর করে কিছু আইটেম রান্না করে ফেললাম । কাল চেনা পরিচত সবাইকে বলেছি রাতেই   আমি কিছুদিনের জন্য বাড়ি যাচ্ছি । সবাই জানে আমি  চলে গেছি । – – – আমি বদমাশ গুলোর ওখান থেকে হয়ে বাড়ি চলে যাবো ।  মন খুব খারাপ আমার । অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনায় জড়িয়ে যাচ্ছি আমি । মা কে খুব মনে পড়ছে । মায়ের কোলে মাথা রেখে কাঁদতে পারলে একটু যেন শান্তি পাবো ।

-তখন বেশ রাত । গ্রামের জন্য এটা  অনেকবেশি রাত । পুরো গ্রাম যেন ঘুমিয়ে আছে ।  টিফিন বাটিতে খাবার ভরে দুটো টিফিন বাটি নিয়ে  সবার অলক্ষে নির্ধারিত বাড়িটির সামনে এসে হাজির হলাম । চারিদিক ভীষণ নির্জন আর অন্ধকার । এমনিতেই নয়টা না বাজতেই গ্রাম ঘুমিয়ে পড়ে । এখন তো  এগারোটা প্রায় ।

 

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা- রচনাকাল

১২/০৫/২০১৭ইং

চলবে……………।

আজও কেন এমন হয় -পর্ব — ৪

Now Reading
আজও কেন এমন হয় -পর্ব — ৪

দুতিন দিন হল আমি একাই যাচ্ছি । পঞ্চম  দিন ওদের দেখা পেলাম । আমাকে দেখে সোজা সামনে এসে পথরোধ করে দাঁড়াল। আমি এগিয়ে যেতে চাইলে একজন সামনে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল–   ‘প্লিজ।‘  একি কাণ্ড আমার বুক ধুপ ধুপ করে কাঁপছে । নিজেকে স্বাভাবিক রাখার প্রয়াস পেলাম । লম্বু এগিয়ে এলো , কিছু কথা আছে ম্যাডাম।

— আমি গলা চড়িয়ে বললাম ,  ‘কি ?হয়েছে ?’  কাল গ্লাস এগিয়ে এলো । ওর চোখ দেখা যাচ্ছেনা । কিন্তু মুখ জুড়ে শয়তানি হাসি । বলল , ‘আপনি আপনি করছিস কেন  বাদল ?  ডার্লিংকে কেউ কি আপনি বলে ?   তুমি করে বল ।‘   লম্বু যদি বাদল হয়,  আমি ভাবলাম,  কালো গ্লাস তাহলে অভি । আমার ভাইও কালো গ্লাস পরে । কি সুন্দর লাগে ওকে । মুখ জুড়ে তারুন্য আর সরল মুখের মায়াময় লাবন্যে গ্লাস পরা  ভাইটি  আরও যেন সুন্দর হয়ে উঠে । আর এই অভি ? আস্ত একটা শয়তান লাগে ।  লম্বু মানে বাদল এগিয়ে এসে বলল,  ‘তুমি খুব সুন্দর ডার্লিং ।‘  আমার রাগে শরীর ফেটে  যাচ্ছিল । বললাম,  ‘পথ ছাড়ো বেয়াদপ,  যেতে দাও ।‘

— অভি বলল,  ‘নিশ্চয় যেতে দেব,  নিশ্চয় ।  তার আগে একটু  আবদার আছে । মহামান্য ।‘

— আমি কড়া  ভাষায় বললাম,  ‘তোমাদের মত বেয়াদপের সাথে কোন কথা নেই। সর,  সরে দাঁড়াও।‘

— ‘ডার্লিং কথা তো তোমার শুনতেই হবে ।‘  বাদল বলল । সাথে অভিও গলা মেলাল,  ‘হা শুনতেই হবে ।‘

—‘  আমার শুনার ইচ্ছে নেই সময়ও নেই ।‘ ভেতরে ভেতরে খুব ভয় পাচ্ছিলাম । কিন্তু নিজেকে কঠিন দেখালাম ।

—‘ না ডার্লিং , না , সময় আর ইচ্ছা আমাদের হাতে বন্ধি থাকে । একটু কথা শুনলে তো ক্ষয়ে যাবে না । কথা না বাড়িয়ে মন দিয়ে শুন , আমরা একটা জায়গা খুঁজছি। পিপাসা পেয়েছে তো তাই ।‘

— ‘মানে ?’ আমি কিছুটা বিস্মিত।

— ‘একটু পান টান করতে চাই । পিপাসার্ত  মানুষকে পানিয় দেয়া কর্তব্য তোমার । তাই তোমার বাড়িটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে । আমরা চাই তুমি আমাদেরকে দাওয়াত দাও । খুদারতকে  খাবার দাও । পিপাসার্ত কে  পানীয় দাও । কি ,  ওই দিন বলেছিলাম  না ? মনে রাখা উচিত ছিল ।‘

—লম্বু বলল, আমাদের কথা আমরা ভুলিনা ।  কাউকে ভুলতেও দেই না ।‘

—‘ আমরা পান করবো আর ডার্লিং তুমি তো আছোই । মেহমানদারী করবা । বড়ই  খিদা,  বড়ই  পিপাসা ।‘  জিব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কালো গ্লাস বলল ।

— বাদল খুব উৎসাহের সাথে বলল,  ‘বিদেশী বোতল । তোমার মত সুন্দুরি মেমের জন্য বিদেশী,  আমদানি ‘

— প্রবল রাগে আমার চোখ জ্বালা করে মনে হচ্ছে মাথা ফেটে যাবে । আমি আমার পায়ের দুটো  স্যান্ডেল দু হাতে নিয়ে ওদের দুজনের গায়ে মারলাম । অভির হাতে আর বাদলের পেটে  গিয়ে লাগলো বাড়ি । এবার অভি আমার হাত ধরে ফেলল, এবং আমার চোখের দিকে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,  ‘তোমাকে সাত দিন সময় দিলাম । সাত দিন । তারপর দেখো ।‘

— বাদল বলল,  ‘সাত দিনের মধ্যেই জানাইতে হবে । আমরা এখানেই থাকবো দাওয়াতের অপেক্ষায়।‘

— অভি আমার হাতে জোরে চাপ দিয়ে বলল,  ‘তোমার সাথে সুন্দর সিস্টেমে আসতে চাচ্ছি । অন্য কেউ হোলে—‘ বলে , অনেকক্ষণ আমার দিকে  অর্থ পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঝটকা মেরে আমার হাত ছেড়ে ওরা উল্টো পথে টার্ন করলো ।

— আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছিল । আমি একটা গাছের শিকড়ে বসে অসহায় রাগে কাঁদলাম কিছু সময় । পরে  নিজেকে ধাতস্থ করে স্কুলে রওনা দিলাম । এসব কথা বলার মত কাউকে পাচ্ছিলাম  না । চার পাশ দেখে শুনে যা বুঝলাম , সবাই গা বাচিয়ে চলতে চায় । উল্টো আমাকেই গ্রাম ছাড়া করবে হয়তো । সাধারন নিরীহ নিরুপায় লোক আমার কষ্ট বুঝবে । কিন্তু ওদের চাটুকারী ও অধিনস্থ  যারা তারা নিজেরাই  আগুন দিবে আমার জীবনে ও সেই আগুনে ইন্দনও  দিবে ওরাই । আমার চাই একজন ওয়ান ম্যান আর্মি কেউ । এমন কেউ তো নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও আছে ।  অন্তত সাহসী কেউ । আমারই  চোখে পড়ে নি শুধু ।

