৩৩ নং মাথা

এবারেই প্রথম মনে হচ্ছে মাথাটা কেটে ফেলা ঠিক হয়নি। কাটা মাথা থেকে অনবরত রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। প্লাস্টিকের সিমেন্ট ব্যাগে ভরেও কিছু হচ্ছেনা। ব্যাগ চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে। ফ্লোর মুছবে নাকি বডি ফেলে দিয়ে আসবে স্থির করতে পারছে না আরফান। মাথাটা নিজের জন্য রেখে বডিটা ফেলে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এত রক্ত দেখে তার নিজের হাঁটু ভেঙ্গে আসছে।

 

নিজের উপর রাগ হতে লাগলো তার । ৩৫ তলা একটি ভবনের ২৭ তলাতে অবস্থান করছে সে। খানিক আগে শাকিল এর সাথে গতবছরের জেলখানার দিনগুলো নিয়ে হাসি ঠাট্টা করছিল। হটাৎই প্রসাব করার নাম দিয়ে শাকিলের পিছে চলে আসে আরফান। কোমরে গুঁজে রাখা হালকা মরচে ধরা চাপাতিটা হেঁচকা টানে বের করে আনে। জং ধরে গেলেও জিনিসটা দারুণ কাজ করে। ধীরে ধীরে শাকিলের পিছে এসে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ভাবে গত কয়েকদিনের কথা।

 

২ সপ্তাহ আগেও শাকিলকে চিনতো না আরফান। দুপুরে বাসায় ভাত খাচ্ছিল শুঁকনো মরিচ আর আলুভর্তা দিয়ে। এমন সময় নেতার ফোন এলো। মাখা ভাত রেখেই হাত ধুয়ে এসে নেতার ফোন তুললো সে,

-আরফান, কিরম আছোস?

– জ্বী নেতা আছি।

– তোরেতো দরকার।

– আমি আসতেছি।

– আসা লাগবে না। রাসেল তোর সাথে স্টেশনে দেখা করবে। ওর কাছে থেকে কাজ বুঝে নিয়ে চলে যা।

– এলাকার বাইরের কাম?

– না হইলে তো স্টেশনে যাইতে কইতাম না।

– মাফ কইরা দেন নেতা। আমি যাইতাছি।

– যাহ যাহ। ভাল মত কাজ কর। সামনে তোরেই আমি মাঠের রাজা কইরা দিমু।

– জ্বি আচ্ছা। আসসালামুয়ায়ালাইকুম।

 

নেতা সালামের উত্তর দেন না। ফোন রেখে শার্ট গায়ে চড়িয়ে বের হয়ে যায়। ব্যাগ তার রেডি ই থাকে। রেল স্টেশনে রাসেল চা দোকানে বসিয়ে সব বুঝিয়ে দেয় আরফানকে। গাড়িতে উঠার সময় পিঠে হাত বুলিয়ে দেয় রাসেল, -“আরফান ভাই, তুমি একটা মাল। এত সুন্দর কইরা কাজ আমরা পারিনা। নেতা তাই তোমারেই ডাক দেয়। নেতা বলে সামনে ছাইড়া দিব, লগে রাইখো। ”

 

আরফান হালকা হাসে। মাথা ঝাঁকিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ে।

 

আরফানের কাজের পদ্ধতি অন্যরকম। সে প্রতিটা খুন সময় নিয়ে করে। মাঝে মাঝে ১ মাস, মাঝে মাঝে ৩ মাস আবার কখনো ২ সপ্তাহেও কাজ শেষ করে ফেলে। খুন করার আগে প্রতিটা ভিক্টিম এর সাথে বন্ধুত্ব করে সে। নিজেকে ভিক্টিম এর টার্গেটে পরিনত করে। তারপর ঘনিষ্ঠতা যখন চরমে উঠে যায়, তখন নিরিবিলি কাজ করে দেয়।

 

শাকিল গাজীপুরের প্রভাবশালী গুন্ডা। টেন্ডারবাজি – চাঁদাবাজি – ধর্ষণ – খুন – গুম সবই করে এবং করায়। আরফানের জন্য কাজটা সোজা হয়ে যায় কারন চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। শাকিলের মেয়েকে ইচ্ছাকৃত ভাবে অটোরিক্সার নিচে ফেলে, নিজেই উদ্ধার করে ১ নিয়ে শাকিলের নজরে আসে। শাকিল খুব আন্তরিক হয়ে মিশে যায় আরফানের সাথে। ২ মাসে শাকিলের সব ব্যবসার নাড়ি-নক্ষত্র বের করে ফেলে। তারপর আজ সন্ধ্যার পাগলা পানি খাওয়ার দাওয়াত দিয়ে শাকিল কে আসতে বলে এই কন্সট্রাকশন এর কাজ চলা ভবনে।

