সাহিত্য কথা
Now Reading
আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ২য় পর্ব
4335 827 0

আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ২য় পর্ব

by Rihanoor Islam ProtikJuly 26, 2017
What's your reaction?
লাইক ইট!
100%
FUNNY
0%
Sad
0%
Boring
0%

সেদিন আন্টির কন্ঠে এমন কি ছিল আমি আর না করতে পারিনি। পরেরদিনই গিয়েছিলাম তাদের বাসায়। তবে এমন সময় গিয়েছিলাম যখন তার আর তার বাবার বাসায় থাকার কথা না। কিন্তু গিয়ে দেখি সে নেই ঠিকই কিন্তু তার বাবা ছিল। আমাকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসানো হলো এবং কিছুক্ষণ পর তার বাবা-মা দুজনই আসলো। আমি দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম। সালামের জবাব দিয়ে আন্টি আমাকে বসতে বললো। তারপর কুশল বিনিময় শেষে আমাকে বলতে শুরু করলো, ‘দেখো বাবা তোমাকে আজ মূলত যা বলতে যাচ্ছি তা তুমি কিভাবে নিবে জানি না কিন্তু আমাদের বলতেই হবে।’
‘আন্টি আপনি নিঃসংকোচে বলুন, আমি কিছু মনে করবো না। আপনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।’
‘সেদিন তোমার পড়ানো বাদ দেওয়ার ব্যাপারটা যেকোন অজুহাতেই আমাদের মেয়েকে বলার পর থেকেই ও কেমন যেন হয়ে যায়। বুঝতে পারছিলাম ও নিজেও তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে গিয়েছিল এবং বাদ দেওয়ায় প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে আমাদের কাউকে কিছু বলেনি আমরাও ভেবেছিলাম কিছুদিন বাদে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দিন দিন ওর শরীর-স্বাস্থ্য খারাপ হতে থাকে। পড়াশোনায় অমনযোগী হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে একটা মারাত্মক খারাপ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছিল ব্যাপারটা। ডাক্তার দেখিয়েছি কয়েকবার লাভ হয়নি। পড়ে বুঝতে পারলাম তোমার সঙ্গ না পেলে ভালো হবে না। এদিকে তুমি ওকে পড়াবে না বলে আমার কাছে হাতজোড় করে অনুমতি নিয়েই গিয়েছ সুতরাং তোমাকে পুনরায় পড়াতে বলার মুখও আমাদের নেই। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে দেখলাম একমাত্র বিয়ে ছাড়া তোমাদের একসাথে রাখার কোনো উপায় নেই। তাই আমরা ভাবছি তোমাদের দুজনের বিয়ে দেওয়ার। তুমি হয়তো এখন ভাবছো কেবল ওকে ভালো রাখার জন্যই তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাচ্ছি। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। তুমি যেদিন আমাকে তাকে আর না পড়ানোর ব্যাপারে বলেছিলে সেদিনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম খোদা চাহেতো তোমার সাথেই ওকে বিয়ে দিব। হয়তো সেটা অনেক দেরী হতো কিন্তু এখন ওর শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে এখনই করার কথা ভাবতে হচ্ছে। তোমাকে বিয়ে করতে রাজী কিনা জিজ্ঞেস করায় ও যদিও কিছু বলেনি কিন্তু ওর মুখের ঐ মুহূর্তের অবয়ব দেখে আমার বুঝতে অসুবিধা হয়নি ও এতে কতটা খুশি হবে। ওর মৌন সম্মতি পেয়ে তোমার আঙ্কেল তোমার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছে। এরমধ্যে তোমাদের গ্রামের বাড়িতেও গিয়েছিল তোমার আঙ্কেল বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। তোমার পরিবার প্রথমে এতো তাড়াতাড়িই তোমার বিয়ে দিতে অসম্মতি জানালেও সবকিছুর বিবেচনায় পরবর্তীতে রাজী হয়েছে। গত পরশু তোমার বাড়ি থেকে তোমার মা সহ আরো কয়েকজন এসে আমার ওকে দেখেও গেছে। সবাই পছন্দ করেছে এবং চূড়ান্ত ও পূর্ণ সম্মতিও দিয়েছে। আমাদের অনুরোধেই তারা এই বিশাল ব্যাপারটি গোপনেও রেখেছে তোমার কাছে। তোমাকে জানানো এবং বিয়ের ব্যাপারে সম্মতি নেওয়ার দায়িত্বও আমাদের উপরে দিয়েছে। এখন বলো বাবা তোমার এ ব্যাপারে মতামত কী।’