— এর পর সুমি সুস্থ হয়ে এলে আমি আবার ওকে নিয়ে স্কুলে যেতে লাগলাম । ওরা এখন আর কাছে আসে না । গান টানও গায় না । ওরা তো আমাকে ওয়ার্নিং দিয়েই রেখেছে তাই দূরে দাড়িয়েই হাসাহাসি করে ।

— নিজের অজান্তেই আমি দিন গুলো গুনছিলাম। আজ সপ্তম দিন । তাই ভেতরে ভেতরে খুব অস্থির হয়ে আছি ।

— বরাবরের মত সুমিকে নিয়ে আজও যাচ্ছিলাম । ওদেরকে আগের জায়গাতেই পেলাম ।  না তাকিয়েও বুঝলাম ওরা আজ চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । কিন্তু কিছুই করলো না।

— বাসায় ফেরার সময়ও ওদের দেখলাম। ওরা কিছুই করলো না , দূরে দাড়িয়ে ফিসফাস করছে ।

— আমার ভেতরে কি ভীষণ উদ্বিগ্নতা ছিল সেটা আমি জানি । ভয়ার্ত দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকাতে তাকাতে জলদি পা চালিয়ে বাসায় এলাম । সুমি ওর বাড়ি চলে গেল । ও রাতে আবার আসবে । আমি নিজের ঘরে এসেই হাত পা ছড়িয়ে খাটে শুয়ে পড়লাম । ভালো লাগছে ।  ওরা কিছুই করলো না । আরও তিনটি দিন কেটে গেছে এভাবেই । কিছুই করলো না ওরা ? এতো ভালো লাগছিলো । নতুন করে নিজের জন্য স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম । সুমির জন্যও ।

—শোনা কোথায় কান দিতে নেই । যতটা খারাপ ওদের ভাবছিলাম ওরা ততটা খারাপ নয় । একটু বিগড়ে গিয়েছে এই আর কি । সঙ্গ দোষ আর বেহিসাবি সম্পদ অনেক সময়ই  মানুষকে বাঁকা পথে টানে । ভাবলাম একদিন ওদেরকে স্কুলে ডেকে সবাই মিলে সুন্দর করে বোঝাবো । ওরা  হয়তো নিজের  অজান্তেই কতোটা  গর্হিত ঘৃণিত  কাজ করছে ।

— দিনগুলো  কাটছে ভারহীন । মনটা ফুরফুরে । এই গ্রাম নিয়ে মনে মনে কত কি করার কল্পনা করছি । নিজেকে নিয়ে , সুমিকে নিয়ে , সুমির মা আর চাচিকে মানে আমার বাড়িওয়ালীকে  নিয়ে । গান বাজিয়ে নিজেও গুন গুন  করছিলাম । ভাবলাম আজ সুমির সাথে রবীন্দ্রনাথ ও তার গান নিয়ে সুমিকে কিছু বলবো । সেই সাথে উনার গানের সাথেও  ওর পরিচয় করিয়ে দেব ।

—রাতে খাবার রেডি করে চলে গেল সফুরা। ও গেলেই মেয়ে সুমিকে পাঠিয়ে দেবে। সুমি এলেই ওকে নিয়ে একসাথে খেতে বসবো। বই পড়ছিলাম। রাতে এই সময়টুকু আমি বই পড়ি। স্কুলের পেন্ডিং কাজগুলো দেখি। সুমি এলে খাবার পর আমরা একটু গল্প গুজব করি, ও স্কুলে কেমন পড়াশুনা করছে সে ব্যপারে কথা বলি। ওকে মাঝে মাঝে পড়া দেখিয়ে দেই। কখনও আবার দুজনই বই পড়তে থাকি।  আমি ওকে কিছু ছড়ার বই জোগাড় করে দিয়েছি। ও ওগুলো  খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ে। আজ ওর সাথে শুধু  রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আলাপ আর গান শুনা ।

— একদিন খেয়াল করেছিলাম ও আঁকতে খুব পছন্দ করে। এবং ওর আকাঁর হাতও দারুণ ভালো। ভাবছি এবার যখন ছুটিতে বাড়ি যাবো ওর জন্য আকাঁর সব সরঞ্জাম  নিয়ে আসবো। মেয়েটাকে এ বিষয় গাইড করলে বহুদুর যাবে। ভালো একজন আর্টিস্ট হবার সম্ভাবনা ওর মধ্যে আছে। এবং আমি ওকে যতদূর সম্ভব সাহায্য করবো।

— বই পড়তে পড়তে কখন যে এতো রাত হয়ে গেল খেয়ালই করিনি। ঘড়িতে রাত এগারোটা । চিন্তিত চোখে দরজার দিকে তাকালাম। সুমি এখনও আসছে না কেন। আজ কি আসবেনা?  আরও দু একবারও এমন হয়েছে  আসেনি । একবার ওর নানি এসেছিল তাই আসেনি । আবার যখন ও অসুস্থ্য তখন । আজ কি হল? হয়তো পরে আসবে ।

 

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা- রচনাকাল

১২/০৫/২০১৭ইং

আজও কেন এমন হয় — পর্ব—২

Now Reading
আজও কেন এমন হয় — পর্ব—২

— আজ যাবার পথে ওদের দেখিনি । কিন্তু ফেরার পথে নির্জন স্থানটিতে  ঠিকই দাড়িয়ে আছে  দেখলাম । ওরা আমার পেছন পেছন ধীরে বাইক চালিয়ে আসছিলো আর দুই পাজী বেসুরো গলায় গাইছিল—‘তু চিজ বাড়ি  হে মাস্ত মাস্ত ।‘  আরেক জন গলা মেলাল–  ‘আমার বাইকের পেছনে হেব্বি সাজিয়ে, তোকে নিয়ে যাবো রে ডার্লিং বানিয়ে ।‘

— এসব অশালীন কথায় আমি ভেতরে ভেতরে ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে আছি । আমি একজন শিক্ষক হয়ে এখানে এসেছি । এসব বাক্য আমার তো বটেই , অন্য যে কারও জন্যেও খুবই অশালীন । ওরা হটাত বাইক থামিয়ে দিলো । আমি আরও কিনার ঘেসে হাঁটছি । ওরা বেশ দূরে দাড়িয়ে হা হা করে হাসছে । আর ঠিক তখন  হটাত ফুল স্পিড তূলে আমার গা ছুঁয়ে ছুটে গেল । আমি এমন ভয় পেলাম যে একটি গাছের শেকড়ে পা বেঁধে উপুড় হয়ে পড়লাম ।  আবারও ওরা একটু দূরে দাড়িয়ে কিছু সময় হাসতে হাসতে শিস দিতে দিতে চলে গেল । এদিকে  আমার দুহাতের চামড়া ছিলে গেল ।

—বাসায় ফিরেও মনটা খুব খারাপ  ছিল । বিকেলে  বিলে ঘুরতে চলে গেলাম । এখানটায় এলে আমার মন ভালো হয়ে যায় । কি সুন্দর জায়গাটা । উপরে বিস্তৃত নীল আকাশ, নিচে বিস্তৃত বিল ।  মেঘেরা দুরন্ত বাতাসে ছুটে যাচ্ছে । নিচের পানি তির তির করে কাঁপছে । নড়ছে গাছের পাতারা । নড়ছে ফসলের গাছ গুলো । সাথে শিশুদের আনন্দ কলকাকলি ।

— দুতিন দিন ওদের আর দেখা যায় নি । কখনও একটানা দেখি আর কখনও দুইতিন দিনের জন্য হাওয়া । মনে মনে ভাবি না জানি কোন কুকর্মের জন্য গিয়েছে । আজও  বিকেলে আমি বিলের ওদিকটায় হাঁটছি । হটাতই পেছনে কারও আওয়াজে চমকে তাকালাম। এবং দেখি সেই দুই ছেলে দাড়িয়ে হাসছে । আমি তাকাতেই কালগ্লাস  বলল,  ‘কি ম্যাডাম বাতাস খান?’  ওদেরকে আমি কালো গ্লাস ও লম্বু বলে মনে মনে ডাকি । কারন ওদের একজন সবসময় কালো গ্লাসো পরে থাকে,  অন্যটি বেশ লম্বা ।

—  লম্বু বলল,  ‘ভালো ভালো জিনিস রেখে শুধু বাতাস খাচ্ছেন কেন ?’

