ডার্ক ওয়েব: ইন্টারনেট এর নিষিদ্ধ জগত! (পর্ব-৩) সিল্ক রোড: মাদক এর এক গোপন রাজ্য!

Please log in or register to like posts.
News

গত পর্ব গুলোতে আমরা ডার্ক নেট সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এখানে সংক্ষেপে ডার্ক নেট সম্পর্কে একটু বলে নেই। ইন্টারনেট হচ্ছে এক বিশাল তথ্যের ভাণ্ডার। আমরা ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে যত তথ্য পাই তা হচ্ছে ইন্টারনেট এর মোট তথ্যের ১ % মাত্র।তথ্যের বিশাল অংশ থাকে আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ইন্টারনেটের এই অংশটাকে বলা হয় ডিপ ওয়েবে।এখানে থাকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য , বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডাটাবেস, গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য ইত্যাদি।
ডিপ ওয়েবের নিচে একটি ছোট অংশ আছে। তাকে বলা হয় ডার্ক ওয়েব। আর এখানে সকল অপরাধী, হ্যাকার,গোপন সোসাইটি , মাদক ব্যবসায়ী, অসুস্থ মানসিকতার মানুষদের বিচরণ।এখানে এমন সব অবৈধ কাজ হয় যা সাধারণ মানুষের চিন্তার ও বাইরে। যাইহোক এগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আমরা গত পর্ব গুলোতে আলোচনা করেছি।

আজকে আমরা আলোচনা করব ডার্ক নেটের একটি গোপন ওয়েব সাইট সম্পর্কে। যার নাম হচ্ছে সিল্ক রোড। বলা হয় এটা ডার্ক নেটের সবচেয়ে শক্তিশালী ওয়েবসাইটগুলোর একটা ।

আমরা সবাই ইতিহাসের বইতে সিল্ক রোড সম্পর্কে পড়েছি। রেশম কাপড় আমদানি রপ্তানি তে ব্যবহার করা হত এই রাস্তা। তবে আজকে আমরা যে সিল্ক রোড নিয়ে আলোচনা করব সেটা হচ্ছে ডার্ক নেটের একটা ওয়েব সাইটের নাম । এটি একটি অনলাইন মার্কেটিং ওয়েবসাইট। সিল্ক রোড নামের এই সাইট টি কুখ্যাত মাদক, নেশা জাতীয় দ্রব্য , নিষিদ্ধ রাসায়নিক দ্রব্য ক্রয়- বিক্রয়ের জন্য । মাদক ক্রয়-বিক্রয় ছাড়াও অবৈধ অস্ত্র বিক্রয়, জাল আইডি কার্ড, পাসপোর্ট তৈরি এবং হ্যাকিং সার্ভিসও প্রদান করে এই ওয়েব সাইটটি ।

0220silkroad09.jpg

সিল্ক রোড ওয়েবসাইট । ছবি- গুগল ।

এই ওয়েবসাইট টির ডিজাইন খুবই আকর্ষণীয়। এই সাইট টিতে ব্যবহার কারীরা Rank এবং রিভিউ করতে পারে , ফলে নতুন ব্যবহার কারী সহজেই তাদের পছন্দের মাদকটি খুঁজে বের করতে পারে। নতুন ব্যবহারকারীদের প্রথমে এখানে রেজিস্টার করতে হয়। নতুন একাউন্ট রেজিস্টার করতে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হয়। ইউজার দের আইডি এখানে গোপন রাখা হয়। আর যেহেতু বিট কয়েন এর মাধ্যমে লেনদেন হয়, সেজন্য ক্রেতা ও বিক্রেতার পরিচয় সম্পূর্ণ রূপে গোপন থাকে। বিট কয়েন হচ্ছে একধরনের ইন্টারনেট ভিত্তিক মুদ্রা। এতে সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না এবং এর লেনদেন সম্পর্কেও সরকারের কাছে কোন তথ্য থাকে না। এজন্য বিট কয়েনের মাধ্যমে যে কোন অবৈধ লেনদেন খুব সহজেই করা যায়।

এছাড়া এই সাইটের মাধ্যমে যারা মাদক বিক্রি করে তাদেরকেও টাকা দিয়ে একাউন্ট খুলতে হয় । তবে টাকা থাকলেই এখানে একাউন্ট খোলা যায় না। একাউন্ট নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয় এবং যে নিলামে একাউন্ট জেতে সেই এই সাইটে মাদক বিক্রি করার অনুমতি পায়। এমন বিক্রেতাদেরই নির্বাচন করা হয় যারা নিয়মিত এবং বেশি পরিমাণ মাদক ও অন্যান্য নিষিদ্ধ দ্রব্য সরবরাহ করতে পারে। এসকল নির্বাচিত বিক্রেতাদের প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি ও দিতে হয়।
মজার বিষয় হচ্ছে এদের একটি বুক ক্লাব ও রয়েছে। যেখানে পৃথিবীর বড় বড় ষড়যন্ত্র, হ্যাকিং ইত্যাদির উপর দুর্লভ এবং উঁচু মানের বই পাওয়া যায়। এমন কি যে কোন বই বাজারে প্রকাশের আগেই তা এই ক্লাব মেম্বারদের হাতে চলে আসে।

 

২০১১ সালে সর্ব প্রথম এই ওয়েব সাইটি সম্পর্কে জানা যায়। তার আগ পর্যন্ত এটা সম্পর্কে কিছু জানা যায় নি।এই ওয়েবসাইট টির প্রতিষ্ঠাতা ‘ড্রেড পাইরেট রবার্ট’ নামে সাইটটি পরিচালনা করত।
২০১৩ সালে এফ বি আই ওয়েবসাইট টি বন্ধ করে দেয়। এর পিছনে আছে এক মজার ঘটনা। সিল্ক রোড ওয়েবসাইট টি অল্প সময়ের মধ্যেই মাদকসেবীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ফলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও নজরে পড়তে এর সময় লাগে নি। অনেকদিন ধরেই এফ বি আই চেষ্টা করছিল সিল্ক রোড ওয়েব সাইট টি বন্ধ করার জন্য। তবে ডার্ক নেটের যে কোন ওয়েবসাইট বন্ধ করা বা এর পেছনের ব্যক্তিদের ধরা অনেক কঠিন। তার মধ্যে এই সাইটের নিয়ন্ত্রণকারীরা খুবই দক্ষ এবং এরা ব্যবহার করত খুব উচ্চ মানের সাইবার প্রযুক্তি । এজন্য গোয়েন্দাদের পক্ষে কাজটা হয়ে পরেছিল আরও কঠিন। অনেক ডকুমেন্ট, নেটওয়ার্ক ট্রেস করে গোয়েন্দারা রোস আলব্রিচ নামের এক ব্যক্তিকে সন্দেহ করে । ধারনা করে এই ব্যক্তিটিই আসলে সাইটটির প্রতিষ্ঠাতা, যে ড্রেড পাইরেট রবার্ট ছদ্মনামে ওয়েবসাইট টি পরিচালনা করত। কিন্তু গোয়েন্দাদের কাছে শক্ত কোন প্রমাণ ছিল না।

DSC_3560.jpg

রোস আলব্রিচ। কুখ্যাত ওয়েবসাইটটির প্রতিষ্ঠাতা। 

 

