কোরিয়া সমাচারঃএকাল-সেকাল

Please log in or register to like posts.
News

দুটি দেশের, ভাষা, শিক্ষা, কৃষ্টি-কালচার সবই অভিন্ন, অথচ আন্তর্জাতিক সীমারেখা আর চরম বৈরিতার দরুণ দুটি ভিন্ন দেশ উত্তর কোরিয়া আর দক্ষিণ কোরিয়া।কোরিয়া পেনিনসুলাতে যুদ্ধ আর অস্থিরতার শুরু অনেক আগেই।
কোরিয়া একটা সময় অবিভক্ত থেকে জাপানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল।1910 সালে কোরিয়া জাপানের অধীনে চলে যায় এবং তারা ১৯৪৫ সাল নাগাদ পর্যন্ত জাপান কর্তৃক শাসিত হয়।দীর্ঘ ৩০-৩৫ বছরেরও বেশি সময় যাবত জাপানের নিয়ন্ত্রণে ছিল কোরীয় উপদ্বীপ।কোরিয়ার পশ্চিমে গণচীন আর উত্তর- পশ্চিমের অনেকটা জুড়ে রাশিয়া(তদকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন); পীত সাগর  আর জাপান সাগরের মাঝামাঝি সমগ্র কোরিয়ার ভৌগলিক অবস্থান। কোরীয় প্রণালী ও জাপান সাগর পূর্বে এটিকে জাপান থেকে আলাদা করেছে আর দক্ষিণে এটি আর পূর্ব চীন সাগর দ্বারা তাইওয়ান থেকে আলাদা হয়েছে।১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ  শেষে জাপানী সম্রাজ্যের আত্মসমর্পণের পরবর্তীতে বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া ও কোরিয়া প্রজাতন্ত্র নামের দুটি নতুন স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটার মাধ্যমে অঞ্চলটি বিভাজিত হয়।বিশ্বযুদ্ধের পরপরই পরাজিত জাপানি সৈন্যরা কোরিয় উপদ্বীপ ত্যাগ করে।জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের কারণে রাশিয়া আর যুক্তরাষ্ট্রকে যথাক্রমে কোরিয়ার উত্তর অংশ এবং দক্ষিণ অংশের দায়িত্ব দেওয়া হয়।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত কোরীয় উপদ্বীপ একই সাধারণ রাজনৈতিক আদর্শে প্রতিষ্ঠিত ছিল।নানাবিধ জটিল কারণ এবং দুটি অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বৈরি সম্পর্ক তৈরি হওয়াতে ১৯৪৮ সালে কোরিয়  উপদ্বীপে দুটি পৃথক  রাষ্ট্রের সৃষ্টির সম্ভাবনা জোড়ালো হয়। উত্তর কোরিয়া, ১৯৫০ সালে সমাজতান্ত্রিক দেশ রাশিয়ার মতাদর্শে   সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় চলে যায়, অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া পুঁজিবাদি আমেরিকার অনুশাসনে দীক্ষিত হয়ে পুঁজিবাদি শাসনতন্ত্রে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে। তখন থেকে কোরিয়া দুটি ভিন্ন নাম যথা উত্তর ও দক্ষিণ তথা দুটি পৃথক-পৃথক অথনৈতিক ব্যবস্থাতে চলতে শুরু করে। দক্ষিণ কোরিয়াতে আমেরিকার পুঁজিবাদ আর উত্তর কোরিয়াতে সোভিয়েত ইউনিউনের মত সমাজতন্ত্রবাদ চালু হয়।ভাষা, শিক্ষা, কৃষ্টি-কালচার সবই অভিন্ন থাকলেও আন্তর্জাতিক সীমায় বিভক্ত হয়ে আলাদা দুটি জাতি হিসেবে বিশ্বমানচিত্রে পরিচিত হল।একদিকে, উত্তর  কোরিয়ার নামকরণ  হয় গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া আর দক্ষিণ কোরিয়ার  নাম দেওয়া হয় প্রজাতন্ত্রী কোরিয়া। উত্তর কোরিয়া এর রাজধানী নির্ধারিত হয়  পিয়ং ইওং আর দক্ষিণ কোরিয়া এর রাজধানীর হয় সিউল।
এরপরে কোরিয়ানদের নিজেদের মাঝে কিছু যুদ্ধ সংঘটিত হয়।রাশিয়ান আর মার্কিনীদের পরোক্ষ এবং সমান্তরাল প্রভাব ও লক্ষণীয় ছিল।১৯৫০ সালের জুন মাসে”কোরীয় যুদ্ধ” এর প্রারম্ভিকা; চলতে থাকে তিন বছর সময়কাল ধরে।উত্তর কোরিয়ার পক্ষে লড়াই করার জন্যে গণচীন যুদ্ধে প্রবেশ। চীনা মধ্যস্ততায় দক্ষিণী স্বজাতীয় বাহিনী ৩৮তম সমান্তরাল রেখার পিছনে পশ্চাদপসরণ করে। যতক্ষণ পর্যন্ত রাশিয়া সরসরি যুদ্ধে না নিলেও তারা উত্তর কোরীয় ও চীনা উভয় বাহিনীকে সরঞ্জামিক সহয়তা প্রদান করে। এই যুদ্ধ সমাপ্ত হয় যখন  ১৯৫৩ সালে কোরীয় যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।কোরীয় যুদ্ধে কয়েক লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হরায়; ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় অনেক শহর।ভয়াবহ এই যুদ্ধের পর দক্ষিণ কোরিয়া সাময়িকভাবে হলেও ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হয়।উত্তর কোরিয়ার যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থাও ছিল ভয়াবহ-নির্মম।
বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া উদীয়মান সামরিক শক্তির একটি দেশ।২০০২ সালের এক ভাষণে দক্ষিণ কোরিয়ার মিত্র তদকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ উত্তর কোরিয়াকে শয়তান চক্র আখ্যা দিয়েছিলেন। উত্তর কোরিয়া আর দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক শক্তির পার্থক্যই এমন মন্তব্যের কারণ।সিউলের তুলনায় পিয়ং ইওং অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী।তবে, আজকের এ সময়ে বাজার অর্থনীতির দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্বের জিডিপি-দিক থেকে অবস্থান পঞ্চদশ তম।২০০৯ সালে অষ্টম বৃহৎ রপ্তানীকারক দেশের স্বীকৃতি পায় দেশটি। উত্তর কোরিয়ার সাধারণ মানুষেরা অনেকবেশি স্বাধীনচেতা আর স্বাভাবিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত , বৈশ্বিক ভাবধারার সাথেও পরিচিত। মুদ্রার উল্টোপিঠে,উত্তর কোরিয়ার শাসকদের উদাসীনতার কারনে,সাধারণ জনমানুষ অনেক  আগে থেকেই সুবিধা বঞ্চিত। বেশ কিছু দুর্ভিক্ষে অনেক বেসামরিক মানুষের প্রাণ যায়।কিন্তু, এতকিছুর মধ্যেও উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা দুঃসাহসিকতার সাথে চালিয়েই যাচ্ছে; অনেক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার পরেও।২০০৬ এর পর ২০০৯ সালেও এর পুনরাবৃত্তি করে উত্তর কোরিয়া; ধারাবাহিকভাবে এখনও করছে; দুএকটা পরীক্ষা বিফলেও গেছে।সম্রতি, ২০১৭ তে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা নিয়ে যে টানটান উত্তেজনা শুরু হয়েছিল, তাতে অনেক মনিষীরা আগাম সতর্কবাণীও দিচ্ছিলেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের।প্রতিবেশী দেশ গণচীন পরিস্থিতি কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি সামলে দেবার চেষ্টা করে;কিম জং উনের উত্তর কোরিয়া তবু পিছু হটবার পাত্র নন;বারবারই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখাচ্ছেন।উল্লেখ্য যে,উত্তর কোরিয়া নিউক্লিয়ার নন-প্লোরিফেরাশন চুক্তিতে সই করলেও ২০০৩ সালে প্রত্যাহার করে নেয়; পুরো বিশ্ব থেকে নিজেদের গুটিয়ে একঘরে রাখার প্রক্রিয়া এখান থেকেই শুরু। অতীতে জাপানের উপনিবেশ থাকার কারণেই, জাপান ও জাপান সাগর তৎসংলগ্ন দ্বীপবাসীদের প্রতিটা দিনই ভয়াবহ রকমের আতঙ্কের; যতটা দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদের জন্যে।দক্ষিণ কোরিয়া ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র – যুক্তরাজ্য- ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসঙ্ঘের সামরিক হুমকির মধ্যে রয়েছে উত্তর কোরিয়া।
আপাতদৃষ্টিতে এটাই যৌক্তিক,কেননা লিটলবয় আর ফ্যাটম্যানের নৃশংসতার কথা শুধু নিপ্পনবাসীরাই নয় পুরো পৃথিবীই মনে রেখেছে।হিরশিমা-নাগাসাকির দগদগে ক্ষত এত জলদি শুকিয়ে যায় নি; তবু সময়ের এই ফ্রেমে এসে একসময়ের শত্রুপক্ষ আজ মিত্রপক্ষ।পুরো দুনিয়াতে সমাজতান্ত্রিক দেশ কয়টাই বা আছে? পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে পেরে ওঠা বড্ড দুরূহ ব্যাপার।আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে উত্তর কোরিয়াকে যেভাবে আমরা উপস্থাপন হতে দেখছি, তা কি শুধুই ভেল্কিবিশেষ; নাকি ৩৬০ ডিগ্রি বেঁকে বসে ভূল রথ দেখছি।যে যুদ্ধটা মূলত হচ্ছে তার শুরু টা বিধ্বংসী স্নায়ুযুদ্ধ থেকে, কিম জং ঊনদের কো আর বিশ্বায়নে বিশ্বাসী অসংখ্য সামরিক আর বেসামরিক মানুষের ভাগ্য কি এখন পুতিন-ট্রাম্পদের চালে শান্তি নাকি সংঘর্ষের দিকে মোড় নিবে তা এখনই বলা মুশকিল।
তবে,ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে,সাম্রাজ্যবাদীরা মানবতা বোঝে না; ছোট শিশুর কোমল নিষ্পাপ মুখ অমলিন থাকুক এমন বোধ ওদের হয় না,লোভে পাপকে ধারণ করে সেই পাপেই যে ওদের মৃত্য ওরা ভূলে যায়; পরবর্তী প্রজন্মের খলনায়ক হয়ে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয় এই নরপশুরা।
কৃতজ্ঞতাঃ  https://en.wikipedia.org/wiki/Korea
এবং বিবিসি প্যানারোমার একটি প্রামান্যচিত্র থেকে অনুপ্রাণিত

Reactions

0
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

Reactions

Nobody liked ?