— কালো গ্লাস বলল, বাতাস খেয়ে আগে  নিজেরে ফিট করুক, তারপর ভালো জিনিস ভালো হজম হবে।‘

—‘ভাই এক্কেবারে আসল কথা বলছ । শহরের মেম । গ্রামের বাতাস দরকার ।‘

—  ক্ষেতের চিকন আইল জুড়ে ওরা দাড়িয়ে হাসছে আর উল্টো পাল্টা কথা বলছে ।  আইলের এক পাশে ক্ষেত অন্যপাশে ডোবা। মাঝখানে চিকন আইলটি । ওরা না সরলে যাওয়া সম্ভব নয়। আমি বললাম,  ‘সরে দাঁড়ান যেতে দিন।‘  লম্বু বলল, ‘ যান ম্যাডাম যান।‘  কিন্তু কালো গ্লাস বলল,  ‘আগে বলেন কবে খাওয়াবেন।‘

—‘সরে দাঁড়ান ।‘

—‘দাওয়াত না পেলে যে পা নড়ছে না ম্যাডাম ।‘

— ‘মানে?’ আমি বললাম

— ‘মানে? হি হি  মানে?’  দু’জন হি হি করে হাসতে থাকে।

— আমি কঠিন গলায় বললাম,  ‘যেতে দিন।‘

— এবার দুজন দুপাশে সরে দাঁড়ায়। আমি দ্রুত হাঁটছি । এর মধ্যে লম্বু আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল,  ‘খুব খিদা লেগেছে ম্যাডাম। ভুলে যাবেন না । কালকে আপনার বাসায় কি একটু খাওয়াদাওয়ার ব্যাবস্থা করা যায় ? ‘

—কালো গ্লাস বলল,  ‘তুই শালা একটা হারামি । এতো তর তর করছিস কেন ? সময় দে । ম্যাডামকে ,  যান ম্যাডাম সময় দিলাম ।‘

— আমি কোন উত্তর না করে একরকম দৌড়েই বাসায় ফিরে এলাম। অসুস্থতার কথা বলে পরদিন স্কুলে গেলাম না। কি হচ্ছে এগুলো ? এদের কথা কাকে বলা যায় , বুঝতে পারছি না ।

— গতকাল স্কুলে যাওয়া হয়নি। প্রাইমারি স্কুলে ছুটি কম। যেতেই হবে। বাচ্চাদের পড়াশোনার বিষয়টাও আছে । সামনে পরিক্ষা । তাই স্কুলের বড় আপা কথা শোনালেন । এ সময় ছুটি নেয়া চলবে না। বাচ্ছাদের পড়ায় ক্ষতি হবে। পরিক্ষা খারাপ করবে। নানান কথা মাথা নিচু করে দশ মিনিট বড় আপার কথা শুনলাম। আমার সমস্যাও সত্যি বড় আপার কথাও সত্যি। ব্যক্তিগত সমস্যার জন্য তো দায়িত্বে অবহেলা করা যাবে না।

—আজ পথে দুই যন্ত্রণাকে দেখিনি। এই স্বস্তিটুকু ক্ষণস্থায়ী  জানি,  তারপরও ভালো লাগছে । পথের দুপাশের অসাধারন সৌন্দর্যকে দেখছি । আমার বাংলাদেশের সবুজ সুন্দরতা । আজ কি প্রশান্তি ।  যেদিন ওরা থাকে সেদিন তো কেঁচো হয়ে থাকি । উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে থাকি আপন  গন্তব্যে । অন্ধ বোবা কালা এক অবলা । যদিও আমি নিজেকে ততটা অবলা ভাবি না । কিন্তু এই পরভুমে কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে আছি । ইভ টিজিং বহু দেখেছি । এরা বাড়াবাড়ি করছে । কারও সাথে আলাপ করতেই হয় এসব নিয়ে  ।

— কিছু তো করতে হবেই । কি করি ?  কি করি ? ভাবতে ভাবতে রাতে আমি সুমিকে নিয়ে আব্দুল চাচার বাড়ি গেলাম । আব্দুল চাচা বাড়ি নেই । গঞ্জে  গেছেন । আমাকে দেখে খুব খুশি তিনি । আমি চাচির সাথে বসেই কথা বলতে লাগলাম । চাচি আমাকে আদরে বসালেন ।  চাচি ব্যাস্ত হলেন  আমাকে আপ্যায়নে, প্রথমে লাল রঙের শরবত নিয়ে এলেন। আমি বারবার মানা করার পরও প্লেটে করে চমচম পিঠা, মুড়ির মোয়া, নারিকেলের নাড়ু নিয়ে এলেন। আমাকে খুব যত্ন করে খাবার দিতে লাগলেন। চাচি নিজের হাতের পায়েস কত মজাদার সেটা বলে দাওয়াতও দিয়ে ফেললেন ।

—  কিন্তু আমিতো এসেছি ঐ পাজী দুই ছেলের ব্যপারে কথা বলতে ।  কিন্তু কিভাবে কি বলবো বুঝতে পারছিনা । চাচি ভীষণ খুশি মনে হাসছেন আর কথা বলছেন  কত কথা । আমার কথা উনার কথা । কত কি । এতদিন এলাম না কেন সেই অভিযোগ করলেন ।  তিনি গেরস্ত বাড়ির বউ । কোথাও বের হন না। বাড়ির কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকেন । অতএব আমি যেন সব সময় যাই । ব্যবহারে কি ভীষণ অমায়িক ।  গাঁয়ের সুদ্ধ সরল পরিচ্ছন্ন মন । বাংলার চির চেনা এক নারী । আর সেই একই গাঁয়ের এমন দুর্মুখ ছেলে, অবাক কাণ্ড। এই দুটো পাজী একেবারেই দলছুট।

— কথার এক সুযোগে আমি ওই দুটি ছেলের কথা জিজ্ঞেস করলাম। থমকে দাড়িয়ে গেলেন তিনি ।  ‘কার কথা বলছেন টিচার  আপা ?’ এতক্ষনের হাসিখুশি মানুষটি মিইয়ে গেলেন যেন  মুহূর্তেই ।

চলবে————-।

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা – রচনাকাল

১২/০৫/২০১৭ইং

আজও কেন এমন হয় – পর্ব–১

Now Reading
আজও কেন এমন হয় – পর্ব–১

 

—শিক্ষিকার চাকুরিটা পেয়ে আমি এক দিকে যেমন খুশি হলাম খুব অন্যদিকে চিন্তিতও হলাম। আমি থাকি শহরে। এখানেই আমার বসবাস বেড়ে উঠা নিজ বাড়িতে, কিন্তু চাকুরীতে জয়েন করতে হবে আমাকে বহুদূর প্রত্যন্ত গ্রামে। বাড়ি থেকে আসা যাওয়া করে চাকুরী করা সম্ভব নয়। আমাকে তাই বাধ্য হয়ে স্কুলের কাছাকাছি একটি বাসা ভাড়া করতে হল।

—স্কুল থেকে প্রায় পনর বিশ মিনিটের হাঁটা পথে আমার বাসাটি । দুটি রুম আর দুপাশে দুটো বারান্দা সহ ছোট বাসাটি। পেছনের নিচু চালের বারান্দার দুপাশে রান্নাঘর আর বাথরুম। বাড়িটা  পাকা। উপরে টিনের চাল। এখানে কে আসবে বাসা ভাড়া করে থাকতে ? নিতান্তই বিপদে না পড়লে । এই দূর গাঁয়ে এটাই অনেক পাওয়া ।

