প্রকৃতির সাথে মানুষের সংযোগ

Now Reading
প্রকৃতির সাথে মানুষের সংযোগ

সবুজ প্রকৃতিকে আমরা কে না ভালোবাসি? শহুরে জীবন যাপনে আমরা যখন অতিষ্ট হয়ে পড়ি তখন চলে যাই প্রকৃতির কাছে । তাকে দু হাতে একটু খানি আলিঙ্গন করার জন্য ব্যাকুল হয়ে যাই। পরিবেশ মানুষের জীবনী শক্তির প্রধান উৎস। সবুজ নির্মল পরিবেশ আমাদের এক নিমিষেই চাঙ্গা করে দেয়। এই পরিবেশের উপরই নির্ভর করছে আমাদের অস্তিত্ব। পরিবেশ প্রতিকূল হলে আমাদের ধ্বংস ও সর্বনাশ অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু যখন আমরা নিজেরাই এই পরিবেশের ধ্বংস ডেকে নিয়ে আসছি তখন আমাদের নিজেদের কাণ্ডজ্ঞান কত খানি আছে তা বুঝার দরকার। আজ ৫ ই জুন, “বিশ্ব পরিবেশ দিবস” যা আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সারা বছর পরিবেশ দূষণ করে, যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলে, অবিচারে বৃক্ষ নিধন করে এই একটি দিনে আসি পরিবেশের জন্য খুব দয়া দেখাতে। যাই হোক জাতিসংঘ এই দিনকে অর্থাৎ ৫ই জুনকে, ১৯৭২ সালে “বিশ্ব পরিবেশ দিবস” হিসেবে ঘোষণা করেছে।
একসময় মানুষ ধারণা করতো প্রকৃতির ওপর যে কোনো ভাবে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা সবচেয়ে জরুরী। এই আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বন ধ্বংস করে, নদীর প্রবাহ বন্ধ করে, বিভিন্ন জীব জন্তু হত্যা করে , পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে মানুষ পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করেছে, ডেকে এনেছে নিজের বিপদ। পরিবেশের উপর এই মারাত্নক অত্যাচারের কারণে প্রকৃতি আজ আর আমাদের হাতে নেই, তাকে আমাদের বশে আনার আর ক্ষমতা নেই। মানুষকে আজ প্রকৃতির উপর আধিপত্য নয়, গড়ে তুলতে হবে প্রকৃতির সাথে বন্ধুর সম্পর্ক। একারণে এখন আমাদের খুব চিন্তা ভাবনা করে চলতে হবে কিভাবে এই বন্ধুত্ব গড়ে তোলা যায়। অনেক কষ্ট করে তা গড়ে তুলতে হবে কেননা সে এখন আর আমাদের কথা শুনবে না। জাতিসংঘ সবার মাঝে পরিবেশ কে ধ্বংস না করে তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন আন্দোলন করে যাচ্ছে। তারই একটি হচ্ছে এই বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপন। প্রতিবছর এই বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের জন্য তারা একটি স্লোগান তৈরি করে যাকে ঘিরে সেই বারের আন্দোলনটা রূপ পাবে। ২০১৭ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে এবারের স্লোগান “Connect People To Nature” বা “প্রকৃতির সাথে মানুষের সংযোগ” অর্থাৎ আমাদেরকে প্রকৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে যেতে হবে, প্রকৃতিকে ভালবাসতে হবে, ধারণ করতে হবে নিজের সাথে। এই স্লোগানের মাধ্যমে আমাদেরকে প্রকৃতির কাছে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং বৈচিত্র্য গুলো আমাদের চোখের সামনে দেখার কথা বলে হয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘ খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করা এবং উন্নত স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা, বিভিন্ন প্রাকৃতিক উৎস থেকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহর ব্যবস্থা তৈরি করা এবং জলবায়ু স্থিতিশীলতার সুবিশাল সুবিধা গুলো তুলে ধরা সহ বিভিন্ন ধরণের সমস্যা থেকে পরিত্রানের উপায় এই আন্দোলনের মাধ্যমে তুলে ধরে ।pollution-620_620x350_81476701924.jpg