গোয়েন্দা সংস্থা গুলো সব সময় হ্যাকার অথবা সাইবার অপরাধীদের এমন সময় ধরার চেষ্টা করে যখন তারা কম্পিউটার চালাচ্ছে বা ঐ নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট টি নিয়ন্ত্রণ করছে। কারণ অপরাধী যদি একবার কম্পিউটার লক করে ফেলে তখন এ ধরনের অপরাধী দের অপরাধ প্রমাণ করা খুবই কঠিন। বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে গোয়েন্দারা আগেই রোসের অবস্থান ট্রেস করেছিল। এর পর অপেক্ষায় ছিল সুযোগের। অনেকদিন অপেক্ষার পর আসে সেই সুযোগ। সেইদিন রোস আমেরিকার পাবলিক লাইব্রেরী তে বসে তার কম্পিউটারে সিল্ক রোড ওয়েবসাইটটি পরিচালনা করছিল। সে অবস্থায় এফবিআই এর অফিসাররা উদয় হয় এবং তাকে হাতে নাতে ধরে। এমন ভাবে ধরে যে রোস এ সময় কম্পিউটার বন্ধ করার ও সময় পায় নি। আর অফিসারদের এসব বিসয়ে ট্রেনিং থাকে! তারাও চলন্ত ওয়েবসাইট তাদের দখলে নিয়ে নেয়, এবং বন্ধ করে দেয়।
এটি ছিল ডার্ক নেটের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হাই প্রোফাইল গ্রেফতার । কারণ তাকে একেবারে হাতে নাতে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় সিল্ক রোড ওয়েব সাইট টির প্রায় ৩৪.৫ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা ছিল এবং এর প্রায় ১0 লক্ষ ব্যবহারকারী ছিল। বলা হয় জব্দ করার সাথে সাথেই গোয়েন্দারা প্রচুর পরিমাণ বিট কয়েনও দ্রুত সরিয়ে ফেলে।

অপরাধ প্রমাণের পর আমেরিকার আদালত রোস আলব্রিচকে আজীবন কারাগারে থাকার শাস্তি দেয়। বর্তমানে সে আমেরিকার একটি কারাগারে রয়েছে। তদন্ত কালে রোস আলব্রিচের আরেকটি ভয়ংকর কাজ গোয়েন্দাদের সামনে আসে।গ্রেপ্তারের কিছুদিন আগেই সে ডার্ক নেট থেকে প্রায় ৭ মিলিয়ন ডলার দিয়ে খুনি ভাড়া করে এবং খুনিটি ভাড়া করে ওয়েব সাইট টির আরেক কন্ট্রোলার কে খুন করার জন্য!!

ধারনা করা হয় হাতে নাতে ধরার কারণে এফবি আই ওয়েবসাইটটির প্রচুর পরিমাণ অর্থ সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়। তবে বহুদিন পর্যন্ত আমেরিকার এই গোয়েন্দা সংস্থাটি অর্থের পরিমাণের কথা প্রকাশ করতে চায় নি। অনেক পড়ে তারা স্বীকার করে তারা প্রায় ৪৮ মিলিয়ন ডলার ওয়েব সাইট টির সিজ করতে পেরেছে। ফলে রাতারাতি আমেরিকার সরকার অনেক বড় অংকের মালিক হয়ে যায়।

তবে দুখের বিষয় এত কিছুর পরও সিল্ক রোড ওয়েবসাইট টি কিন্তু আবার ফিরে এসেছে। ২০১৩ সালের অক্টোবরে রোস আলব্রিচকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ওয়েবসাইট টি বন্ধ করা হয়। কিন্তু নভেম্বরেই এটি silk road 2.0 নামে আবার চালু করা হয়। প্রধান প্রতিষ্ঠাতাকে গ্রেপ্তার করা হলেও এর অন্যান্য কন্ট্রোলাররা এই সাইট টি চালু করে। ২০১৪ সালে এটি আবার বন্ধ করা হয়। কিন্তু এটি আবার ফিরে আসে। শোনা যায় এবার এটির নাম silk road 3.1 ।

এই কুখ্যাত ওয়েবসাইটটি এখন আরও শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং সিকিউরিটি ব্যবহার করছে এবং মহা পরিক্রমায় ডার্ক নেটে বিস্তার করে আছে মাদকের এক বিরাট রাজ্য ।

 

(চলবে)

 

Reactions

0
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

Reactions

Nobody liked ?