— যে ভদ্রলোক বাসাটির  মালিক মানে বাড়িওয়ালা, উনাকে  আমি আব্দুল চাচা বলেই ডাকি। গ্রামের আর দশটি সাধারন লোকের মতই তিনি ধার্মিক সরল ও নরম মেজাজের । তিনি আমাকে একটি রান্না আর অন্যান্য কাজের  জন্য একটি মহিলা জোগাড় করে দিলেন। সফুরা । সফুরা  সারাদিনের কাজ শেষে সন্ধ্যায়  বাড়ি ফিরে যায়। আর ওর ছোট মেয়েটাকে আমার কাছে রেখে যায়। রাতে একাকি থাকাটা আমার পছন্দ হচ্ছিল না বলে সফুরাকে বলে ওর মেয়ে সুমিকে আমার কাছে রাতে থাকার বন্ধবোস্ত করে নিলাম।

— প্রথম কয়েক দিন খুব অস্থিরতার মধ্যে কাটলো । এই প্রথম একাকি আমি স্বজন ছেড়ে বহুদুর। বাবা মাকে ছেড়ে এই প্রথম একাকি কোথাও  থাকা । সফুরা আর সুমি আমার সে অভাব খানিকটা হলেও কমিয়ে দিলো । রাতে সুমির সাথে নানা রকম গল্প করে কাটিয়ে দেই সময়। নয় দশ বছরের মেয়েটি। গ্রাম্য-সবলতায় ভরা। মজার মজার সব কথা বলা ছোট্ট মেয়েটি ।

— মাঝে মাঝে বিকেলে বের হই আমি। গ্রাম দেখতে । আমার বাসার সামনে দিয়ে রাস্তাটি, আড়াআড়ি ভাবে পূর্ব পশ্চিমে চলে গেছে । পুব দিকে বিলের পাশ ঘেসে  আমার স্কুলের সামনে দিয়ে রাস্তাটি  গঞ্জের দিকে গেছে । পশ্চিমে রাস্তার শেষে মুল গ্রামটি ।  বাসার লাগোয়া বিশাল আম বাগানটির পরই আব্দুল চাচার বাড়ি । বাসার থেকে দুই মিনিটের দুরত্বে একটি মুদি দোকান ও চায়ের দোকান । স্কুলে যাবার পথে  দোকানটি পড়ে ।  ওখানে সব সময় আব্দুল চাচাকে দেখি। তিনি একমনে পেপার পড়ছেন বা গল্প করছেন । এটা আব্দুল চাচার ভাতিজার দোকান । চাচা  আমাকে দেখলেই জিজ্ঞেস করেন। ‘কেমন আছ মা ?’

–‘জি চাচা ভালো। একটু হাঁটতে বের হলাম।‘

–‘ভালো করছ মা। হাঁটাহাঁটি ভালো। শরীর ভালো থাকে । আমাদের গ্রাম খুব সুন্দর গ্রাম। দেখো। ঘুরে ঘুরে দেখো।‘

— ভাতিজা ছেলেটাও অমায়িক ব্যবহার চাচার সাথে গলা মিলিয়ে বলে, ‘টিচার আফা, এই গ্রামের আর গ্রামের  বিলের মত সুন্দর জায়গা বাংলাদেশে নাই । আমাদের ছোট বেলার খেলার জায়গা । এখনও যেতে চাই কিন্তু  দোকানের কাজে সময় হয় না ।‘

—এমনি আরও কত কথা । ওদের কথা শুনতে শুনতেই  আমি দোকান পেরিয়ে এগিয়ে গেলেই এখানে এসে দুটো পথ দুদিকে চলে গেছে। এই তিন রাস্তার মোড়টি একটি বিলের  দিকে অন্যটি স্কুলের দিকে চলে গেছে । এবং গঞ্জের দিকে ।

—  বিলের ধারে আসতে আমার খুব ভালো লাগে । এখানে কোথাও ধানের ক্ষেত কোথাও খালি জমি। কোথাও পানির ডোবা। এখানে ওখানে বিচ্ছিন্ন কিছু গাছ জন্মে আছে ।  বহুদুর পর্যন্ত খোলা প্রান্তরের মত। এখানে এসে দাঁড়ালে উদ্দ্যাম বাতাসে যেন উড়িয়ে নেয়। ভীষণ ভালো লাগে আমার । চাষিরা ক্ষেতে কাজ করছে । বাচ্চারাও ছোট ছোট দলে খেলছে । বিলের কাঁদা পানিতে মাছ ধরার চেষ্টা করছে । কারও সামনে পড়লে হেসে সালাম দিচ্ছে , ‘টিচার আফা সালাম । ‘

—  আমি একজন স্কুল শিক্ষক । সেই হিসেবে সাধারনের কাছে আমার সম্মান প্রাপ্য। এতে কেউ বয়সটা দেখেনা। যদিও আমি সবে ভার্সিটি  শেষ করেছি। বয়স পঁচিশ পেরোয়নি ।

—এ গ্রামটি আমার ক্রমশই ভালো লাগছে । আমি ছোট না বড় নারী না পুরুষ সেটা ফ্যাক্ট না হয়ে আমার কাজটাকেই  প্রাধান্য দেয় সবাই । এবং সেটাই দেয়া উচিত। একজন শিক্ষককে সমাজ প্রায় বাবা মায়ের সম পর্যায়ের সম্মান দেয় । তাই এ গ্রামে আমার বসবাস সহজ হয়েছে । দিনগুলো যাচ্ছে মসৃণ ভাবে ।

—আমি স্কুলে যাই বা আর কোথাও যাই এই একটি পথই আমাকে যেতে হয়। এতো সুন্দর গ্রাম । গ্রামের সরল সিধা মানুষগুলো, একটি  সরকারী  চাকুরী । ভালো বেতন । ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা । আর স্কুলটাও আমার পছন্দ হয়েছে ।  সবই বেশ ভালো লাগছে । আর সুমি তো দারুণ একটি মেয়ে । ওর সাথে সুন্দর সময় কাটে আমার । আনন্দ পাই ওর ছেলেমানুষী কাজে । অবাক হই ওর  মায়ের সরলতায় ।

— একদিন সন্ধ্যায় ভেজা কাপড়ে সুমি আমার বাসায় আসে । হাতে একটা গামছার পুটুলি । অবাক হয়ে বললাম,  ‘  কিরে তুই ভেজা কেন ? এখন এলি কেন ? তোর তো রাতে আসার কথা । কি হয়েছে ?’

— ‘আফা আপনের জন্যি আনছি ।‘ বলে গামছার পুটুলিটা বাড়িয়ে ধরে ও ।

— ‘কি এটা ?’আমি বললাম ।‘

— ‘মাছ ।‘ বলে পুঁটুলিটি খুলে ধরে ।

— ‘মাছ ? মানে ? কি বলছিস । মাছ কেন ? গামছায় করেই বা কেন ?’

— ‘ আমি ধরছি । আপনের জন্যি । ওই বিলে। গামছা দিয়ে ধরছি গো আফা ।‘

— আমি তো হা । কি বলছিস তুই ?  অবাক হয়ে বললাম, তুই বিলে গিয়ে গামছা দিয়ে মাছ ধরলি , আমার জন্যে ?  কেন ?’

