পৃথিবীর প্রথম মার্ডার কেস!

মানুষ সব সময় জানতে চায় অনেক পূর্বে তাদের পূর্ব পুরুষ রা কেমন ছিল, কি খেত, কিভাবে থাকত। অতীত কালে মানুষের মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ সংরক্ষণ করা হত। সেই সংরক্ষিত মৃত দেহকে বলা হয় মমি। তবে অনেক সময় প্রাকৃতিক ভাবেও কোন কোন মৃত দেহ সংরক্ষিত হয় হাজার হাজার বছর। এগুলোকে ও বলা হয় মমি। মমি নিয়ে মানুষ এর আগ্রহের শেষ নেই।

মমি সংরক্ষণের জন্য বিখ্যাত মিশরের পিরামিড। কিন্তু পৃথিবীর প্রাচীন তম প্রাকৃতিক মমি টি কিন্তু পাওয়া গিয়েছে অস্ট্রিয়া ও ইতালির সীমান্তে অবস্থিত আল্পস পর্বত মালার বরফের মধ্যে।আর যখন জানা যায় মমিটিকে খুন করা হয়েছিল তখন থেকেই শুরু হয় পৃথিবীর প্রথম মার্ডার কেস!
১৯৯১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আল্পস পর্বতমালায় এক পর্যটক দম্পতির সর্ব প্রথম চোখে পরে এই মমি টি। তবে প্রথমে এই মমিটিকে মনে করা হয়েছিল সাধারণ এক পর্যটকের লাশ। এজন্য এটিকে বরফের মধ্য থেকে বের করার সময় সাবধানতা অবলম্বন না করায় হারিয়ে যায় অনেক ঐতিহাসিক সূত্র। যা নিয়ে গবেষক দের আফসোসের সীমা নেই।

57ea8e751b00007f08ef28b0.jpeg

গবেষণার পর জানা যায় এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন তম মমি। এখন থেকে ৫৩০০ বছর আগে সে বেচে ছিল। সবচেয়ে পুরানো অর্থাৎ ৫৩০০ বছর আগের রক্ত কোষ পাওয়া গিয়েছে এই মমির শরীরে। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল প্রায় ৪৫ বছর বয়স। ওজন ছিল প্রায় ৫০ কেজি এবং উচ্চতা ছিল প্রায় ৫ফুট ৩ ইঞ্চি। বর্তমান ইউরোপিয়ান দের মতই ছিল তার মুখমণ্ডল।
বিজ্ঞানী রা এর নাম দিয়েছে হোমো টাইরলিয়ান। কিন্তু আল্পস পর্বতে পাওয়া গিয়েছে বলে সবাই একে আদর করে ডাকে ইটজি বা Otzi.

কিভাবে খুন হয়েছিল ইটজি?

 

ইটজি র কিভাবে মৃত্যু হয়েছিল তা নিয়ে জল্পনা কল্পনার শেষ নেই। গবেষক দের মতে , তাকে খুন করা হয়েছিল। সে মারা যায় প্রতিপক্ষের এলাকায়। তার পাশে থাকা তীরের মাথা এবং তার গায়ে লেগে থাকা রক্তে অন্য মানুষ এর রক্ত পাওয়া গিয়েছে। ইটজি ছাড়াও আরও চারজন মানুষের রক্ত ছিল সেখানে।
তার ক্ষত দেখে বোঝা যায় সে হাতা হাতি লড়াইয়েও জড়িয়ে গিয়েছিল। তবে তার খুনি খুব সহজে তাকে খুন করতে পারে নি। সে নিজে দুজন ব্যক্তির গায়ে তীর ঢুকিয়েছিল এবং বের করেছিল।তার ছুড়িতে পাওয়া গিয়েছিল অন্য ব্যক্তিদের রক্ত। পরে তার শরীরে প্রতিপক্ষের  তীর লাগে এবং এভাবেই তার মৃত্যু হয়।
হয়ত খুনিটি তার বন্ধু বেশে শত্রু ছিল। অথবা প্রতিপক্ষের এলাকায় ঢুকে পরাই তার ভাগ্যে কাল হয়ে দেখা দেয়।
তার পাকস্থলী পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে মৃত্যুর ঘণ্টা দুয়েক আগে ইটজি তার শেষ খাবার খেয়েছিল। মৃত্যুর সময় ইটজি অসুস্থ ছিল। তার নখ পরীক্ষা করে জানা যায় মৃত্যুর চার মাস আগে থেকে সে কঠিন অসুখে ভুগছিল।

