সাহিত্য কথা
Now Reading
পথের শেষে [১ম পর্ব]
60 8 0

পথের শেষে [১ম পর্ব]

by Ikram JahirNovember 20, 2017
What's your reaction?
লাইক ইট!
0%
FUNNY
0%
Sad
0%
Boring
0%

সন্ধ্যার একটু পর তারা মেসে ফিরে এলো।সবাই বেশ ক্লান্ত।রিকা হাতের ব্যাগটা টেবিলের উপর রেখে টয়লেটের দিকে গেল ফ্রেস হতে।

“রোজ রোজ এই একি ঝামেলা আর সহ্য হয় না…”, বিড়বিড় করতে করতে ফিরে এল সে।তার ভুরু জোড়া বিরক্তি আর বিষন্নতায় কুঁচকে আছে।সবাই একবার তার দিকে মুখ ফিরিয়ে চাইলো।তারপর আবার যে যার মত কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।এই সমস্যাটা তাদের নিত্যদিনের একটা অংশ হয়ে গেছে এখন।টয়লেটে পানি নেই।রোজ সন্ধ্যা হলেই পানি থাকে না।সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত পানির লাইন বন্ধ থাকবে।এটা একটা অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে।আজ সকালে সবাই ঘুরতে বেরিয়েছিল একসাথে বেঁধে।সারাদিন বাসায় কেউ ছিল না বলে বালতিতে পানি জমিয়ে রাখতে পারে নি।

ক্লান্ত, বিমর্ষ মুখে সবাই বসে আছে।সারাদিনে কত জায়গায় ঘুরেছে তারা।ধানমন্ডি লেক,চন্দ্রিমা উদ্যান তারপর একসাথে খাওয়া দাওয়া আরও কত কি! একঝাঁক তরুণী রাস্তা দিয়ে দল বেঁধে হাঁটছে,হাসাহাসি আর দুষ্টামি হৈ চৈ করছে,চারদিকের মানুষ শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল।

সারাদিন হেঁটে পায়ে ব্যথা শুরু হয়েছে খুব।নেতিয়ে পড়েছে পুরো শরীর।এমন ক্লান্ত মুহূর্তে কারও মুখ দিয়ে কোন কথা বেরুচ্ছে না।অথচ সারাদিন সবাই বাচালের মত কি বকবক করেছে! এখন সবাই মুখ ঘোমরা করে বসে আছে বোবা মানুষের মত।কপালে চিন্তার ছাপ।অপেক্ষা শুধু একটা মুহূর্তের।কখন পানি আসবে,আর তারা একটু পরিচ্ছন্ন হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে শুবে।সমস্ত শরীরে ধুলাবালি গিজগিজ করছে।

দেখতে দেখতে আধঘণ্টার মত পার হল।এখনো পানি আসছে না।রিকা উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের উড়নাটা ঠিক করে নিল।চুল গুলো বেঁধে মাথায় ঘোমটা টেনে দিল একটা।পাশ থেকে রিমা প্রশ্ন করলো,”কোথায় যাচ্ছিস?”

বাড়িওয়ালার বাসায়।

কেন?

আর কতক্ষণ এভাবে বসে থাকব?পানির লাইনটা ছাড়ছে না কেন জিজ্ঞেস করে আসি।

আমি ফোন করেছিলাম তো।তিনি বলেছেন কিছুক্ষণের মধ্যেই লাইন ছেড়ে দিবেন।

আর কতক্ষণ গেলে সেই কিছুক্ষণ পূর্ণ হবে শুনি!

রিকা প্রচন্ড রেগে গেল।রাগে তার শরীর কাঁপছে।ফেমিলি ফ্ল্যাট গুলোতে পানির কোন সমস্যা হয় না, মেসে কেন হবে?বাড়ির মালিকদের কি বিশ্রী ধারণা_____ মেস গুলোতে পানির অপচয় বেশি হয়।

 

দাঁড়া আরেকবার ফোন করে দেখি।

কথা শেষ করে রিমা টেবিলের উপর থেকে মোবাইলটা হাতে নিল।রিকা বলল, ”থাক, দরকার নেই।আমি যাচ্ছি।এভাবে মোবাইলে কথা বললে উনারা আরও একঘণ্টায়ও পানি ছাড়বেন না।ঠিকি রাত আটটা পর্যন্ত আটকে রাখবেন।“

রিমা বলল, ”তুই এখন এই ক্লান্ত শরীরে ছয়তলা থেকে আবার দোতলায় নামবি?”

এ ছাড়া আর উপায় কি?তোরা কেউ যাবি আমার সাথে?