আমি এতসব কথা শুনে একেবারে ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম। বারবার মনে হচ্ছিল আমি এমন কী পুণ্য করেছি যেজন্য খোদা আমাকে আমার স্বপ্নের মানুষকে এভাবে আমার হাতে তুলে দিতে চাচ্ছে। তবে আমি সেদিন আমার মতামত জানাইনি। আমার পরিবারের সবাই সত্যিই মন থেকে রাজী হয়েছে কিনা না জেনে আমি কোনভাবেই আমার সম্মতি জানাতে পারি না। একদিনের জন্য সময় নিয়ে সেদিন চলে এসেছিলাম। বাসায় এসে রাতে মাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম তারা সবাই সত্যিই মন থেকে রাজী কিনা। মার কথা শুনে বুঝেছিলাম তারা সবাই অনেক খুশি মনেই রাজি। তার পরেরদিন আন্টিকে ফোন করে আমার নিজের সম্মতির কথাও জানিয়েছিলাম। এর সপ্তাহখানেকের মাঝেই আমাদের বিয়েটা হয়ে গিয়েছিল। আমার ইচ্ছাতেই কোনো অনুষ্ঠান করা হয়নি। আমি চেয়েছি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ওর ভালোভাবে ভরণ-পোষণ করার মত অবস্থায় পৌঁছে নিজের টাকাতে বড় করে একটা জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করে ওকে তুলে নিব। তবে আমাদের বাসরঘরটা অনেক জাকজমক করে সাজানো হয়েছিল ওদের বাড়িতেই, ওটা নাকি ওর ইচ্ছা ছিল। বাসরঘরের রাতটা নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। আমি যখন রাত বারোটার দিকে বাসর ঘরে ঢুকি তখন দেখি ও ইয়া বড় ঘোমটা তুলে বসে আছে। আমাকে ঢুকতে দেখেই অতি মিষ্টি লজ্জামিশ্রিত কণ্ঠে সালাম দিয়েছিল। আমি সালামের জবাব দিয়ে ওর পাশে গিয়ে বসে ঘোমটা তুলতেই ও আমার বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। আমি ওর পিঠে হাত রেখে বলি, ‘আজকের এই মধুর আনন্দের দিনে কেন কাঁদছো জানি না। তবে এই তোমার শেষ কাঁদা, যত ইচ্ছা কেঁদে নাও, আর কখনো কাঁদতে দেবো না তোমায়।’
ও অনুযোগের সুরে বলতে থাকে, ‘ওভাবে হঠাৎ করে পড়ানো বাদ না দিলে হতো না? কী এমন তোমার পড়ার চাপ বেড়ে গিয়েছিল যে ওভাবে হঠাৎ করে বাদ দিতে হয়? একটুও খারাপ লাগেনি বুঝি?’
‘খারাপ লেগেছে কি লাগেনি তা যদি জানতে তবে এ কথা কখনো বলতে না। আমি আসলে তোমার প্রতি অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে কষ্ট হচ্ছিল। তাই বাধ্য হয়েছিলাম তোমার কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে। তবে কথা দিচ্ছি আর কখনো তোমার থেকে দূরে থাকবো না। আজ থেকে আমি তোমার সবসময়ের জন্য প্রাইভেট টিউটর হয়ে গেলাম প্রিয় ইরিনা।’

এরপর থেকে আমি যে তাকে কত পড়িয়েছি! আর সে যে কত রকমের পড়া হিসাব নেই! বইয়ের পড়া, তার থেকেও বেশি ভালোবাসার পড়া; আদরের পড়া, টক-মিষ্টি-ঝালঝাল পড়া। মাঝে মাঝে মান-অভিমানের পড়াও পড়াতাম। সব মিলিয়ে মারাত্মক সুন্দর ভালোবাসাময় দিন অতিবাহিত করছিলাম আমরা। ওর বাবা-মা আমাকে ওদের বাসাতেই থাকতে বলেছিল কিন্তু আমি তাতে রাজি হয়নি। ঘর জামাই হয়ে আমার পক্ষে থাকা সম্ভব না। আমি আমার আগের মত মেসেই থেকেছি। তবে প্রতিদিন ওকে পড়াতে যেতাম। পড়ানোর সময় আদর, ভালোবাসা, খুনসুটি সবই হতো। আর ওর অনেক অনুরোধে সপ্তাহে একদিন থেকে যেতাম ওদের বাসায়। মাঝেমাঝে বের হতাম ওকে নিয়ে, হারিয়ে যেতাম দূর দিগন্তে। হানিমুনও করে ফেলেছিলাম এর মাঝে। গিয়েছিলাম সপ্তাহখানেকের জন্য কক্সবাজার। প্রতিদিন একসাথে সমুদ্রের জলে গোসল করেছি, একসাথে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখেছি। সেসব কেবলই আজ স্মৃতি। আজ এতদিন পর মনে হওয়াতেও চোখ ভিজে যাচ্ছে। কোনভাবেই মেনে নিতে পারছি না। কথায় আছে, সুখ বেশিদিন সয় না। কথাটা যে কতটা সত্যি তা হারে হারে টের পাচ্ছি।