 

১ মিনিটে সব রিওয়াইন্ড প্লে করে এক কোপ দিয়ে শাকিলের গলাটা নামিয়ে ফেলে আরফান। চিৎকার দেয়ার সুযোগটাও পায়নি মানুষটা। কেন খুন করতে হলো সেটা জানেনা, সে জানে নেতার একে সরিয়ে দেয়ার দরকার ছিল তাই সে তার বেচে থাকার অধিকার হারিয়েছে।

 

মাথাটা পাশে রাখা বালুর উপরে কতক্ষণ ঘষলো সে। তারপর শ্বাসনালিতে একটু বালিও ভরে নিল। বাড়িতে গিয়ে ধুয়ে নেয়া যাবে। আর লাশটা বস্তায় ভরে উপর থেকে ফেলে দিল নিচে। এটা ঘাড়ে করে নামাতে পারবেনা। শাকিল বেশ স্বাস্থ্যবান তো তাই। আর নিচে কেউ নাই।

 

খুনের পর মাথা রেখে দেয়া আরফানের শখ। তার গ্রামের বাড়িতে যথাযথ বৈজ্ঞানিক উপায় মেনেই সে মাথাগুলো সংরক্ষণ করে। বাড়িতে কাচারী ঘরের পিছে খড়ের গাদার নিচে একটা কম্পার্টমেন্ট বানিয়ে নিয়েছে সে। প্রায় ৩১ টার মত মাথা আছে তার সেই সংগ্রহশালায়। এটা নিয়ে ৩২  টা হলো।

 

ঘাটে এসে স্পীডবোটে লাশ তুলে নিজেই চালানো শুরু করলো। আগেই ঠিক করা ছিল। লাশটা বুড়িগঙ্গার বুকে যাবে।

 

বাড়ি ফিরে নেতাকে কল দিল। নেতা সেই রাতেই রাসেলকে দিয়ে বখশিশ পাঠিয়ে দিল। এইদিক দিয়ে নেতা কখনো আরফানকে নিরাশ করেননি। দরকারের চেয়ে বেশিই দিয়েছেন। গত ৭ বছরে আরফান ৩২ টা খুন করেছে সব নেতার আদেশে। ৩৩ নাম্বার খুনটা নিয়ে সে খুব আশাবাদী। কারন সেটাই তার জীবনের শেষ খুন হবে। আর ভাল লাগেনা এই ফেরারী খুনির জীবন। তার জীবনের সব স্বপ্ন –আশা ৩৩ নাম্বার খুনটা নিয়ে।

 

ছোটবেলায় বাবাকে নিজের চোখের সামনে খুন হতে দেখেছে। বাচ্চা, কিছু বুঝবে না বলে খুনিরা তাকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। মা কে চোখের সামনে ৩ পশুর লালসার শিকার হতে দেখেছে। মা মুখে হাত চেপে চিৎকার করে কেঁদেছে। লজ্জা, গ্রামের মানুষের নিন্দা আর চেয়ারম্যানের দেয়া শাস্তির সামনে দাড়াতে পারেনি মা। সেখানেই এলিয়ে পড়েছেন, বুকের ঊপর উঠে মার মুখ ধরে নাড়ছিল আরফান, মনে আছে তার। কিন্তু মা কথা বলেনি। ৪ বছরের শিশু আরফান সব মনে রেখেছে।

৪ মাস পরের কথা। ইলেকশন শেষ। নেতা আবারো গ্রামের চেয়ারম্যান। ২৮ বছর ধরে তিনি একাই রাজত্ব করছেন। সামনে আরো করবেন এই আশাবাদ ব্যক্ত করে সভা শেষে বাসায় ফিরছেন। সাথে আরফান ছাড়া কেউ নেই।

 

২ ঘন্টা পর আরফান নিজেই থানায় যায়। গিয়ে সব পুলিশকে খুলে বলে। পুলিশ সব শুনে চোখ বড় করে জিজ্ঞেস করে

– লাশটা কই?

– স্যার লাশ তো বুড়িগঙ্গায়। তয় আমি মাথা রাইখ্যা দেই।

– চল দেখাবি।

 

পুলিশকে নিয়ে সংগ্রহশালায় যায় আরফান। ৩৩ নং মাথাটা রাখা আছে। সামনে নেম প্লেট – “সোবহান শিকদার চেয়ারম্যান।”

 

মাথাটার দিকে তাকিয়ে অনেকটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে আরফান। এটা মা আর বাবার জন্য ।

Related Posts

রক্ত (১ম পর্ব)

July 10, 2018

July 10, 2018

শীতের বিকাল।রিমাদের বাড়িতে আজ বিরাট আয়োজন হয়েছে।আর হবেই না কেন?আজ যে রিমার বড় দিদির গায়ে হলুদ।বোনের গায়ে হলুদ হলেও রিমার...

