সাহিত্য কথা
Now Reading
পুরানো তিমির [১৪তম পর্ব]
125 25 0

পুরানো তিমির [১৪তম পর্ব]

by Ikram JahirNovember 10, 2017
What's your reaction?
লাইক ইট!
0%
FUNNY
0%
Sad
0%
Boring
0%

কিছুদিনের মধ্যেই মা সুস্থ হলেন।তবে নতুন একটা সমস্যা নিয়েই তিনি সুস্থ হলেন।বাবার সাথে মা আলাপ করার সময় আমি শুনেছি,উনারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন,এবার বাড়ি গিয়ে আশার বাড়িতে পরিবারের কাছে আনুষ্ঠানিক বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবেন তাঁরা।সামাজিক নিয়মে অন্য আট-দশটা বিয়ে যেমন হয়,এটাও ঠিক সেই ভাবেই হবে।প্রথমে প্রস্তাব পাঠান হবে,তারপর দুই পক্ষ একে অপরের খোঁজ খবর নিবে,সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে দিনক্ষণ ঠিক করে আমরা একদিন মেয়ে দেখতে যাব।সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও উপস্থিত থাকবেন।মেয়ে পছন্দ হলে হয়ত সেদিনই বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে যাবে।

 

আমি এই নিয়ে বিশেষ একটা চিন্তিত নই।যা হবার হবে।আমি এক প্রকার মায়ের দিকে তাকিয়ে বিয়েতে রাজিই হয়ে গেছি।মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম,মা বাবা,শেফা সবার কাছেই যখন মেয়েটাকে খুব ভালো লেগেছে,মেয়েটা নিশ্চয় খুব বেশি খারাপ হবে না।যে মা পঁচিশটা বছর কষ্টে লালন করেছন,যে বাবা মাথার উপর ছায়ার মত সন্তান কে আগলে রেখেছেন,তাদের জন্য সন্তান হিসেবে এইটুক বিসর্জন দিতে পারব না___ এমনটা হতে পারে না।মনে হয়ত একটু আক্ষেপ থেকেই যাবে।কুমারী মেয়ে বিয়ে করতে সব পুরুষই চাই।এটা দোষের কিছু না।আমিও বা তার ব্যতিক্রম হব কেন?

থাক,ইচ্ছাটা না হয় পরিবারের সুখের দিকে তাকিয়ে পূরণ নাই বা হল।মন্দ কি! পৃথিবীতে সব ইচ্ছা পূরণ হতে হবে এমন তো কোন কথা নেই।কিছু ইচ্ছা অপূর্ণ থাকাই ভালো।সবকিছু পেয়ে গেলে মানুষ বাঁচার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।ভাবে,সব তো পেয়েই গেলাম,জীবন পরিপূর্ণ।আর যখন আমাদের তৃপ্তি মিটে যাবে,তখন পৃথিবীর প্রতি আমাদের টান কমে যাবে,মায়া কমে যাবে।

 

পরদিন সকালে মাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে আনলাম।বাসায় নিয়ে এসে মাকে বললাম,”কিছুদিন আমার কাছে থেকে যাও মা।“

তিনি বললেন,”না থাকতে পারব না।অনেক কাজ আছে।“

 

আমি আর জোর করি নি।জানি,জোর করে মাকে রাখা যাবে না।একবার যখন মুখ খুলে বলেছেন থাকবেন না তখন হাজার চেষ্টা করেও রাখা যাবে না।বৃদ্ধ হতে হতে মানুষ শিশুদের মত অবুঝ হয়ে যায়।মনের ভিতর কেমন একটা গোঁ ধরা ভাব থাকে।

বিকেলের ট্রেনে বাবা মা,শেফা সবাইকে উঠিয়ে দিলাম।

গভীর সন্তর্পনে সযত্নে লালন করা এই জীবন যেন ট্রেনের মত অবিরাম ছুটে চলছে।চলতে চলতে একদিন সমাপ্তিতে পৌঁছাবে।সমাপ্তির শেষ বিন্দুকে মানুষ আদর করে ডাকে মৃত্যু।

চলন্ত ট্রেনের দিকে তাকিয়ে থেকে এক মুহূর্তের জন্যে ভাবনায় ডুবে গেলাম।

 

তারপর কয়েক সপ্তাহ বেশ ভালোই কেটেছে।মা সুস্থ আছেন।আমিও নিয়মিত অফিস করছি।মাথাটা কেমন যেন ঝামেলা মুক্ত হালকা মনে হচ্ছে।তারপর একদিন,মেঘলা আকাশ,বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে।দুপুরের দিকে অসময়ের বৃষ্টির মত শেফাও অসময়ে ফোন করে জানালো অফিস থেকে এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে বাড়ি যেতে।আমরা মেয়ে দেখতে যাব।মেয়ে দেখার দিন তারিখ ঠিক হবে আজ রাতে।