— ‘আপনি খাইবেন । এই নেন ।‘  লাজুক হেসে ও বলল।

— ‘কি পাগলামি এসব । আমি কি বলেছি মাছ খাবো ? সারাদিন কি এমন ঘুরে বেড়াস ? স্কুলে তো যাস না । স্কুল ফাঁকি দিয়ে কাঁদা পানিতে হুটোপুঁটী করিস । এটা কি ঠিক ?  শোন এটা তোর মাকে দিয়ে আয় । আর পড়া ছেড়ে এসব করা বন্ধ কর সুমি , কেমন ?‘ কথাগুলো শুনে সুমি মুখ বেজার করে চলে  গেল ।

—আমি জানি ও আমাকে খুশি দেখতে চায় । ওর সাধ্য মত ও কিছু করতে চায় । ওর সাথে আমার ধীরে ধীরে কোথাও একটি বন্ধন তৈরি হয়ে যাচ্ছে । প্রায়ই ভাবি সুমির জন্য কিছু করতে । আমি ভাবলাম অন্তত একটা সুমিকেও গাইড দিয়ে নিজের পায়ে দাড় করাতে সাহায্য করে,  বড় কিছু একটা গড়ে দেওয়া যায় । সমাজের কিছু উপকার হয় ।

— সাবলীল দিনগুলোর মাঝেই  একটা জিনিস আমার চোখে আজকাল লাগছে খুব । সেটা হচ্ছে তিন রাস্তার মোড়ে বেশ কিছু ছেলের আড্ডাবাজি । এক হিসাবে এটা অবাক করার কিছু নয় । এখানে দুতিনটি চা ও মুদির দোকান । লম্বা বেঞ্চ পাতা আছে । তাতে বসেই এই সব ইয়াং ছেলেরা চা যতটা না খায়  হৈ চৈ করে তার শত গুন । গ্রামের বয়সীরা পারতপক্ষে এখানে আসেন না। কিছু পথিক হয়তো কখনও এসে বসে । ইয়াং ছেলেরা চায়ের দোকানে বসে গল্প করবে । দুষ্টুমি করবে এবং হেটে যাওয়া মেয়েদের দিকে হা হয়ে তাকাবে এটা খুবই স্বাভাবিক । অল্প বয়সী ছেলে মেয়েরা একে অন্যের দিকে কৌতূহলে তাকাবে এটাই মানুষের স্বাভাব ধর্ম ।

— আমি টিচার বলেই আমাকে কিছু বলছে না হয়তো । অন্য সাধারন মেয়েদের টিপ্পনী কাটতে ওদের উৎসাহের কমতি নেই । ঢালাও ভাবে ওদের সবাই হয়তো খারাপ নয় । কেউ সংগ দোষী বা সাধারন উৎসাহী দর্শক । সন্ত টাইপের কেউ যে নেই এটা ঠিক । যদিও কখনও এদের আমি শালীনতার উর্ধে যেতে দেখিনি ।

—তবে  ইদানিং যে জিনিসটা আমাকে বিরক্তও করছে তা হল মোটর সাইকেলে করে দুটি ছেলে কাণ্ড । কখনও মোড়  থেকে কখনও বাসার কাছ থেকে আমার পিছু নেয় । প্রথম দিকে আমি এগুলকে দুএকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বৈ কিছু নয় ভেবেছি । কিন্তু একসময় লক্ষ করলাম, প্রতিদিন ওদের তিব্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে দিয়ে আমাকে জাতায়াত করতে হচ্ছে । প্রায় দিনই নিরিহ ভঙ্গিতে বাইকটি নিয়ে ওরা আমার সামনে পেছনে ছুটে যায় । কিন্তু বিরক্তিকর ব্যাপার যেটা সেটা হল যেখানেই রাস্তা একটু নির্জন সেখানে ওরা বাইকের গতি ধীর করে দিয়ে সিনেমার রোমান্টিক গান গুলো গাইতে থাকে । মিছে ঝামেলায় জড়াতে চাই না বলেই আমি ওদেরকে দেখলেই রাস্তার একেবারে কিনার ঘেসে দ্রুত হাঁটতে থাকি, কিছুই না জানার ভান করে । তাতে ওদের উৎসাহ মোটেই কমে না । আমাকে এমন এড়িয়ে যেতে দেখে হাসতে হাসতে গা ঘেসে চালেতে থাকে ।

—  কি করবো , কাকে বলবো ? বলে আবার কোন ঝামেলায় পড়ি । পরিবার রেখে পরদেশে আমি । দূর প্রত্যন্ত গ্রামে একাকিনী এক যুবতি নারী আমি ।

—চলবে—

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা- রচনাকাল

১২/০৫/১৭

এফডিসির কাদা ছোড়াছুঁড়িতে সিনেমাঙ্গনের ভবিষ্যৎ শংকায়

Now Reading
এফডিসির কাদা ছোড়াছুঁড়িতে সিনেমাঙ্গনের ভবিষ্যৎ শংকায়

দেশীয় সিনেমায় বর্তমানে হট টপিক বলতে যা বোঝায় এফডিসির নির্বাচন,নতুন বির্তকিত প্যানেল,শাকিব খানের নিষেধাজ্ঞা আবার পুর্নবহাল এমনকি নায়করাজ রাজ্জাককে নিয়ে কটুক্তি সব মিলে একটা অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে যাচ্ছে বলা যায় ঢালিউড……………….

বাংলা ছবির সোনালি সুদিন কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে।একটা সময় সিনেমা কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গণ্য হতো।কোন নির্দিষ্ট সংখ্যক লোকের দ্বারা তা নির্মাণ ও পরিবেশিত হতো। দেশে বা দেশের বাইরে গণ মানুষের বিনোদনের খোরাক ছিল এই ছবি।আমাদের দেশে চলচ্চিত্রের একটা বিরাট প্রভাব রয়েছে এফডিসির কেননা দেশীয় চলচ্চিত্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছবি যে এখানে নির্মিত হতো।আমরা যারা বর্তমান সময়ে তরুণ দর্শক আমরা ৯০ দশকে ছবি দেখে বড় হয়েছি তাদের সবার মনে এক ধরনের ছবির ফ্রেম গাঁথা আছে যেখানে সুন্দর একটা পরিবার ছিল নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে দিনশেষে সবাই আমার মিলিত হয়েছে।আধুনিকতার ছোঁয়ায় দর্শক এখন পরিণত ২০০০ সালের পর থেকে কোন এক অজানা কারণে ঢাকাই ছবির মধ্যে নোংরা একটা প্রতিযোগিতা কর্দয মানসিকতার পরিচয় বহনিকারী কিছু গল্পের প্রর্দশনী বা নির্মাণ শুরু হতে লাগল।এই সময়ে আমরা দেখেছি গল্পের মৌলিকতা কে ম্লান করে দিয়ে কাট কপি পেস্ট টাইপ কিছু দৃশ্যের সংযোজন যা দর্শক টানার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হতো।মূলত তখনো দক্ষিণ ভারতের ছবি বা ভিনদেশী ছবির অণুকরণের চর্চা ছিল না।ঐ একই সময়ে দুটো পক্ষ তৈরি যাদের মধ্যে একটা পক্ষ ঢাকাই ছবির বাজারকে রক্ষা বা মানস্মত ছবি দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।

বাণিজ্যিক ঘরনার ছবিকে বাজে অজুহাত দিয়ে সেসময় অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে কেননা তাদের অবস্থানটা ভিন্ন মাত্রার একটা দ্বান্ধিক পরিবেশে অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিল না।