প্রশ্ন শেষ করে রিকা সবার দিকে চোখ ঘুরিয়ে তাকালো একবার।মেয়েরা একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে।কেউ কিছু বলছে না দেখে রিকা একাই দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লো।বাড়িওয়ালার বড় ছেলেটার চোখ ভালো না।মেয়েদের দিকে বিশ্রী চোখে তাকিয়ে থাকে।এলাকার মাস্তান টাইপের আজেবাজে ছেলেদের সাথে তার সারাদিন আড্ডা।কানে দুল পড়ে,দাঁড়ি চুলে কুরুচিপূর্ণ স্টাইলে চেহারাটা কেমন জঘন্য করে রেখেছে।দেখলেই ঘেন্না লাগে।

মেয়েরা কেউ ছেলেটার সামনে পড়তে চায় না।তবু কোথাও কিছু হয়েছে কি না, দেয়ালের রঙ, পানির লাইন, গ্যাসের পাইপ সবকিছু দেখার নাম করে কিছুদিন পর পর মেয়েদের মেসে চলে আসে ছেলেটা।খামোখা এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করে অনেকক্ষণ থাকে এখানে।বারান্দায়, আনলায় ঝুলিয়ে রাখা মেয়েদের কাপড়, অন্তর্বাস ও অন্যান্য মেয়েলি জিনিষ এসবের দিকে কানা চোখে তাকায়।এ বাসায় সব ফ্ল্যাটে ফ্যামিলি থাকে।শুধু সবার উপরে ছয়তলায় মেয়েদের একটা মাত্র মেস।মেয়েরা অন্যান্য ফ্ল্যাটে খোঁজ নিয়েছিল,বাড়িওয়ালার ছেলে কিছুদিন পর পর এমন তদারকি করতে আসে কি না।সবাই জানালো,কিছুদিন পর পর তো দূরের কথা, এখন পর্যন্ত একবারও আসে নি।

রিকা একদিন ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ”আপনি তো সব ফ্ল্যাটে গিয়ে এমন তদারকি করেন না।আমাদের এখানে কেন করেন?”

ছেলেটা দুইগাল চওড়া করে বিশ্রী একটা হাসি দিয়ে বলল, ”আপনাদের প্রতি আমার আলাদা মহব্বত আছে।পিতামাতা বাড়িঘর সবকিছু ছেড়ে এখানে এসে পড়ালেখা করছেন, দেখা শুনার কেউ নাই, অভিভাবক নাই, তাই আপনাদের সুবিধা অসুবিধা, হালচাল দেখা আমার দায়িত্ব মনে করি।“

রিমা বলল, ”আপনার দায়িত্বে আমরা সন্তুষ্ট।অনেক খুশি হয়েছি আপনার আন্তরিকতা দেখে।আপনাকে আর কষ্ট করে আসতে হবে না।আমাদের কোন সমস্যা হলে আমরাই আপনাকে জানাব।“

তারপরও ছেলেটার আসা যাওয়া কমে না।মেয়েরা ভদ্রভাবে অনেকবার বলেছে।লাভ হয় নি।বাড়িওয়ালার কাছেও বলেছিল।তাও কাজ হল না।দ্বিতীয়বার বাড়িওয়ালাকে বলার পর বাড়িওয়ালা বলল, ”সে তো আর তোমাদের কোন ক্ষতি করছে না।বাড়ির মালিক হিসেবে ঘরের সবকিছু ঠিক আছে কি না সেটা দেখার অধিকার ওর আছে।তোমরা যদি বল যে তোমাদের সাথে সে বাজে আচরণ করে, অসভ্যতামো করে তাহলে না হয় একটা কথা ছিল।“

মেয়েরা কিছু বলতে পারলো না।খারাপ কোন আচরণের প্রমাণ তাদের হাতে নেই।তারা ভেবেছিল একবার বলবে, “আপনার ছেলের নজর খারাপ।“

পরে কি ভেবে আর কথাটা বলে নি।এটা বলার মত কোন কথাও না।এ কথা বললে বাড়িওয়ালা বলবে, “আমার ছেলে এমন না।তোমাদের চিন্তা ভাবনায় সমস্যা আছে।মন খামোখা খুঁতখুঁত করছে।অশ্লীল চিন্তা।“

প্রমাণ ছাড়া সব নালিশ ভিত্তিহীন।মেয়েরা জানে, বাড়িওয়ালা ঠিকি তার ছেলেকে নিষেধ করেছিল, কিন্তু সে শুনে নি।তাই এখন বাড়িওয়ালা নিজের দায় বাঁচাতে কথা ঘুরাচ্ছে।

 

সিঁড়ি বেয়ে রিকা নেমে আসলো দোতলায়।স্থির হয়ে দাঁড়ালো বাড়িওয়ালার দরজার সামনে।কলিং বেলে চাপ দিল দুইবার___ ঢং ঢং করে ঘণ্টার মত বেজে উঠলো সেটা।……………( চলবে )…

About The Author
Ikram Jahir
Ikram Jahir

You must log in to post a comment