পৃথিবীর প্রাচীন তম ট্যাটু 

তার শরীর পাওয়া গিয়েছে ৬১ টা ট্যাটু। এটাই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরানো ট্যাটু। এই ট্যাটু গুলো কিন্তু সুই দিয়ে করা হয় নি। চামড়া কেটে তারপর কয়লা দিয়ে পোড়ান হয়েছে। সবচেয়ে মজার বিষয়  হচ্ছে, ট্যাটু গুলো এমন জায়গায় আকা যেসকল স্থানে মানুষের ব্যথা বেশি হয়, অর্থাৎ হাড়ের জয়েন্ট গুলোর উপরে। এই উল্কিগুলো আকুপাংচার পয়েন্ট চিহ্নিত করছে। বোঝা যাচ্ছে সে সময় ইটজিকে বিভিন্ন প্রকার চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি নতুন আবিষ্কার। অতি প্রাচীনকাল থেকেই আকুপাংচার চিকিৎসা চালু ছিল তা বিজ্ঞানীরা জানত। কিন্তু তা যে আরও ২০০০ বছরের পুরনো তা জানতে পারল এই মমিটি আবিষ্কারের পর।

তার পোশাকের টুকর গুলোতে বাদামী কালো কিছু চুল পাওয়া যায়। যা সাড়ে ৩ ইঞ্চির মত লম্বা। যা দেখে ধারনা করা হয় সেসময় চুল কাটার প্রচলন ছিল।

তার মৃত দেহের সাথে পাওয়া গিয়েছে পশমি তূন। যা সারা বিশ্বে নিউথিলিক যুগের একমাত্র পশমি তুন। একই ধরনের তীর এখনও প্রচলিত আছে। এছাড়াও ইটজির সাথে ছিল খুবই সাজান একটি ব্যাগ। যাতে ছিল আগুন জ্বালানোর যন্ত্র, খাবার, এবং বিভিন্ন শক্তিশালী লতা-পাতার সমন্বয়ে গঠিত একটি ফার্স্ট এইড কিট! তার এই সাজানো ব্যাগ বিজ্ঞানীদের খুবই আশ্চর্য করেছে। কারণ তার এই সাজানো ব্যাগ দেখে আপনি তাকে কোন অশিক্ষিত কৃষকের সাথে তুলনা করতে পারবেন না , বরং তাকে আপনি একজন প্রশিক্ষিত যোদ্ধা বা পর্বতারোহীর সাথে তুলনা করতে পারবেন। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের লোক গুলো আমাদের ধারনার থেকেও বেশি উন্নত ছিল।

উদ্ধারের সময় তার পরনের পোশাকটি প্রায় ছিঁড়ে গিয়েছিল। তবে যতটুকু উদ্ধার করা গিয়েছে তাতে বোঝা যায় তার পরনের পোশাকটি ছিল খুব মজবুত। যা দিয়ে আল্পস পর্বতের ঠাণ্ডা থেকে খুব সহজেই নিজেদেরকে রক্ষা করত তারা। তার আলখাল্লা টি ছিল হাঁটু পর্যন্ত লম্বা। তৈরি করা হয়েছিল হরিণ ও ছাগলের পশম ও চামড়া থেকে। জামাটিতে চামড়ার তিনটি পরত ছিল। তার জুতাটিও ছিল চামড়ার তৈরি। গরম রাখার জন্য তার ভিতরে দেওয়া ছিল ঘাস।আর ছিল একটি চামড়ার তৈরি টুপি।

72519.adapt.885.1.jpg

ইটজি কেমন ছিল?(এক মডেলের ছবি) 

মিশরের মমির মত, ইটজিকে নিয়েও তৈরি হয়েছে কিছু রহস্যময় ঘটনা। অনেকেই মনে করেন অন্য মমির মত এই মমিটি ও অভিশপ্ত ।প্রায় পাঁচটি মৃত্যুর সাথে জড়িয়ে আছে মমির অভিশাপ। ইটজি কে প্রথম স্পর্শকারীদের একজন হচ্ছেন ফরেনসিক মেডিক রাইনার হেন, যিনি ইটজি কে নিয়ে একটি লেকচার দিয়ে যাবার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তার উদ্ধার কাজের ছবি তোলা এক সাংবাদিক ক্যান্সারে মারা যান। এমন কি যিনি প্রথম ইটজি কে দেখেছিলেন তিনিও সে আল্পস পর্বতের খারাপ আবহাওয়ায় পড়ে মারা যান। একজন গাইড যে মমিটি প্লেন এ উঠিয়েছিল সে মারা যায় পাহারের বরফ ধসে।

ঘটনা গুলো কতটুকু ইটজির সাথে জড়িত, তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও , রহস্যময় ইটজি এখন সবচেয়ে প্রাচীন যুগের প্রতিনিধি হিসেবে বিজ্ঞানীদের অনেক প্রশ্নের জবাব দিয়ে যাচ্ছে।

 

 

Related Posts

সাম্প্রতিককালের বিমানে ঘটে যাওয়া অদ্ভুদ সব কাণ্ড যা আপনি মিস করে গেছেন!

November 13, 2018

November 13, 2018

১। গত সেপ্টেম্বর ২০১৮তে হংকং কেন্দ্রিক বিমান সেবা প্রতিষ্ঠান ক্যাথি প্যাসিফিক (Cathay Pacific) তাদের একটি ফ্লাইটের বহির্ভাগে নাম ভুলের কারনে...

