অন্যান্য (U P)
Now Reading
ঘৃণা
125 15 1

ঘৃণা

by Md Motiar RahamanDecember 2, 2017
What's your reaction?
লাইক ইট!
0%
FUNNY
0%
Sad
0%
Boring
0%

ঘণ্টাখানেক দেরিতে হলেও বনানীর জ্যাম উতরে শোভার জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে পৌঁছতে পেরে মনে মনে খুবই উৎফুল্ল কবিতা। শোভা কবিতার কলেজ বান্ধবী, কাসমেট।
জন্মদিনের জমকালো অনুষ্ঠান। পুরো ছয়তলা বাড়িজুড়ে রঙিন বাতি জ্বলছে। সাদা আর নীল আলোর মিশেল কবিতার কাছে বেশ ভালো লাগাতে সে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। শোভার মা এসে কবিতাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ভেতরে নিয়ে গেলেন। শোভার সাথে দেখা হলো। গল্পে মেতে উঠল দু’জন। ফাঁকে আগত অতিথিদের ‘হাই’ ‘হ্যালো’ বলতেও হচ্ছে মাঝে মধ্যে।
অনুষ্ঠানের শেষের দিকে এলো শোভার মায়ের বান্ধবী মিশু। বেশ সুন্দরী মহিলা। এ বয়সে ফিগারটাও ধরে রেখেছে বেশ। কবিতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে বান্ধবীকে নিয়ে এলেন শোভার মা।
মিশু, এ হচ্ছে শোভার বান্ধবী কবিতা। আমাদের সবার প্রিয় আজাদ সাহেবের মেয়ে। আর কবিতা, ইনি হচ্ছেন আমার বান্ধবী মিশু, এক্সপার্ট বিউটিশিয়ান।
আজাদ সাহেবের নাম শুনতেই চমকে উঠল মিশু, এই কবিতাই তাহলে আজাদের মেয়ে! বাবার মতোই চেহারা তার। চিকন নাক, লম্বাটে অবয়ব, চোখে মায়ার চাহনি।
কবিতারও চিনতে দেরি হয়নি মিশু নামের হৃদয়হীন এই মহিলাকে। মুহূর্তে ঘৃণায় মুখ কালো হয়ে যায় তার। কোনোভাবেই অনুষ্ঠানটি শেষ হলেই হয়, এক মিনিটের জন্যও দেরি করবে না কবিতা। এই ঘৃণিত মহিলার চেহারাও দেখতে রাজি নয় সে। এদিকে অনুষ্ঠান শেষ হতেই কবিতাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করল মিশু। কবিতা চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল শোভার কামরায়। এমনিতে মন মেজাজ ভালো নেই, তার ভেতর এই মহিলার আগমন তার কাছে একেবারেই অপছন্দের।
মুখে মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে কবিতার পাশে বসল মিশু।
কবিতা, তুমি মাশাআল্লাহ অনেক সুন্দরী হয়েছো। তোমার বাবা কেমন আছেন?
মিশুর কথাগুলো কবিতার কাছে অস্বস্তিকর মনে হলো। এমনিতে মহিলাটিকে অসহ্য লাগছে, তার মধ্যে বাবার কথা বলাতে একেবারেই গোস্যায় নাকের অগ্রভাগ লাল হয়ে গেল কবিতার।
চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত কবিতা খানিকটা রাগের ভাষায়ই কথা বলল, আমি যে বেশ সুন্দরী সে কথা আমি জানি। এটা আপনার কাছ থেকে শুনতে আমার মোটেও ভালো লাগেনি। আমার রূপের প্রশংসা করেছেন বলে আমি আপনার রূপের প্রশংসা করব যদি ভেবে থাকেন তাহলে ভুল করছেন। দেখুন আপনার নাকটা কেমন বোঁচা, গলায় কত্তবড় একটা কালো তিল আর ঠোঁটগুলো মাশাআল্লাহ আফ্রিকানদের মতো মোটা মোটা। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো আপনার ভেতরটা আরো কুৎসিত, কদাকার।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গোস্যায় কেঁপে উঠল কবিতা।