আমি কারাগার থেকে বলছি।

July 8, 2018

July 8, 2018

যদিও মেয়েটা কালো, তবুও হাসিমুখে বিয়ে করেছি। কারন বাবার পছন্দ করা ছিল। আর যাই অমান্য করিনা কেন বাবার কোন কথা...

ব্রেকআপের পূর্বের চিঠি -২য় পর্ব

June 13, 2018

June 13, 2018

প্রিয় কথার ঝুড়ি, কথার ঝুড়ি বলছি বলে রাগ করছো! রাগ করোনা। তোমার কথায় তো আমার সব। এখন ভাবছো আমি কে?...

মাধ্যমিকের দিন গুলোতে প্রেম… ( ১ম পর্ব )

June 10, 2018

June 10, 2018

নবম শ্রেণিতে পরীক্ষা দিয়ে দশম শ্রেণিতে উঠলাম। সাল ২০০৭। তারপরের দিন গুলোর কথা মনে করলে আমি আর আমার মন কোনটাই...

একটি বেল গাছের কাহিনী

June 10, 2018

June 10, 2018

বেলতলা নামে এক গ্রামের ঘটনা।সেই গ্রামের একবারে পূর্ব পাশে একটা ঘর নিয়ে থাকতো রহিমা বিবি। তার স্বামী মারা গেছে। সারাদিন...

৩৩ নং মাথা

June 10, 2018

June 10, 2018

এবারেই প্রথম মনে হচ্ছে মাথাটা কেটে ফেলা ঠিক হয়নি। কাটা মাথা থেকে অনবরত রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। প্লাস্টিকের সিমেন্ট ব্যাগে ভরেও...

ব্রেকআপের পূর্বের চিঠি -১ম পর্ব

June 10, 2018

June 10, 2018

প্রিয় সরলতা, কেমন আছো?জানি তুমি আমার কোন প্রশ্নের উত্তর দিবে না! হয়তো তুমি আমার সম্মুখে আসতেউ চাওনা! তবে কেন? তাতো...

একটি রুপকথার গল্প

June 10, 2018

June 10, 2018

খুব ছোটবেলায় দাদার থেকে শোনা একটি গল্প। একদেশে এক সুখী রাজা ছিলেন আর ছিলো তাঁর অপরুপ সুন্দরী , গুণবতী প্রাণপ্রিয়...

মধ্যবিত্ত

December 17, 2017

December 17, 2017

জুতোগুলো পড়ার পরে খেয়াল করলাম পায়ের বুড়ো আঙ্গুল জুতোর ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে। একজোড়া নতুন জুতো কেনা দরকার। বাধ্য হয়ে...

পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী কিছু দেশের উত্থান-পতনের গল্প

December 15, 2017

December 15, 2017

পৃথিবীতে অনেক দেশ ও রাজত্ব শতাব্দীর পর শতাব্দী নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে সগৌরবে বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু এর...

মাতৃভাষা এবং সাহিত্য

December 8, 2017

December 8, 2017

গোড়াতেই বলিয়া রাখা ভাল, এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে আমি যে সাহিত্যের সকল দিক ও বিভাগ লইয়া প্রকাণ্ড একটা কাণ্ড বাধাইয়া দিতে...

অপেক্ষা

December 1, 2017

December 1, 2017

“অপেক্ষা”   তোমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ল্যাপটপ,ইন্টারনেট,মোবাইল এগুলা ব্যবহার করা একদম প্রায় ছেড়েই দিয়েছি।এগুলোর সবগুলোই ছিল তোমার...

পথের শেষে [১ম পর্ব]

November 20, 2017

November 20, 2017

সন্ধ্যার একটু পর তারা মেসে ফিরে এলো।সবাই বেশ ক্লান্ত।রিকা হাতের ব্যাগটা টেবিলের উপর রেখে টয়লেটের দিকে গেল ফ্রেস হতে। “রোজ...

পুরানো তিমির [১৪তম পর্ব]

November 10, 2017

November 10, 2017

কিছুদিনের মধ্যেই মা সুস্থ হলেন।তবে নতুন একটা সমস্যা নিয়েই তিনি সুস্থ হলেন।বাবার সাথে মা আলাপ করার সময় আমি শুনেছি,উনারা সিদ্ধান্ত...

পুরানো তিমির [১১তম পর্ব]

November 5, 2017

November 5, 2017

সকালে ঘুম থেকে উঠেই এমন একটা খবর শুনলাম যে আমার শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেল।গায়ের লোম গুলো কাঁটা দিয়ে উঠলো মুহূর্তে।আজিজুর...

Comments
%d bloggers like this: