আমার মাতৃভাষা : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

Please log in or register to like posts.
News

আসলেই এই পৃথিবীতে কত ভাষা আর কত বৈচিত্রই যে আছে তার কোনো শেষ নেই। কিন্তু যত ভাষাই থাক না কেন, প্রত্যেকের কাছে তার মাতৃভাষাই সবচেয়ে প্রিয়।

ব্যাতিক্রম নই আমরাও। মাতৃভাষা বাংলা আমাদের প্রাণের পেয়েও প্রিয়। পৃথিবীর সব ভাষার সাথে সংশ্লিষ্ট জনগণের আবেগ জড়িয়ে আছে। কিন্তু আমাদের যেমনটি তেমনটি আর কারও নয়। আবেগ, দৃঢ় সংকল্প, প্রতিবাদ, সংগ্রাম প্রাণদান অবশেষে বিজয় কী নেই এই ভাষার সাথে। মনমুকুরে ভাষার স্মৃতি সদা জাগরুক থাকায় আমরা একে একে বহু ঝড়কে পরাজিত করেছি। এ যেন এক জ্বলন্ত চেতনা…..

“পলাশ ফুলে শিমুল ফুলে / স্বপ্নফুলে আগুন

ভাষার মিছিল / আশার মিছিল

দেয় জাগিয়ে রক্তঝরা টগকগে / লাল ফাগুন”

মাতৃভাষা বাংলার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আর ভালোবাসা গড়ে তোলবার আয়োজন ছোটবেলা থেকেই। সেই  শিশু শ্রেণিতে পড়াশোনা করার সময় সাধারন জ্ঞান  বইতে শিখেছি ভাষা শহিদদের নাম। সেই তো শুরু। তারপর একে একে জেনেছি তার  ইতিহাস। প্রেক্ষাপট, ধারন করেছি তার চেতনা। আপনা থেকেই বিবেকের ঘরে ভাষা সংরক্ষণের দায়িত্ববোধ জাগরিত হয়েছে। এ তো শুধু আমার ক্ষেত্রেই নয়, সকলেরই তা হওয়ার কথা।

কিন্তু তা হচ্ছে কী?

এই ভাবনার পিছনে লুকিয়ে আছে তিক্ত অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতাগুলো ভাগাভাগি করার লোভ সামলাতে পারছিনা।

অনুভূতি-১

এফএম রেডিও শোনার তেমন একটা অভ্যাস ছিল না কখনই। তবুৗ হঠাৎ দু একদিন শোনা হয়েই যেত। সেই ‍সুবাদেই রেডিও জকিদের ভাষার সাথে পরিচয়। না বাংলা, না ইংরেজি, না হিন্দি সে এক আজগুবি ভাষা বটে। মূলত বাংলাভাষী তারা। মাঝে মাঝে ফ্যাশণ করতে গিয়ে বাংলা শব্দের এমন উচ্চারন করছিলেন যে, তা বোঝাই দায়। ভাষা নিয়ে আবেগ প্রবন আমার এই হৃদয়ে একটু লাগবারই কথা।

অনুভূতি-২

ফেসবুক আইডি খুলেছি মাত্র। অল্প বিস্তর ব্যাবহারও করতে শুরু করেছি। কিন্তু দুদিন বাদেই অতিষ্ঠ হয়ে গেলাম। ভাষাগত অবস্থা এতটাই করুন সে কী আর বলেবো। বুইজ্জালাইছ (বুঝে ফেলেছি),‘you have to বুজতে হবে’ (তোমাকে বুজতে হবে), টেনশন খাইস না মামা, কারেং (কারেন্ট) ইত্যাদি   হরেক রকমের অজানা শব্দে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ হতে দেখে বেদনাহত না হয়ে পারলাম না। ভাষা বিকৃরি এক মহোৎসব যার ভাষা যত বিকৃত কার জনপ্রিয়তা  যেন তত বেশী।

অনুভূতি-৩

সেই দিন এক খালাম্মার বাসায় গেলাম। তার পিচ্ছি মেয়েটা আমার বিরাট ভক্ত। কিন্তু সেই দিন কোনোই সাড়া পাচ্ছিলাম না। এ ঘর ও ঘর অবশেষে পেলাম ওকে ডোরেমন কার্টুনে মনটি দান করে চুপচাপ বসে আছে সে। ওর মস্তিষ্ক ইতোমধ্যেই মটু পাতলু, ডোরেমনের আগ্রাসনে নিমজ্জিত হয়েছে। আমাকে দেখেই হিন্দি ভাষায় বুলবুলিয়ে উঠল। কথা বুঝতে না পেরে অসহায়ভাবে খালাম্মার দিকে তাকাতেই এক গাল হেসে বললেন “ও তো  হিন্দিতে একদম Fluent বাংলাতো বলেই না।” খালাম্মার আরেক মেয়ে ইংলিশ মিডিয়ামের ছা্ত্রী। সে অবশ্য ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা বলতে পারে।

আঞ্চলিক ভাষা শুনতে বেশ মিষ্টি লাগে কিন্তু ইচ্ছে করে বিকৃত করা ভাষা মোটেই মধুর লাগে না। রাস্তাঘাটে তথাকথিত আধুনিক ছেলেমেয়েদের মুখে ভাষা শুনে হতবাক হয়ে যাই। দিন দিন অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। এই কি তবে বাংলা ভাষার গন্তব্য?

আজ বাংলা ভাষার এই করুণ দশা দেখে শহিদদের আত্মার নিশ্চয় ভূতের মত নিঃশ্বাস ফেলে ফেলে অস্থির পায়চারী করছেন। তাদের ত্যাগ বৃথা ছিল কি না হিসাব কষবেন হয়তো। ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে আবেগের সীমা নেই। এটা ভালো । কিন্তু শহিদ মিনারের বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ,অ আ ক খ অঙ্কিত পোষাক মাঝেই যখন আবেগটি নিঃশেষ হতে দেখি তখন বড় বেশি দুঃখ হয়। না, এ অবস্থা চলতে থাকলে বাংলা ভাষা হয়তো একদিন হরিয়েই যাবে। এ আমরা কখনোই চাইনা। বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে এবং ভালোভাবেই থাকবে ইনশাআল্লাহ। সে জন্য আমাদের চেষ্টা করতে হবে। নিজ নিজ জায়গা থেকেই বিশুদ্ধ ভাষা চর্চা শুরু করার মাধ্যমে এটা হতে পারে। বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলা (স.) এর পবিত্র সুন্নত। তিনি অত্যন্ত শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতেন। আমাদেরও তা করা উচিত।

তাই চলুন আজকে থেকেই শুরু করি।

Reactions

0
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

Reactions

Nobody liked ?