রিয়াজ, শাকিল খান কিংবা আমিন খানের পর কোন নায়ক সেভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে নি।তবে সবচেয়ে বড় অঘটন হয়েছে বাংলা ছবির ক্ষণজন্মা নায়ক মান্নার অকাল মৃত্যুতে। এই দুর্দিনে ছবির বাজার মূলত দুই ঈদ কেন্দ্রীক হয়ে পড়াতে তা ক্রমশ ছোট হয়ে এসেছিল।এই সময় হল মালিক বা প্রযোজকদের অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে।এই সময়ে একটা ভিন্ন ধারা চালু রেখেছে ঢাকাই ছবির কিং খ্যাত শাকিব খান।নিজের একটানা উপস্থিতি আর দর্শক হৃদয় জয় করার মধ্যে দিয়ে আজ অব্দি তার ছবি হলে হাউজফুল হয়।২০০৫ থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট একটা সময়ে যখন ছবির অশ্লীলতা দর্শক বিমুখতার কারণ ছিল,পাশাপাশি স্যাটেলাইট চ্যানেলে ভারতীয় ছবির সহজলভ্যতা দর্শককে হল বিমুখ করার কারণ ছিল বটে। ঐসময় শাকিব খান সমস্ত কিছু হতে নিজেকে আলাদা রেখেছে এবং আজকের জায়গায় এসেছে।

ক্ষমতার দ্বন্ধ বা মোহ সবার থাকে আপনারা কেউ কেউ হয়তো শাকিবের একচ্ছত্র আধিপত্যেকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে পারেন। আপনাকে এটা মানতে হবে প্রতিযোগিতা সবার জন্য সমান।

আমরা বিগত বছরগুলোতে দেখেছি শাকিব খান বা শীর্ষস্থানীয় ভিলেন অভিনেতা মিশা সওদাগর একই সাথে নির্বাচন করে চলচ্চিত্রের সুনাম ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর ছিলেন।আমরা যারা ঢালিউডের ছবির নিয়মিত খোঁজ খবর রাখি তারা অবশ্যই দেখতে পাই হল মালিকগুলো ঈদ বা বড় উপলক্ষকে কেন্দ্র করে শাকিব মুখী হয়ে থাকে। এটা শাকিব খানের একার কৃতিত্ব না বরং যেসকল পরিচালক প্রযোজক শাকিবের উপর আস্থা রেখেছে তারাও পাশাপাশি এই কৃতিত্বের দাবিদার।

আমরা অনন্ত জলিলের আগমন যেমন দেখেছি তেমন ফুরিয়ে যাওয়াটা দেখেছি কেননা তিনি ছবি করেছেন কিন্তু গণ মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারে নি। এই একটা কারণ তার হারিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট বলা যায়।

আধুনিক বা সৃষ্টিশীল দর্শকের ব্যানারে ছবিয়াল ও মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর ভাই ব্রাদার টিম হতে গুটি কয়েক ছবি পেয়েছি কিন্তু এই ছবি দর্শককে নিয়মিত হলমুখী করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। তাছাড়া পারিপার্শ্বিকতায় এসব ছবি দর্শকের কাছে পৌঁছানোর কোন সুযোগই পাই নাই।

চোরাবালি,টেলিভিশন,পিঁপড়াবিদ্যা,মনপুরা নির্মাণশৈলীর দিক দিয়ে ভাল ছবি কিন্তু দর্শক কাটতিতে তা সুবিধা করতে পারে নি।এই যে দর্শকের ভালবাসা বা একটা স্রোত এটা যে কেউ একদিনে তৈরি করতে পারে না।

আমাদের ভারতীয় ছবির দেখার অভিজ্ঞতা আছে রজনীকান্তের একটা ছবি কাবালি যেটা কিনা মোটামুটি মানের একটা গল্প নিয়ে বাম্পার হিট হয় ব্লকবাস্টার হয়। এটার কারণ নিছক রজনীকান্তের জনপ্রিয়তা ।

আমাদের ঢাকাই ছবিতে শাকিবের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে তাই তার যে বাজার চাহিদা বা জনপ্রিয়তা তা যেকোন প্রযোজককে ভরসা দিতে পারবে।

সম্প্রতি আমার এক বন্ধুকে বললাম শাকিবের সত্তা ছবিটা দেখব।বন্ধুকে হলে যেতে বললাম কিন্তু শাকিবের নাম শোনাতে নাক ছিটকালো এটা তার মানসিকতা ।তার অদূরদর্শী মানসিকতা তো সত্তা ছবির গুণকে ম্লান করে দিতে পারে না।তবে এই একই দর্শক আয়নাবাজি দেখতে গিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে কেননা এই কৃতিত্ব সম্পূর্ণ অমিতাভ রেজা চৌধুরির টিমের বরাবর।উনি এত বড় বিজ্ঞাপনী সংস্থা চালান ছবির প্রচার কৌশল ওনাকে দেখে কেউ যদি শিখে তা দেশীয় ছবির জন্য ভাল।

এইতো গেল ছবি নিয়ে সম্প্রতি যে হালচাল তার বর্ণনা,আমরা ছবির বাজার বা সার্বিক অবস্থাকে বিপদাপন্ন করছি আমলাতান্ত্রিক কিছু সমস্যা আর জটিলতা নিয়ে।শিল্পী সমিতির নির্বাচন আর শিল্পীর কাজ করার জায়গা দুটো আলাদা তার মধ্যে স্বতন্ত্রতা থাকতে হবে।যেখানে দেশের মন্ত্রণালয় বিদেশী ছবির ব্যাপারে আগ্রহী সেখানে শাকিব খান যদি বিদেশী ছবি বা যৌথ প্রযোজনায় অভিনয় করে তা অনেকাংশে কম দোষের দেখায়।দেশীয় ছবির বড় প্রযোজক ফলাও করে ছবি করছে কেননা সবার আগে তার ব্যবসায়িক স্বার্থ তো তাকেই দেখতে হবে। এই একই অর্থে শাকিব খান নিজেই তার দর্শক বা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে যৌথ প্রযোজনার ছবি করতে পারে।বড় পর্দায় শাকিবের উপস্থিতি কমে গেলে আপনি আমি শাকিবকে গুলশানের বা নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা মনে করলে ভুল হবে না।

আমরা ক্ষমতার মোহে বা স্বার্থ ও তদসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কোন ব্যাক্তির যাবতীয় কর্মকান্ডকে খাট করে দেখার মত অন্যায্য কাজ করতে পারি না।

শাকিবের বিয়ে,প্রেম,ভালবাসা এইসব বিষয় টেনে যদি আমরা শাকিবকে খাট করে সাময়িক ফায়দা নিতে চাই তা নিতান্তই বোকার স্বর্গে বাস করছি।সম্প্রতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শাকিবকে হামলা করা হয়েছে।নায়করাজ রাজ্জাককে অপমান বা কটুক্তি করা এইগুলো সব আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলা চলে।নিজের অস্তিত্ব বা ভাবমূর্তিকে ঠিকিয়ে রাখতে এটা করছেন হয়তো কিন্তু শাকিব খানের ছবি ছাড়া ঈদের কোন শো যদি ফ্লপ হয় বা ছবি থেকে দর্শক মুখ ফিরিয়ে নেয়।পাশাপাশি বর্তমান নির্বাচিত প্রতিনিধির কল্যাণে যদি কলাকুশলীদের মধ্যে একটা বিভেদ সৃষ্টি হয়ে যায় তবে আপনি এই ভাঙ্গনকে রক্ষা করতে পারবেন না।

বাংলা ছবির জন্য নায়করাজ রাজ্জাকের যে অবদান তা কোনভাবে অস্বীকার করা যাবে না।পাশাপাশি বর্তমান শাকিব খানের সাথে যে একটা দ্বন্ধময় পরিবেশ তৈরি করে তাকে নিষিদ্ধ করা আবার পুর্নবহাল করা।দর্শকের সাথে বিচ্ছিন্ন একটা প্যানেল যারা কিনা রক্ষক হয়ে প্রকরান্তরে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে।বর্তমানে এই যে কাদা ছোড়াছুড়ি তার জেরে সিনিয়র অনেকে কথা বলছে এটা সার্বিক অর্থে ভাল লক্ষণ।

