আমার ছেলেবেলা

Please log in or register to like posts.
News

খুব সম্ভবত আমাদের সময় পর্যন্তই ছেলেবেলা বলে কিছু একটা ছিল। নব্বই দশক পার করে যারা জন্মেছে, তাদের জীবনে ছেলেবেলা নামক কিছু নেই বলে আমার ধারণা। এরা প্রত্যেকেই জন্মের দু’বছরের মধ্যে বড় হয়ে যায়। দুই বছর বয়স পর্যন্ত যা কিছু করেছে সেগুলো যেহেতু মনে থাকে না, সেজন্য তাদের শৈশব বলে কিছু নেই।

আমার কথা শুনে আপনার ভ্রু কুচকে হয়তো মনিটরের দিকে তাকাবেন। কিন্তু আমার এই মনে হওয়ার পেছনে কিন্তু যুক্তি আছে। এই ঢাকার রাস্তায় একটু চোখ কান খোলা রেখে চললেই দেখবেন, বয়সে এগারোর বেশী হবে না অথচ চিপা জিনস আর গায়ে বিপ্লবী টিশার্ট চাপিয়ে এরা এমন ভাবে হেঁটে যায়, মাঝেমাঝে নিজের বড় ভাই ভেবে ভুল করে ফেলে মন।

অথচ এই শহুরে হাবভাব কিন্তু এই বছর পাঁচেক আগেও এতটা ছিল না। আমরা যারা গ্রামে ছিলাম, তারা আসলেই গাঁইয়া ছিলাম। এখনকার তো গ্রামের ছেলে মেয়েরাও ঢের স্মার্ট। আমার ছোট বোনটাও তো, জিনস পড়তে শিখে গেছে। অথচ আমাদের সময়ে, গ্রামের রাস্তায় জিনস পরা কাউকে দেখলে হা করে তাকিয়ে থাকতাম। অবশ্য ব্যাপারটা ভাল নাকি খারাপ সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু ওটা ছিল আমাদের ছেলেবেলার সংস্কৃতি।

এখনকার প্রজন্ম আম চুরি, ডাব চুরি বলে আলাদা যে একটা রোমান্সকর ব্যাপার ছিল, সেটা তারা কখনোই পাবে না। তবে আমার ছেলেবেলায় চুরি টুরি খুব একটা করা হয়ে ওঠেনি। গাছে উঠতে পারতাম না বলে, চোরের দলে আমাকে কেউ নিত না। আমার শৈশবের প্রায় সবটুকু জুড়েই কেবল, নদীতে দাপাদাপি করে কেটেছে। বাড়ির সাথে লাগোয়া একটা ক্যানেল ছিল। দিনের মধ্যে আট দশ ঘণ্টা সেখানে গা ডুবিয়ে বসে থাকতাম। মাঝে মাঝে মা কলমি কাছে ডাল ভেঙ্গে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকত।

এই কলমি গাছের ডাল নিয়ে একটা উপন্যাস লিখে ফেলা যাবে। আরেকটা লেখা এই কলমি গাছের ডাল নিয়ে লিখব ইনশা আল্লাহ। তবে সংক্ষেপে বলতে গেলে, ওটাকে একটা বিভীষিকার সাথে তুলনা করা যায়। কলমির ডালের একেকটা মার, শরীরে একেকটা অপকর্মের সাক্ষী হয়ে বেঁচে ছিল দীর্ঘকাল ।

একদিনের গল্প বলি। আমি তখন ক্লাস টু অথবা থ্রিতে সম্ভবত পড়ি। একদম চৈত্রের দুপুর। মা আমাকে দুইটাকা দামের আইসক্রিম আনতে দিয়েছে কয়েকটা। যেহেতু চৈত্র মাস, বাড়ির সাথের লাগোয়া ক্যানেলটার পানি শুকিয়ে একদম অল্প হয়ে গেছে। আর তখনই দেখলাম ব্যাপারটা। আর খুশিতে নিজে নিজেই দুই তিনিটা ছোট ছোট লাফ দিলাম। এক ঝাঁক পুঁটি মাছ পানি গরম হয়ে যাওয়াতে লাফিয়ে লাফিয়ে ডাঙ্গায় উঠে আসছে! আমাকে আর পায় কে! আইসক্রিম এর কথা একদম ভুলে গিয়ে মাছ মারতে শুরু করে দিলাম।

আমার ধারণা ছিল, আমার মা হয়তো এত গুলো মাছ দেখে খুশি হবে। আমাকে আদর করে কপালে একটা চুমু বসিয়ে দেবে। কিন্তু তারপরের গল্পটা খুব একটা বিস্তারিত না। ছোট্ট একটা পার্ট। আম্মুর কলমির ডাল ভাঙ্গা আর আমার একটা উসাইন বোল্ট দৌড়।

মাঝে মাঝে আফসোস হয়। এই ইয়ো ইয়ো প্রজন্ম কখনো কলমির ডাল চিনবে না। কখনো মায়ের মারের ভয়ে উসাইন বোল্ট হয়ে উঠবে না। হবেই বা কী করে? এই ঢাকায় কি আর গ্রামের মত মেঠো পথ আছে?

আমি একটা ছেলেকে চিনি। বাবা মা দুজনই নয়টা পাঁচটা অফিস করে। ছেলেটা একা একা থাকে। কাজের মেয়ের কাছে। অবশ্য ঠিক কাছে না। কারণ মেয়েটা ওর কাছে ঘেঁসতেও সাহস পায় না। সারাদিন দরজা বন্ধ করে প্রথম কয়েকদিন ফিফা খেলার মধ্যেই আটকে থাকলেও। ইদানীং নেটের রাজত্বে হানা দেয়া হয় বেশী। এভাবেই একসময় পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে গেল। এই ছেলেটা কিন্তু একা না। নিজেই অনেক গুলো ছেলের প্রতিনিধিত্ব করে। অথচ আমাদের ছেলেবেলায় আমরা কম্পিউটারই চিনতাম না।

তবে হুম, খারাপ সব সময়ই ছিল। ঐ সময়টাতে ভিউ কার্ডের প্রচলন ছিল। হাটে গেলে নায়ক নায়িকাদের ছবির কার্ড পাওয়া যেত। আরও একটু খুঁজলে অশ্লীল ছবিও পাওয়া যেত। অনেকে কিনত, অনেকে কিনত না।

তসলিমা নাসরিনের আমার মেয়েবেলা পড়েছিলাম। তার স্বভাব মতই অশ্লীল বাক্য বানে জর্জরিত উপন্যাসটিও একটা শৈশবের কথা বলে। কিন্তু এই প্রজন্মের শৈশব বলে কিছু নেই। আবারও লেখার প্রথমে ফিরে যাই। শৈশব বলে কিছু নেই কারণ, এরা কখনো নিজেকে ছোট ভাবতে শেখেনি। হাঁটতে শেখার পর থেকেই নিজেকে তুলনা করেছে কোনো একজন সুপারস্টার এর সাথে। ওদের চলাফেরা, হাঁটার ধরন – সব কিছুতেই এক অস্বাভাবিক বড় মানুষের ভাব।

কিন্তু আমাদের সেই সময়টাতে আমরা ছোটই ছিলাম। আমরা মেনে নিয়েছিলাম, আমার বড় ভাইটা ঈদের সালামীতে ২০ টাকা পাবে আর আমি পাব দশ টাকা। কারণ আমি ছোট। আমরা মেনে নিয়েছিলাম, বাংলা সিনেমায় নায়ক নায়িকা একটু খানি কাছে আসলে আমাদের টিভির ঘর ছেলে উঠে যেতে হবে। আমরা মেনে নিয়েছিলাম, মাগরিবের আজানের আগেই আমাদের বাসায় ফিরতে হবে।

পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষই নিয়ম মানতে চায় না। কিন্তু এখন মনে হয়, কোনো কোনো নিয়মের মাঝেও একটা মাদকতা থাকে। যে নেশার তোপে বার বার বুদ হতে মন চায় ইট কাঠের এই বড় বেলাতে।

ইয়ো ইয়ো প্রজন্ম, একটা শৈশবের মাদক আসুক তোমাদের মাঝে। নেশাগ্রস্থ হও, ছোট বেলার উন্মাদনায়।

Reactions

0
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

Reactions

Nobody liked ?