সমসাময়িক চিন্তা
Now Reading
ওই চিনস আমারে?
10330 1952 0

ওই চিনস আমারে?

by SRAMay 26, 2017
What's your reaction?
লাইক ইট!
100%
FUNNY
0%
Sad
0%
Boring
0%

এই লেখাটির শিরোনাম কোনো বাংলা সিনেমার ডায়লগ থেকে নেয়া নয়। এটা আমাদের দেশের অনেক মানুষের মুখে ইদানীং প্রায়শই শোনা যায়। নিজের ক্ষমতা জাহির করার জন্য কিংবা অন্যকে ভয় দেখানোর জন্য এই ধরনের সিনেম্যাটিক ডায়লগ দেয় আমাদের সমাজের কিছু মানুষ। তাদের নিয়েই আজকের এই লেখা।

আমাদের দেশে এখন শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত ও ধনী ব্যক্তি এখন আমাদের দেশে বিরাজমান। এছাড়াও দেশের বাইরেও অনেক জ্ঞানী-গুণী মানুষজন রয়েছেন। এদের মাঝে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন যারা নিজেদের পেশি শক্তি দেখিয়ে কেমন যেন একটা পৈশাচিক আনন্দ পান। একজন রিকশা চালকের গালে সামান্য কয়টা টাকার জন্য চড় বসিয়ে দিতেও দ্বিধাবোধ করেন না। কিংবা নিজের গাড়ি দিয়ে রাস্তায় চলতে থাকা রিকশাটাকে ধাক্কা দিতেও এতটুকু বুক কাঁপে না। নিজে রাস্তার ভুল সাইড দিয়ে গাড়ী চালিয়ে গিয়ে আবার নিজেই সামনে থাকা মানুষ বা যানবাহনের চালকদের উপর চড়াও হন। ভাবখানা এমন থাকে যেন রাস্তা তার বাবার তৈরি। শুধু সে নিজেই চড়বে। এ তো গেলো শুধু রাস্তার কথা। ব্যবসা , চাকরি কিংবা স্কুল-কলেজেও এ ধরনের মানুষ বর্তমানে সয়লাব। কেন এই নৈতিক অবক্ষয়?

হয়তোবা মাত্রাতিরিক্ত টাকা আর নয়তো সুশিক্ষার অভাব। যেটাই হোক মানুষের নিজস্ব কিছু নীতি থাকাও উচিত। মানুষকে আজ মানুষ বলে মনে করা হয় না বলেই সমস্যা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে আমাদের সবার অগোচরে।

যদি এই ধরনের আচরণের কারণ হয় টাকা তাহলে তো এমন নিয়ম করতে হবে যেন কেউ বড়লোক বা বিত্তবান না হন। যা সম্ভবপর নয় এবং হাস্যকর। আর সকল বিত্তবানই কি এক রকম? না তা নয়। আমরা সকলেই জানি যে, বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ। অনেক মানুষই গত ১০-১৫ বছরে বিশাল অংকের টাকার মালিক হয়েছেন। নিজের কাজের জায়গায় উন্নতি করেই হোক আর দুর্নীতি করেই হোক টাকা ঠিকই তাদের হাতে এসেছে। সমস্যাটা তাদের নিয়েই যারা এই আলগা টাকার গরম সহ্য করতে পারেন না। টাকা হাতে আসতে না আসতেই তারা নিজেরদেরকে লাগামহীন মনে করা শুরু করেন। আশেপাশের মানুষ তখন তাদের কাছে তুচ্ছজ্ঞানহীন হয়ে পড়ে। এমনকি তাদের নিজের পরিবারের মানুষগুলোও। বিষয়টা পরিষ্কার করার জন্য একটা ঘটনার অবতারণা করা যাক।

মনে করুন, আপনি ও আপনার ছেলে বা ভাগ্নে বা ভাতিজা আপনার নতুন কেনা গাড়িতে যাচ্ছেন। কোনো সরু রাস্তা ক্রস করার সময় একটা রিকশা আপনার গাড়িতে ধাক্কা দিলো। আপনার নতুন গাড়ির একটু দাগ পড়লো। কি করবেন আপনি সেই মুহূর্তে? স্বাভাবিকভাবে দেখা যায় তো শতকরা ৯৯ জন মানুষই ওই রিকশা-চালকের গায়ে হাত তুলবেন। এমনকি একটা রক্তারক্তি কান্ডও ঘটিয়ে ফেলতে পারেন। আর মুখ থেকে যে সুমধুর বাক্য ক্রমাগত বের হবে তা গালি বলেই আমাদের সমাজে পরিগনিত হয়। কিন্তু এসব করার আগে একবারও কি খেয়াল করেছেন যে আপনার পাশে কে বসে আছে? সে আপনার ভবিষ্যত প্রজন্ম। আপনার পরিবারের মান সম্মান তার হাতে থাকবে ভবিষ্যতে। তার তখনকার আচরণ বলে দিবে যে আজকে আপনি তাকে কি শেখাচ্ছেন। অনেকটা সেই ছোটবেলায় পড়া প্রবাদ বাক্যটির মত, “ব্যবহারেই বংশের পরিচয়”। ছোটদের মন হয় কাঁদার মত। তাতে যেকোনো কিছুই খুব ভালোভাবে ছাপ ফেলে যায়। বিশেষ করে খারাপ কথা অথবা খারাপ ব্যবহার তারা বেশি মনে রাখে। আপনি যখন সেই ছোট বাচ্চাটির সামনে আপনার বাবার বয়সী কিংবা তাঁর চেয়েও বয়সে বড় মানুষকে গালি দিচ্ছেন অথবা তাঁর গায়ে হাত তুলছেন তখন একবারও কি ভেবে দেখেছেন ওই বাচ্চাটার মনে সেটা কি প্রভাব ফেলছে? সে কি শিখছে? হ্যাঁ মানছি আপনার গাড়ির ক্ষতি হয়েছে। হয়তোবা ওই দাগ আর কোনোদিন গাড়ি থেকে যাবেই না। কিন্তু আপনি যে দাগ ওই বাচ্চাটির মনে ফেলে দিলেন সেটাও কি আর কোনোদিন মুছে যাবে? সে দেখছে যে রাস্তার মাঝে আপনি নিজের ক্ষমতা জাহির করছেন। ক্ষণে ক্ষণে হয়তোবা এটাও বলছেন, ‘ওই আমারে চিনস? কার গাড়িতে ধাক্কা দিছোস ওইটা জানোস?’ ইত্যাদি।

কিন্তু ব্যাপারটা কি অন্যভাবে সমাধান করা যেত না? এভাবে চিৎকার করে কিংবা মারামারি করে নিজের মান সম্মানটা নষ্ট না করে ভদ্রভাবেও কিন্তু এই ধরণের পরিস্থিতি সামলানো যায়। তাতে করে ওই বাচ্চাটিও শিখতো যে গন্ডগোল বা গালি-গালাজ না করেও সমস্যার সমাধান করা যায়। কথায় আছে, শিক্ষিত মানুষ সব সময়ই তার শিক্ষার পরিচয় দেন। এটা আপনারও করা উচিত একজন শিক্ষিত নাগরিক হিসেবে। কারণ, আপনাকে দেখে সমাজের আরো পাঁচটি বাচ্চা শিখছে। এটা আপনার দায়িত্ব যাতে সে আপনার দ্বারা খারাপ কিছু না শিখে বড় হয়।

অনেকেই আবার প্রায়শই বলেন, ‘অমুক এমপি আমার এই লাগে। অমুক পুলিশ কমিশনার আমার মামা বা মামার বন্ধু’। এসব বলে আপনি কি বোঝাতে চাচ্ছেন? আপনার অনেক ক্ষমতা আছে নাকি আপনার অনেক ক্ষমতাধর মানুষের সাথে উঠা বসা আছে। বাস্তবিক অর্থে, আপনার নিজের বলে তাহলে কিছুই নেই। আপনি যেটা করছেন পুরোটাই ‘পরের ধনে পোদ্দারি’ করার মত ব্যাপার। আপনার নিজের কি যোগ্যতা আছে সেটা ভেবে দেখুন তো। যাদের নাম নিয়ে আপনি এত কিছু বলছেন তারা তাদের নিজেদের যোগ্যতায় আজকে ওই পর্যায়ে গিয়েছে। আজকালের দিনে অনেক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর দ্বারা অনেক নামী দামী মানুষের সাথেই সাধারণ মানুষের সম্পর্ক স্থাপিত হচ্ছে। অনেকের সাথে খুব ঘনিষ্ঠতাও বাড়ছে। তার মানে তো এই নয় যে সবাই সেই সম্পর্ক গুলোর সুযোগ নেবে। চাটুকারিতা কোনো সম্পর্ককেই টিকিয়ে রাখতে পারে না।

আজ এই একবিংশ শতাব্দীর যুগে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছি। হয়তোবা অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে আমরাও উন্নত দেশের তকমা গায়ে লাগাবো। তখনও কি এই আচরণগুলো আমরা আশা করব আমাদের সমাজের মানুষগুলোর কাছ থেকে। নিশ্চয়ই না, আর তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সময় এখনই। নয়তো অন্য কোনো দেশের কিছুই হবে না, শুধু মূল্যবোধ ও আত্মসম্মানের যে ক্ষতি হবে সেটা আমাদেরই হবে। জাতি হিসেবে আমাদের হয়তোবা অনেক সম্পদ থাকবে কিন্তু সম্মানের ঝুলিটা শূন্যই থেকে যাবে।

রেটিং
পাঠকের রেটিং
Rate Here
পোস্টের টাইটেলের সাথে মুল লেখার মিল
82%
পোস্টের ছবি কতটা সামঞ্জস্য পূর্ন
59%
লেখনীটা কেমন?
62%
পোস্টটি পড়ে আপনি কতটুকু স্যাটিসফায়েড?
63%
67%
পাঠকের রেটিং
8 ratings
You have rated this
About The Author
Shumit Roy
SRA
0 Comments

You must log in to post a comment