এই মুহুর্তে সবকিছু ভুলে আমাদের উচিত ইন্ডাস্ট্রির জন্য শাকিব খানকে টিকিয়ে রাখা।শাকিবের সাথে যা হচ্ছে তা প্রকরান্তরে বাংলা ছবির জন্য ক্ষতিই বটে। নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খানের কোন উল্লেখযোগ্য ছবি আছে যার জন্য দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়েছে।তাই ক্ষমতার মোহে স্রোতে গা ভাসালে চলবে না।আপনারা যদি সত্যিকার অর্থে বাংলা ছবির ভাল চান তবে অবশ্যই নিজেরা নিজেদের মধ্যে একটা সমোঝতা করে সুন্দর সমাধানে আসা উচিত।

আমরা এখন ভারতীয় ছবি কেন আসছে,আসতে দিব না যখন দেশীয় অবকাঠামো ভেঙ্গে পড়বে তখন ভারতীয় ছবির আগ্রাসনটা এতই বেড়ে যাবে আপনি আমি ভারতীয় ছবি বের করার উপায় তো পাব না।বরং দর্শক বিমুখ হয়ে পড়ব এমনটাই আশা করা যায়।

শাকিব খানের সাথে পুরো নির্বাচিত প্যানেল বা কতিপয় লোকের যে নীরব যুদ্ধ তাতে শাকিবের নিচে বা ইন্ডাস্ট্রির অন্য নায়করা মুখে কুলুপ এটে বসে আছেন মানে এটা নয় যে আপনি এই বিষয়টা দেখছেন না।আপনি আজ কোন একটা অযাচিত কাছের প্রতিবাদ না করে যে দৃষ্টতা দেখাচ্ছেন পাছে না এটা আপনার জন্য হিতে বিপরীত হয়ে বসে।

পুনশ্চঃ পর্দার মানুষের প্রতি সাধারণ মানুষের একটা আর্কষণ থাকে তাই পর্দার বাইরে বা ভেতরে ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখাটা চ্যালেঞ্জ বটে।

বছর দুয়েক আগে আমরা পত্রিকার সৌজন্য ওমর সানী আর মিশা সওদাগরের বন্ধুত্বের সম্পর্ক জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন দেখেছি।সেখানে উঠে এসেছিল ক্যারিয়ারপ্রথম দিনকার ঘটনাবলী।বছর না ঘুরতে একে অপরের প্রতি কটুক্তি বেমানান।

আমাদের দেশীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির পিছিয়ে যাবার আরো একটা বিশেষ কারণ আমরা একে অপরকে সম্মান করি না বা করতে চাই না।যেটা কিনা অন্য ইন্ডাস্ট্রির লোকেরা মেনে চলে।

যেহেতু আপনারা পর্দায় আছেন লোকে আপনাদের আঁতসী কাঁচ দিয়ে দেখে এটা স্বাভাবিক।

তাই এই অর্ন্তদ্বন্ধ বন্ধ করে দেশের সিনেমা শিল্পকে রক্ষার স্বার্থে শিল্পীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরী।

দি জোয়ান অব্ আর্ক — প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

Now Reading
দি জোয়ান অব্ আর্ক — প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

মানব সভ্যতার ইতিহাস ক্রম পরিবর্তনের ইতিহাস।সামাজিক, রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য আন্দোলন করতে হয়েছে বারবার। এ আন্দোলনে অর্জন যেমন হয়েছে তেমনি ব্যর্থতা ও কম নয় ।এসব সংগ্রামে পুরুষের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে নারীও অংশগ্রহণ করেছিল।

মুক্তি সংগ্রাম শব্দটি ব্যপক অর্থবহ।এক্ষেত্রে মুক্তি সংগ্রাম বলতে আমরা বুঝে নেব বিভিন্নভাবে বন্দীদশা থেকে নারীর মুক্তির সংগ্রাম।পারিবারিক,সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী বঞ্চিত হয়েছে।তাই নারীকেও তার ন্যায্য প্রাপ্তির জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছিল।অনেক মহীয়সী নারীর বীরত্ব ও মহত্ব গাঁথায় আমাদের ইতিহাস উজ্বল হয়ে আছে।সময় এসেছে আজ অতীতের গৌরবের দিকে ফিরে দেখার।আজকের নারী যেন অতীতের মহিমাময় পটভূমিতে নিজেদের আলোকিত ও জাগ্রত করে তুলতে পারেন।দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত দেখিয়ে গেছেন বীরাঙ্গনা অনেক মহীয়সী নারী,তাদের মধ্যে যে মহীয়সী নারী ঐকন্তিক দৃঢ়তায় সংকল্পবদ্ধ হয়ে দেশমাতৃকার জন্য আত্মাহুতি দিয়েছিলেন তিনি চট্টল গৌরব প্রীতিলতা। এই বীরচট্টলা কালের প্রেক্ষিতে সময়ের সাহসী সূর্য্ সন্তানদের বুকে ধারণ করেছে। পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে মুক্তির ইতিহাসে যাঁর নাম চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।তাঁর এ আত্মাহুতি আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণে প্রেরণা জুগিয়েছে এবং অনুপ্রাণিত করছে বর্তমান নারীদেরকেও।

প্রীতিলতার সাহসী কর্মকান্ডের জন্য তাঁকে উপমহাদেশীয় জোয়ান অব্ আর্ক নামে ভূষিত করেন।

জন্ম ও পরিচয়ঃ

প্রীতিলতার জন্ম ১৯১১ সালের ৫ মে।চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে।এখানে জন্ম হয়েছে অসংখ্য বিপ্লবীর।ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে এই গ্রাম ছিল বিপ্লবীদের প্রধান ঘাঁটি।প্রীতিলতার বাবার নাম জগদ্বন্ধু ওয়াদেদ্দার তিনি একজন তৎকারীন সিটি কর্পোরেশনের চাকুরীজীবি ছিলেন।মায়ের নাম ছিল প্রতিভাদেবী ,তিনি গৃহিণী ছিলেন।

শিক্ষাজীবনঃ

প্রীতিলতার শিক্ষাজীবনের সুত্রপাত হয় তৎকালীন সময়ের স্বনামধন্য নারী শিক্ষালয় ড: খাস্তগীর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে।লেখাপড়ায় তিনি মেধাবী ছিলেন তারই স্বীকৃতি স্বরুপ তিনি অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তিলাভ করেন।১৯২৮ সালে কৃতিত্বের সাথে ১ম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করে বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হন ঢাকার ইডেন কলেজে।১৯২৯ সালে ঢাকা ইডেন কলেজ থেকে আই.এ তে মেয়েদের মধ্যে ১ম স্থান লাভ করে বিশ টাকা বৃত্তি পান।ভর্তি হলেন কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন বিষয়ে অর্নাস নিয়ে।প্রীতিলতা বি.এ পরীক্ষায় অংশ নেন এবং ডিস্টিংশন নিয়ে বি.এ পাশ করেন।

বিপ্লবী ও কর্মজীবনঃ

চট্টগ্রামে ফিরে এসে প্রীতিলতা নন্দনকানন স্কুলে(বর্তমান অপর্ণাচরণ স্কুল) এ প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন।

প্রীতিলতার স্বাধীনতাকামী মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়ার সুত্রপাত হই তার আত্মীয় সম্পর্কের এক ভাইয়ের মাধ্যমে,পরে এই বিষয়টা আরো ত্বরাণিত হয় দীপালী সংঘের সংস্পর্শে গিয়ে।তাঁর ব্যাক্তি জীবনে একজন আর্দশ ও অনুপ্রেরণা হিসেবে ছিলেন  “উষা দি “ যার সাথে কলেজে পড়ার সময়ে পরিচয় হয়।