মিশু খানিকটা বিব্রতবোধ করলেও যথাসম্ভব স্বাভাবিক হয়ে হাসার চেষ্টা করল।
কবিতা শোনো…। কথা শেষ করতে পারল না মিশু, তার আগেই আবার বলতে শুরু করল কবিতা।
আপনি শোনেন, আমার ঘৃণার সবটুকু আজ আপনাকে দিয়ে যেতে চাই। যা এত বছর ধরে জমিয়ে রেখেছিলাম আপনার জন্য। আপনি কোনো সাহসে আমার বাবার কথা জিজ্ঞেস করলেন? আপনি যে আজাদ আহমেদের পায়ের যোগ্যও নন, এটা তো আপনার না জানার কথা নয়। যে আজাদ আহমেদ আপনাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিল, যার ভালোবাসায় কোনো ত্রুটি ছিল না। আপনাকে নিয়ে যার হাজারো স্বপ্ন ছিল সে মানুষটিকে আপনি এভাবে একা রেখে চলে যেতে পারলেন? আপনি যে একজন দুশ্চরিত্র মহিলা সেটা আপনি নিজেই প্রমাণ করলেন, প্রতারণাই যদি করবেন তবে কেন বিয়ের কথাবার্তা আর দিন-তারিখ ঠিক হওয়ার পর আপনি চলে গেলেন অন্যের হাত ধরে? আজাদ আহমেদের টাকার গরম ছিল না বলে? ছি:, আপনার চেহারার দিকে তাকাতেও আমার ঘৃণা হচ্ছে। নিজের চেহারা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলো কবিতা।
আপনার প্রতি এতটা ঘৃণা আমার হতো না, যদি বাবা আপনাকে ভুলে যেত। কিন্তু আমার বাবা তো আপনাকে আজো ভোলেনি, কারণ মানুষ একবারই ভালোবাসে। প্রথমবার ভালোবাসে, তারপরের বারগুলো সত্যিকার অর্থে ভালোবাসা নয়, সমঝোতা অথবা ভালোবাসার অভিনয়ও বলা যেতে পারে। আমার বাবার মতো ভালো মানুষ আমি আর দেখিনি। কারো প্রতি কোনো দিন অন্যায় করেননি। অথচ আপনাকে ভালো বেসেছিল বলে বাবা বাধ্য হয়ে আমার মায়ের সাথে অভিনয় করেই যাচ্ছে। আপনার জন্য আমার আফসোস হয়, আমার বাবার বুকভরা ভালোবাসার পাহাড় জমা আছে আপনার জন্য অথচ সে ভালোবাসা থেকে আপনি বঞ্চিত। কতদিন একাকী গভীর রাতে অশ্রুভেজা বাবাকে বেলকনিতে বসে থাকতে দেখেছি। মাঝে মধ্যে বাবা হারিয়ে যায় তার ফেলে আসা স্মৃতিতে। হয়তো কল্পনার সেই মানুষটি তখন আপনিই। আপনিই ঘুরে বেড়াচ্ছেন বাবার হাত ধরে অথচ আমার মা তা দেখতে পাচ্ছেন না। কিন্তু বাবা আমার কাছে কিছুই লুকোয় না, আমি বাবার সব কথাই জানি। আর জানি বলেই আমি আপনাকে ঘৃণা করি, প্রচণ্ড ঘৃণা, হৃদয় উড়াজ করা ঘৃণা।
শোভার কামরা থেকে বের হয়ে যায় কবিতা। তার চলে যাওয়ার পর মিশু লক্ষ করল তার চোখের পাতা ভিজে গেছে। আজাদের প্রতি সত্যিই বড় অবিচার করেছিল সে। আজাদের চেয়ে বেশি টাকার মালিক বলে সাজ্জাদকে বিয়ে করেছিল মিশু। কিন্তু সাজ্জাদের ভেতরে একজন আজাদকে খুঁজে পায়নি মিশু, ভুল হয়ে গেছে তার। ততক্ষণে বড্ড দেরিও হয়ে গিয়েছিল। আজাদকে তার মা-বাবা বিয়ে দিয়ে দেন সহসাই।
ভাবতে ভাবতে উদাস হয়ে যায় মিশু। তার গাল বেয়ে ঝরে পড়া অশ্রুফোঁটার সাথে কষ্টগুলো ঝরতে থাকে।

About The Author
Md Motiar Rahman
Md Motiar Rahaman
1 Comments

You must log in to post a comment