আমি বেশ চমকে উঠলাম।কখন প্রস্তাব পাঠান হল আর কখন সবকিছু এতদূর এগুলো কিছুই টের পাই নি।এর মধ্যে না কি মেয়ের ভাই আমাকে এসে তিনবার দেখে গেছে।একবার নাকি আমার সাথে অপরিচিত লোক বেশে কথাও বলেছে।কিছুই ধরতে পারলাম না।নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগছে।

 

ঐদিন রাতে আশা আমাকে আবার মেসেজ দিল।আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে মেসেজটা পড়লাম,

“আপনি বলেছেন আপনার পরিবার থেকে সরে আসতে,আমি সরে এসেছি।কিন্তু আপনারা এসব কি শুরু করেছেন?”

আমি ফিরতি একটা মেসেজ পাঠালাম,”আপনি তো জানেন মা আমার কথা শুনবেন না।এখানে আমার কিছু করার নেই।আমাকে যদি আপনার পছন্দ না হয় তাহলে আপনি আপনার পরিবারকে বলতে পারেন।তখন উনারাই বিয়ে থামানোর ব্যবস্থা করবেন।“

কিছুক্ষণ পর আবার মেসেজ আসলো,”দেখুন এটা আমার দ্বিতীয় বিয়ে।এখানে আমার মতামতকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে না।“

এভাবে আমাদের মধ্যে মেসেজ আদান প্রদান চলছে,

“আপনি আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন না কেন?”

“সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।দয়া করে আমাকে দেখতে আসবেন না প্লিজ।সহ্য করতে পারবেন না।তখন নিজেই বিয়ের জন্য জোর করবেন।“

“নিজেকে খুব রূপবতী মনে করেন আপনি।আপনার ধারনা আপনার চেয়ে সুন্দর মেয়ে পৃথিবীতে আর নেই।সব পুরুষ আপনার জন্যে পাগল হয়ে থাকে।হয়ত আপনি খুব সুন্দরী নারী।তবে এতটা অহংকারও ভালো নয়।“

“অহংকার করছি না।আপনি বিষয়টা বুঝতে পারছেন না।একটা অপ্রত্যাশিত কিছু অপেক্ষা করছে আপনার জন্যে।“

“বেশ তো,দেখি না সেই প্রত্যাশিত বিষয়টা কি।“

“আপনি তাহলে দেখতে আসবেন?কিছুদিন আগে আপনিই আমাকে নিষেধ করেছিলেন,বলেছিলেন আমার প্রতি আপনার কোন ইন্টারেস্ট নেই।“

“দেখুন আমি আপনাকে নিয়ে খুব একটা ভাবি নি।এখনও যে খুব বেশি ভাবছি এমনও না।আমার মায়ের জন্যে ভাবতে বাধ্য হচ্ছি।আপনি জানেন মা আপনাকে খুবই ভালোবাসেন।অনেক পছন্দ করেন।“

“বাহ…ধারুণ! শুধু মার মন রক্ষা করতে গিয়ে একটা মেয়েকে বিয়ে করে তার লাইফটা এভাবে নষ্ট করে দিবেন?”

“আরে আশ্চর্য! লাইফ নষ্ট হবে কেন?”

“হবে না? নিজ থেকে পছন্দ করে বিয়ে করলে একটা মেয়েকে আপনি যতটুকু ভালোবাসতে পারতেন,শুধুমাত্র মায়ের মন বাঁচাতে বিয়ে করলে অতটুকু ভালোবাসতে পারবেন? একটা মেয়ে কত স্বপ্ন নিয়ে স্বমীর ঘরে পা রাখে আপনি জানেন? মেয়ে হলে বুঝতেন।“

 

আমি কোণঠাসা হয়ে গেলাম।এরপর কি উত্তর দিব ভাবতে পারছি না।মেয়েটার কঠিন যুক্তির কাছে আমি পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য।শুধুমাত্র মায়ের মন বাঁচাতে একটা মেয়েকে বিয়ে করলাম,পরে দেখলাম দুজনের মনের মিল নেই।তখন কি আমরা সুখি হতে পারব?আমি না হয় নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিব যে____ মেয়েটাকে বিয়ে করাতে অন্তত আমার মা ভালো আছেন।এই ভেবে হয়ত আমি নিজ মনে তৃপ্ত থাকব।কিন্তু ঐ মেয়েটা? সে তখন নিজেকে কি বলে সান্ত্বনা দিবে?

 

আমি দোটানায় পড়ে গেলাম।উভয় সংকট,কি করব বুঝতে পারছি না।বিয়েটা কি করা উচিৎ হবে? সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।একদিকে মা,অন্যদিকে নিজ দাম্পত্য জীবনের ভবিষ্যৎ।

About The Author
Ikram Jahir
Ikram Jahir

You must log in to post a comment