যথারীতি আমার গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হয়ে যায়। কয়েকমাসের ব্যবধানে ভালো একটা চাকরীও জুটে যায়। চাকরীর পাশাপাশি পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশনটাও কমপ্লিট করি। এরপর অনেক ভালো একটা মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানি থেকে উচ্চ পদস্থ একটা চাকরীর সুযোগও আসে। দেরি না করে সেটাও লুফে নিই। ইতোমধ্যে নিজে একটা ভালো ফ্লাট বাসাতেও থাকা শুরু করেছি, ইরিনাকেও এনেছি। ও নিজেও এখন গ্র্যাজুয়েশন করছে, ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের উপর। ওর আর এক বছর আছে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করতে। চিন্তা করছি ওর গ্রাজুয়েশনটা কমপ্লিট হলেই একটা জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করে পূর্ণ মর্যাদায় ওকে আমাদের বাড়ির বউ করে নিয়ে যাবো। হলোও তাই। আত্মীয় স্বজন সবাই এসেছিল। প্রত্যেকেই অনেক খুশি। পুরোদমে আমাদের সাংসারিক জীবন শুরু হয়ে যায়। এরই এক বছরের মধ্যে আমাদের একটি মেয়েও হয়। নাম রাখি তিয়াশা। যদিও ওর ইচ্ছা ছিল ছেলে কিন্তু আমি মনে মনে মেয়েই চেয়েছিলাম। খোদা আমার ইচ্ছাই পূরণ করেছিলেন। দেখতে দেখতে আমাদের তিয়াশা মার দুই বছর হয়ে যায়। এরমধ্যে সবকিছু ভালোই চলেছে। সুখের কোনো ঘাটতি ছিল না। একবার রোজার ঈদের কিছুদিন আগে বাবা-মা সহ পুরো পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে যাই ঈদ করতে। বলে রাখা ভালো আমি ইতোমধ্যে আমার বাবা-মাকে ঢাকায় আমার নতুন কেনা ফ্লাটে পাকাপাকিভাবে নিয়ে এসেছিলাম। সবাই মিলে খুব আনন্দেই দিন কাটছিল আমাদের। মা-বাবাও তাদের নাতনীকে সারাক্ষণ কাছাকাছি পাওয়ার সুযোগ পেয়ে অনেক খুশিই ছিল। তো যথারীতি ঈদের কয়েকদিন আগে একদিন সকাল বেলায় ইরিনা তিয়াশাকে নিয়ে বাইরে হাটতে বের হয়। আমাকেও বলেছিল কিন্তু আমার চোখে অনেক ঘুম থাকায় আর বের হয়নি। ওর আগে থেকেই সকালে হাটাহাটির অভ্যাস ছিল তাই সেদিনও বেরিয়েছিল। ইতোমধ্যে আমাদের তিয়াশা মা ভালোই হাটতে ও দৌড়াতে শিখেছে। তো তারা হাটতে বের হওয়ার পর হঠাৎ ঠিক কিভাবে কী হয়েছিল আজও জানি না, কিন্তু বাইরে কিছুটা দূর থেকে প্রচন্ড একটা চিৎকার শুনি। দ্রুত উঠে দৌড়ে গিয়ে যা দেখি তা আজও আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং মধুর একটা দৃশ্য হয়ে রয়েছে।

আগের পর্ব: আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ১ম পর্ব

[আগামী পর্বটি হতে যাচ্ছে ৩য় এবং শেষ পর্ব। আজকের পর্বটি কেমন লেগেছে জানি না, তবে এটুকু আশা করতে পারি আগামী পর্বটি অনেক চমক, উত্তেজনা ও ভালোলাগায় ভরপুর থাকবে।]

রেটিং
পাঠকের রেটিং
Rate Here
পোস্টের টাইটেলের সাথে মুল লেখার মিল
79%
পোস্টের ছবি কতটা সামঞ্জস্য পূর্ন
100%
লেখনীটা কেমন?
73%
পোস্টটি পড়ে আপনি কতটুকু স্যাটিসফায়েড?
67%
80%
পাঠকের রেটিং
3 ratings
You have rated this
About The Author
Rihanoor Islam Protik
Rihanoor Islam Protik

আমি একজন প্রযুক্তি প্রেমী মানুষ। প্রযুক্তি নিয়ে পড়ে থাকতেই বেশি ভালো লাগে। তবে লেখালেখিটা শখের বশে করি। আশ্চর্যের বিষয় হলো লিখতে গিয়ে আমি সকল কষ্ট ভুলে থাকতে পারি।

You must log in to post a comment