বাংলাদেশ পরিচিতি
Now Reading
ঢোপকল – এক হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য
105 15 0

ঢোপকল – এক হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য

by Abdullahil GaleebNovember 13, 2017
What's your reaction?
লাইক ইট!
100%
FUNNY
0%
Sad
0%
Boring
0%

পানির অপর নাম জীবন। পরিষ্কার করে বলতে গেলে বিশুদ্ধ পানির অপর নাম জীবন।  কিন্তু এই পানিই দূষিত হলে তা হয়ে দাঁড়ায় মৃত্যুর কারন। বিশুদ্ধ পানির অভাবে দেখা দিতে পারে নানান রকম রোগ-বালাই। তাই চলুন আজ জেনে আসা যাক শিক্ষানগরী তথা  আম ও রেশমের নগরী রাজশাহীর হারিয়ে যাওয়া এক পানি সরবরাহকারী বন্ধুর গল্প। এ বন্ধুর নাম “ঢোপকল”।

 

পদ্মার কোল ঘেঁষে রাজশাহী অঞ্চল গড়ে উঠেছে। পদ্মার কোল ঘেঁষে গড়ে উঠলেও এখানকার মানুষদের জীবনযাপন সহজ ছিল না। বহুকাল থেকেই জনজীবনে পানি নিয়ে সমস্যা ছিলই। একবার রাজশাহী শহরের পানীয় জল পানের অযোগ্য হয়ে পড়ে। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে আমাশয়-কলেরাসহ পানি-বাহিত নানা রোগ। দিশেহারা হয়ে পড়ে মানবজীবন।

সময়টা ১৯৩৭ সালের মাঝামাঝি। পানির এ সঙ্কট নিরসনে কলকাতার তত্ত্বাবধানে রাজশাহী শহরজুড়ে স্থাপন করা হয় শতাধিক পানির কল। দেখতে অদ্ভুত এ পানির কলগুলোই পরে ‘ঢোপকল’ হিসেবে পরিচিতি পায়। সেই থেকে রাজশাহী-বাসীর সঙ্গে দীর্ঘ  প্রায় ৮০ বছরের সম্পর্ক ঢোপকলগুলোর।

এক একটা ঢোপকল মাটি থেকে প্রায় সাড়ে ১১ ফুট লম্বা। আর এ গম্বুজাকৃতির কলগুলো তৈরি করতে তৎকালে ব্যবহার করা হয়েছিল সাদা সিমেন্ট, তবে সেই সময় একে বিলেতি মাটি বলা হতো। আর পুরো নকশাটা তৈরি হয়েছিল টিনের শিট দিয়ে। প্রথমে টিনের শিটের একটা বলয় তৈরি করা হতো। এর উপর দেওয়া হতো সাদা সিমেন্টের ঢালাই। সহজে যাতে না ভাঙে তাই ঢোপকল তৈরিতে তিন-দফা সিমেন্টের প্রলেপ দেওয়া হতো।

তবে যতোটা সহজ মনে হচ্ছে ততোটা সহজ ছিল না ঢোপকল তৈরির ইতিহাস।

কলকাতার তত্ত্বাবধানে শুরু হলেও একসময় ঢোপকল তৈরি প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।   কলকাতা যে অনুদান ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছিল তা ছিল অপ্রতুল। তাই আর দশটা প্রকল্পের মতই  অর্থসঙ্কটের  কারণে ঢোপকল প্রকল্প ভেস্তে যেতে বসেছিল।

সে সময় নিরুপায় হয়ে অনেকের  কাছে  এ  পানির কল বানানোর জন্য অর্থ সহায়তা চাওয়াও হয়েছিল। নগরের ধনাঢ্য অনেক ব্যক্তির কাছে সহায়তা চাওয়া হলেও তারা কেউ এগিয়ে আসেননি। শুধু  তৎকালীন ধনীদের মধ্যে এগিয়ে আসেন রাজশাহী জেলার পুঠিয়া জমিদার বাড়ির রানী হেমন্ত-কুমারী। তিনি প্রায় ৬৫ হাজার টাকা দান করেন ঢোপকল স্থাপনে। যদিও ধারণা করা হয় পুরো প্রকল্পটি শেষ করতে ব্যয় হয়েছিল পৌনে তিন লাখ টাকা। রানী হেমন্ত কুমারীর প্রতি সম্মান জানাতে তাই ঢোপকল প্রকল্পটির নাম রাখা হয়েছিল “হেমন্ত-কুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস” ।

 