পৃথিবীতে মানুষ টিকে থাকার জন্য কত কি করছে। পৃথিবী ধ্বংস হলে কোথায় থাকবে তার জন্য নতুন বাসস্থান খোঁজার জন্য বিশাল পরিমানে অর্থ খরচ করছে কিন্তু তার খুব সামান্য অংশই ব্যয় করছে পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য তার পরিবেশকে বাঁচানোর জন্য। পৃথিবীতে প্রায় ৮০% মানুষ পরিবেশ দূষণের জন্য মারাত্নক ক্ষতির মুখে পড়ছে। প্রতিবছরে সারা পৃথিবীতে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ফোম কাপ, ২২০ মিলিয়ন টায়ার এবং ১.৮ বিলিয়ন ডায়াপার পুড়ানো হয়। যার কারণে পরিবেশের মারাত্নক ক্ষতি হয়। পৃথিবীতে প্রতিবছর যে মানুষ মারা যায় তার ৬.৭% মানুষ মারা যায় বায়ু দূষণের কারণে। যে বিশাল পরিমাণে বায়ু দূষণ হচ্ছে তার প্রধান কারণ হচ্ছে মানুষের কর্মকান্ড। বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যানবাহন ও কলকারখানা ইটভাটার কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং পেট্রোলিয়াম পুড়ানোর কারণে বায়ু দূষণ হচ্ছে। পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি হচ্ছে। পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মানুষের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পরেছে। পরিবেশ বাদীদের মতে আগামী ৩০ বছরের মধ্যেই তাপমাত্রা প্রায় ৪ ডিগ্রী করে বৃদ্ধি পাবে এর ফলে সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে ঝড় বৃষ্টি, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস সহ বিভিন্ন ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিবে। আগামী ৫০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় দু তৃতীয়াংশ জায়গা পানিতে ডুবে যাবে। হারিয়ে যাবো আমরা। এমনিতেই আমাদের প্রতিবেশী দেশ আমাদের ন্যায্য হিস্যার পানি না দিয়ে আমাদের দেশকে মরুভূমিতে রূপ দিতে বিরাট ভূমিকা রাখছে এভাবে চলতে থাকলে আমাদের কোন থাকার জায়গা থাকবে না। বিলীন হয়ে যাবে আমাদের অস্তিত্ব। এই পরিবেশকে রক্ষা করতে চাইলে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে। এজন্য আমাদেরকে বিভিন্ন কাজ করতে হবে। এই পরিবেশকে রক্ষা করতে হলে আমাদেরকে নিম্নোক্ত উপদেশ গুলো পালন করতে হবে।

  • পৃথিবীতে আমরা প্রতিবছর প্রায় ৮০ ট্রিলিয়ন অ্যালুমিনিয়াম ক্যান বোতল ব্যবহার করি। এসব ক্যান বোতল গুলো আবার রিসাইকেলিং এর মাধ্যমে আবার ব্যবহার করা সম্ভব এইজন্য এর পরের বার আমরা যখন এই অ্যালুমিনিয়াম ক্যান বোতল ব্যবহার করব তখন আমরা তাকে যত্রতত্র ফেলি না দিয়ে রিসাইকেল ডাস্টবিনে তা ফেলি।
  • পৃথিবীতে ব্যবহার যোগ্য পানির পরিমাণ মাত্র ১% আর বাকি ৯৯% পানি লবণাক্ত ও বরফ। আমাদেরকে সবসময় এই পানি অপচয় রোধ করতে হবে। পানির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
  • আমাদেরকে পলিথিন ব্যাগ যথাসম্ভব বর্জন করতে হবে। পলিথিনের কারণে প্রতিবছর প্রায় ১০,০০,০০০ সামুদ্রিক প্রাণী মারা যায়। বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে এই পলিথিনের কারণে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে ।
  • কার্বন নিঃসরণ প্রবাহ কমাতে হবে একারণে আমাদেরকে যথাসম্ভব বাসার ফ্যান লাইট কম পরিমাণে ব্যবহার করতে হবে।
  • বেশি বেশি গাছ লাগানোর চেষ্টা করি আর যদি একটি গাছ লাগাতে নাও পারি অন্তত একটি গাছে পানি দিয়ে সেই গাছের বৃদ্ধি নিশ্চিত করি।
  • যথাসম্ভব গাড়ির ব্যবহার কম যেন কম করি এবং পায়ে হাটার অভ্যাস তৈরি করি।
  • খাবার বেশি নষ্ট না করি কেননা আপনার নষ্ট করা খাবারই হয়ত অন্য কারো খাবার ছিল। যা আপনি নষ্ট করে ফেললেন।
  • পুনরায় ব্যবহার যোগ্য শক্তি বেশি ব্যবহার করতে হবে।tree1.jpg

আমাদেরকে এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে পৃথিবীর সাথে কোমল হতে হবে।যদি পরিবেশ ভালো থাকে তাহলে আমরা ভালো থাকব আর আমরা ভালো থাকার মানেই হল পরিবেশের উপর আধিপত্য থাকা।