তখন বিপ্লবীদের একমাত্র লক্ষ্য ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করা।মাস্টার‘দা তখন বলেছিলেন — মেয়েদের ছাড়া কোন বিপ্লবের কথা ভাবা যায় না।শত্রুর সাথে লড়াই কঠিন-অনেক রক্তপাত,অস্ত্র সংঘর্ষ এ সবে মেয়েরা আপাততঃ যোগ দেবে না।তবে আগামিতে পারবে।সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া স্বদেশের স্বাধীনতা সুদুরপরাহত সেই আর্দশকে বুকে নিয়ে প্রীতিলতা কলেজে মাস্টারদার নির্দেশে এক বিপ্লবী চক্র গড়ে তুলেন।প্রীতিলতা ও অন্য মেয়েরা বোমার খোল এনে চট্টগ্রামে বিপ্লবীদের হাতে তুলে দিতেন।এটা ছিল তাদের সাংগঠনিক কাজের একটা অংশ।

একটা সময় প্রীতিলতা লক্ষ্য করলেন যে বিপ্লবীরা ধর্মভীরু,দলের প্রতি নিষ্ঠা,আনুগত্য,বিশ্বাস ও ধর্মীয় অনুশাসনেই গঠিত।বাবা মায়ের কাছ থেকে পাওয়া ধর্মশিক্ষা তাকে দেশের জন্য নিঃস্বার্থভাবে আত্মদানকে পবিত্র কর্তব্য বলে ভাবতে শিখিয়েছে।দর্শনের ছাত্রী – যুক্তি ও চিন্তার ব্যাপকতা তাঁর মধ্যে প্রোথিত।

১৯৩০ সাল।

প্রীতিলতা ছাত্রীনিবাসে বসে জানতে পারলেন যে চট্টগ্রামে বিপ্লবীরা অস্ত্রাগার লুন্ঠন,টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন অফিস ধ্বংস ও রির্জাভ পুলিশ লাইন অধিকার করে।এই ঘটনার পর তার মধ্যে আরো উন্মাদনা জাগে বিপ্লবীকাজে সক্রিয় হতে।পরে মাস্টারদার নেতৃত্বে কাজ করার সুযোগ আসল আর দলের প্রয়োজনে কল্পনা দত্তের সাথে তিনি তৈরি করলেন বোমা তৈরীর সরঞ্জাম আর গান কটন।এই কাজে আর্থিক সহায়তার জন্য তিনি নিজের গহনা দিয়ে এবং বাকিদের কাছ থেকে নিয়ে তহবিল যোগাড়ের  কাজ করেন।এই কাজে তিনি মাস্টারদার কাছ থেকে বেশ প্রশংসা পান।যা তাঁকে আরো অনুপ্রাণিত করে তুলেছিল বলা যায়।দীর্ঘদিন ধরে কল্পনা দত্ত আর প্রীতিলতা প্রত্যক্ষভাবে সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার দাবি জানিয়ে আসছিল।অবশেষে বিপ্লবীদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি ধলঘাটের এক গোপন আস্তানায় এক সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয় ।বাড়িটি ছিল সাবিত্রিদেবীর।তবে সেদিন ব্রিটিশ পুলিশের আক্রমণে তারা কোনমতে পালিয়ে বাঁচে আর এই ঘটনায় বিপ্লবী নির্মল সেন আর অপূর্ব সেন নিহত হলেন।

অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ…………

এ সময় প্রীতিলতা আর কল্পনা দত্তের প্রবল আগ্রহের কথা জানতে পেরে মাস্টারদা তাঁদের দুজনকে বিপ্লবীকাজে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন আর আত্মগোপনে থাকার নির্দেশ দিলেন।

১৯২৩ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর রাতে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা নেন এবং দায়িত্ব দেন প্রীতিলতাকে।মুহুর্তের মধ্যেই স্থির করে ফেললেন এ আহবানে তিনি সাড়া দেবেনই।জীবনে হয়তঃ মৃত্যুর যবনিকা পড়বে কিন্তু তিনি ভীত নন।

ঝাঁসির রাণী লক্ষীবাঈ যদি যুদ্ধ করতে পারেন,শত্রুর প্রাণ সংহার করতে পারেন তিনি কেন পারবেন না ? নিশ্চিত মরণ উপেক্ষা করে দেশমাতৃকার পরাধীনতার শৃংঙ্খল মোচনে দৃঢ় সংকল্প প্রীতিলতা।মনে মনে শপথ নিলেন পাহাড়তলী অভিযানে তাঁকে সফল হতেই হবে।প্রীতিলতা উপস্থিত সেনাপতি হিসেবে আর নির্দিষ্ট সংকেত পাওয়ার পর চার্জ বলার সাথে সঙ্গীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল।মুহুর্তের মধ্যে বল নাচের পরিবর্তে ক্লাবটি রুপ নিল বিভীষিকাময় স্থানে।কান্না, চিৎকার আর দৌঁড়ঝাপ সবকিছূ মিলে সেদিনের যুদ্ধে প্রায় পঞ্চাশোর্ধ লোক হতাহত হয়।আক্রমণে নেতা সর্বাগ্রে আর প্রত্যবর্তনে নেতা পিছনে এমনই ছিল রণনীতি।সফল অভিযান শেষে সাথীরা মার্চ করে চলে যাচ্ছে।প্রীতিলতা পেছনে।হঠাৎ একটা গুলি এসে লাগল প্রীতিলতার বুকে,প্রবল রক্তক্ষরণ হচ্ছে,মাটিতে লুটিয়ে পড়ল নিথর দেহ।

ইংরেজ সৈন্যর একটা বেয়নেট এগিয়ে আসতে দেখে তিনি সঙ্গে রাখা পটাশিয়াম সায়ানাইড মুখে দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নিলেন অবলীলায়।দেশের জন্য প্রাণ দিলেন চট্টল রাণী প্রীতিলতা।সৃষ্টি করলেন ইতিহাস।সেই যুগের প্রথম নারী বিপ্লবী শহীদ প্রীতিলতা রেখে গেলেন দেশপ্রেমের আর্দশ,চারিত্রিক দৃঢ়তা।

প্রীতিলতার নিজ হাতে লেখা একটা চিঠি তার মরদেহের সাথে পাওয়া যায় যাতে তিনি লিখেছেন নিজ অভিমত —-

প্রীতিলতার এই অন্তিম চিঠিখানি আমাদের আলোকবর্তিকা।প্রীতিলতার শৌর্য্,সাহস,অম্লান আর্দশনিষ্ঠা আমাদের কাছে এক অমূল্য দৃষ্টান্ত যা আমাদের অন্ধকারে বিদিশিার দিশা হয়ে থাকল।

আজ ভারতবর্ষ নেই,ব্রিটিশ শাসন নেই। স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ যেখানে শত শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জন করা স্বাধীনতার ফলটুকু আত্মসাৎ করছে কিছু মানুষ।ভোগবাদী ব্যবস্থার মূলোৎপাটন আর সামাজিক বিপ্লবের নিমিত্তে দরকার আরো একটা প্রচেষ্টার যেমনটা চেয়েছিল প্রীতিলতাসহ অন্য বিপ্লবীরা।

আজ নারীরা দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে ঘরে বাইরে।ইতিহাসের বীরসেনানী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার হয়তো আজও কোন সংগ্রামী নারীর চিত্তে সদাজাগ্রত আর বলীয়ান হয়ে নারীসত্তাকে করছে বিকশিত আর নারীশক্তির আলোকবর্তিকা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়ে চলছে নিরন্তর।

এই মহীয়সী নারীর জন্য নিরন্তর ভালবাসা আর আকুন্ঠ শ্রদ্ধা রইল ।