পৌর কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় রাজশাহীর সোনাদিঘি থেকে পাম্পের সাহায্যে পানি সরবরাহ করা হতো এসব ঢোপকলে। প্রথমে মহারাণী হেমন্ত-কুমারী পানি শোধন কেন্দ্রে পানিকে বিভিন্ন ট্রিটমেন্ট করে পানি থেকে আয়রন ও পানির ক্ষারতা দুর করা হতো। তারপর সেটা সরবরাহ করা হতো সেই ঢোপগুলোতে। তবে সর্বপ্রথমে সেটা পাথরকুচির ফিল্টার দিয়ে পানি ফিল্টার করা হতো। এরপর সেটা সিমেন্টের তৈরি মোটা পাইপের সাহায্যে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো। এই ঢোপকলগুলোর প্রতিটির পানি ধারণক্ষমতা ৪৭০ গ্যালন। প্রতিটি ঢোপকলেই ছিল একটি ‘রাফিং ফিল্টার’। এতে বালি ও পাথরের স্তর থাকায় সরবরাহ করা পানি আরও পরিশোধিত হয়ে বের হতো । শুরুর দিনগুলোতে ঢোপকল শুধু বিশুদ্ধ পানিই সরবরাহ করত না, শোনা যায়, ঢোপকল এর পানি যথেষ্ট ঠাণ্ডাও থাকত এর গঠনপ্রণালীর জন্য। তবে   সেই সময় সারাদিনে মাত্র দুই ঘণ্টা পানি সরবরাহ করা হতো। মোড়ে মোড়ে ঢোপকলগুলোতে পানি ধরে রাখা হতো। ফলে সারাদিনই পানি পাওয়া যেত।

প্রায় প্রতি দুই মাস পর পর এই ঢোপকল গুলোকে পরিষ্কার করা হতো। পরিষ্কারের নিয়মটি ছিল খুবই আধুনিক। এই ঢোপকলের উপরের ঢাকনাটি খোলা যেত। তারপর ভিতরে মানুষ নেমে ব্লিচিং পাউডার ও অন্যান্য জিনিস দিয়ে সেটা পরিষ্কার করতো। প্রতি দুই মাস পর পর প্রত্যেকটি ঢোপকল থেকে পানির স্যাম্পল সংগ্রহ করা হতো। পরে সেটা পাঠানো হতো পরীক্ষাগারে পানির মান ঠিক আছে কিনা সেটা দেখার জন্য।(সূত্র উইকিপিডিয়া)

লোকমুখে শোনা যায়, ঢোপকলের পানি শুধু তৃষ্ণাই মেটাতো না অনেক ক্ষেত্রে রোগের দাওয়াই হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। এর মধ্য দিয়ে একটা জিনিস পরিষ্কার যে, ঢোপকল থেকে একই সঙ্গে স্বচ্ছ ও বিশুদ্ধ পানি পাওয়া যেতো।

 

কিন্তু সেদিনের সেই কষ্টার্জিত ঢোপকল আজ অবহেলিত। শহরের শতাধিক ঢোপকলের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি বর্তমানে সচল আছে। অচল ঢোপকলগুলো দিয়ে পানি বেরুলেও তা আর বিশুদ্ধ নেই। কোথাও-বা ঢোপকল ভেঙে গড়ে তোলা হয়েছে বসতভিটা। বেশ কিছু ঢোপকল  ভেঙে ফেলা হয়েছে রাস্তা সম্প্রসারণে, ফুটপাতের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে। বেশ কিছু ঢোপকলে ওয়াসা থেকেই পানির সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ হিসেবে তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, এসব ঢোপকল থেকে তারা কোনো রাজস্ব পান না, বিধায় এগুলো চালু রাখা তাদের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ভাবে অলাভজনক। রাজশাহী-বাসীর বিভিন্ন সময়ের দাবির কারণে ইদানীং কয়েকটি ঢোপকল বরেন্দ্র যাদুঘরে স্থান পেয়েছে। এছাড়া নগরীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়েও স্থাপিত হয়েছে ঢোপকল।

 

ঐতিহ্যের নগরী রাজশাহীতে ইদানীংকালে আধুনিকতার জোয়ার এসেছে। নগরের পুরনো দালান-কোঠা ভেঙে এখানে ওখানে মাথা উঁচু করছে নতুন নতুন দালান। তৈরি হচ্ছে যানজট, বাড়ছে যান্ত্রিকতা। এই যান্ত্রিকতার সময়ে কালের আঘাত এড়িয়ে ঢোপকলগুলো কতদিন টিকে থাকবে তা হয়ত সময়ই বলে দিবে। তবে  ইতিহাস সংরক্ষণে ঢোপকলের বিলুপ্তি যে আমাদের উদাসীনতার এটিও এক দৃষ্টান্ত সেটি নিঃসন্দেহে বলাই যায়।

About The Author
Abdullahil Galeeb
Abdullahil Galeeb

You must log in to post a comment