Dunkleosteus : সমুদ্রের এক দুর্ধষ বিভীষিকা।

November 12, 2018

November 12, 2018

সমুদ্রসীমায় পরিভ্রমনকারী এর এক ভয়ানক দানব এর নাম Dunkleosteus (ডাঙ্কলি ওস্টিওস)। এই প্রাগঐতিহাসিক প্রানীর সম্পর্কে খুব কম মানুষ ই জানে । ...

রহস্যময়তায় ঘেরা ভৌতিক অরণ্যভূমি “বেনিংটন ট্রায়াঙ্গল”

November 10, 2018

November 10, 2018

রহস্যজনক স্থান ‘বেনিংটন ট্রায়াঙ্গল’ এর নামকরণ করেন প্যারানরমাল গল্প লেখক জোসেফ এ সিত্রো। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিম ভারমন্টে অবস্থিত  এই স্থানটির...

পৃথিবীর বিতর্কিত কিছু মুর্তির গল্প

November 10, 2018

November 10, 2018

মুর্তি আর বিতর্ক – এ যেন একা অপরের পরিপুরক। মুর্ত বানানো হয় কোন বিখ্যাত মানুষ কিংবা কোন বিখ্যাত ঘটনাকে কেন্দ্র...

ব্ল্যাক স্যুটের আড়ালে দুর্ধর্ষ এক সুপুরুষ “জেমস বন্ড”

November 8, 2018

November 8, 2018

“মাই নেম ইজ বন্ড, জেমস বন্ড” জেমস বন্ড নামটির সাথে পরিচিত নন এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। নামটি মুখে নিলেই...

“Haunting of hill house” এর মত জীবন কাটানো কিছু পরিবার

November 7, 2018

November 7, 2018

শেরলি জ্যাকসন উপন্যাস “Haunting of hill house” আমাদের Crain পরিবারের গল্প বলে যারা দেশের সবচেয়ে ভয়ানক ভুতুড়ে বাড়িতে বাস করত।...

যে কারণে চট্টগ্রাম হালিশহর এলাকায় জণ্ডিসের প্রকোপ! (অনুসন্ধান)

June 26, 2018

June 26, 2018

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুসারে প্রত্যেক বছর পৃথিবীতে প্রায় দশ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর কারণ হল দূষিত পানি। বাংলাদেশ ও এর আওতাভুক্ত...

ইতিহাসের ভয়াবহ অপারেশন ‘ডেজার্ট স্টর্ম’

June 23, 2018

June 23, 2018

১৯৯১ সালের ১৫ জানুয়ারি বেলা এগারটার দিকে ওভাল অফিসে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক শীর্ষ স্থানীয় উপদেষ্টাদের সঙ্গে এক বৈঠক করার পর...

ধর্ষক রনিকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে কিছু ফেসবুক প্রোফাইল!!

June 11, 2018

June 11, 2018

আমাদের দেশে আছে দুই টাইপের মানুষ। একদল খারাপ নির্মূলের জন্য লড়াই করে, অন্যদল খারাপকে ইন্ধন যোগায়। বিশিষ্ট মাতাল ধর্ষক রনির...

উচ্চ মাধ্যমিকের নিম্নগতি

June 10, 2018

June 10, 2018

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে । কবি সুফিয়া কামাল তার এই অমর...

“Cold War” বা স্নায়ু যুদ্ধের গোড়াপত্তন

June 9, 2018

June 9, 2018

ইংরেজি ‘Cold War’ শব্দের বাংলায় বিভিন্ন প্রতিশব্দ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ‘ঠাণ্ডা লড়াই’, ‘স্নায়ু যুদ্ধ’, ‘শীতল যুদ্ধ’, ‘প্রচার যুদ্ধ’ ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক রাজনীতির...

হঠাৎ করেই বেড়ে গেল বাংলাদেশ থেকে ভারতে জ্বালানি তেল পাচার!

June 5, 2018

June 5, 2018

ভারতে বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছনোর পর প্রতিবেশীদেশ বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের ডিজেলের দামে অনেকটাই ব্যবধান তৈরি হয়ে গেছে।...

সুস্থতার চাবিকাঠি “খাদ্যাভাস পরিবর্তন”

April 26, 2018

April 26, 2018

অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে অসুস্থ হবার প্রবণতা বাড়ছে দিন দিন। মূলত রাস্তা ঘাটের খোলা খাবারের প্রতিই আসক্তি বেশি মানুষের, আর এসব...

কর্পোরেট দুনিয়ায় ‘দ্য আর্ট অব ওয়ার’ কেন জনপ্রিয়?

March 23, 2018

March 23, 2018

সান জু’র নীতি এখন প্রত্যেকটি মিলিটারি স্কুলের অবশ্য পাঠ্য বই। তবে আধুনিককালে তুমুল জনপ্রিয় হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিপণন বা মার্কেটিংয়ে।...

মাদকাসক্তের সহজ যাত্রা এবং একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা

March 15, 2018

March 15, 2018

চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের পাশ দিয়ে রিক্সাতে করে আসছিলাম, হটাৎই চোখে পড়া দেয়ালের একটি চিকা খুব মনে ধরল। যদি ভুল করে...

Comments
%d bloggers like this: